২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বিজ্ঞাপন
Amader Rajshahi

পশ্চিম রেলের বিস্তৃত রেলপথ নেটওয়ার্ক নিরাপত্তার ঝুঁকিতে

প্রকাশিত: ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৯:৫৬ অপরাহ্ণ | বিভাগ: স্পেশাল নিউজ
পশ্চিম রেলের বিস্তৃত রেলপথ নেটওয়ার্ক নিরাপত্তার ঝুঁকিতে
বিজ্ঞাপন

স্টাফ রিপোর্টার : রেললাইনের সঙ্গে থাকা ছোট ছোট সরঞ্জামই ট্রেন চলাচলের নিরাপত্তায় বড় ভূমিকা রাখে। কিন্তু সেই প্যান্ডেল ক্লিপ, ফিস বোল্ট ও ফিসপ্লেটই যদি রাতের আঁধারে একের পর এক খুলে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা, তাহলে বিপদের আশঙ্কা তৈরি হয় পুরো রেলপথজুড়ে। পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের দিনাজপুরের পার্বতীপুর–-বিরামপুর ও পার্বতীপুর–-চিলাহাটি রুটসহ পশ্চিমাঞ্চল রেলের সকল রুটে এমন চুরির ঘটনায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে রেলপথের নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা নিয়ে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, পার্বতীপুর-–বিরামপুর ও পার্বতীপুর–-চিলাহাটি রেলপথের প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকায় প্যান্ডেল ক্লিপ, ফিস বোল্ট ও ফিসপ্লেটসহ প্রায় সাত হাজার রেল সরঞ্জাম চুরি হয়েছে। এর মধ্যে পার্বতীপুর–-বিরামপুর অংশের প্রায় ৮ কিলোমিটার এবং পার্বতীপুর-–চিলাহাটি অংশের প্রায় ৭ কিলোমিটার রেললাইন সরঞ্জাম চুরির কারণে ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। রেলওয়ে সূত্র বলছে, শুধু গত এক বছরে ঢাকা–পার্বতীপুর–বিরামপুর রেলপথ থেকে প্রায় ১৪ লাখ ৭০ হাজার টাকার প্যান্ডেল ক্লিপ, ফিস বোল্ট ও ফিসপ্লেট চুরি হয়েছে। সর্বশেষ গত ২৫ আগস্ট রাতে পার্বতীপুরের ভবানীপুর রেলস্টেশনের গোডাউন থেকে প্রায় ২ লাখ ৮৬ হাজার টাকার এসব সরঞ্জামসহ বিভিন্ন মালামাল চুরি হয়।
ব্যস্ত রুট, কিন্তু নজরদারি সীমিত : পার্বতীপুর পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জংশন। উত্তরাঞ্চলের রেল যোগাযোগের বড় একটি অংশ এই জংশনকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হয়। পার্বতীপুর থেকে একদিকে বিরামপুর হয়ে দিনাজপুর–পঞ্চগড় ও সীমান্তবর্তী অঞ্চল, অন্যদিকে চিলাহাটি, আবার লালমনিরহাট –রংপুর–-কুড়িগ্রাম এবং দক্ষিণে সান্তাহার–ঈশ্বরদীসহ বিভিন্ন রুটে রেল যোগাযোগ বিস্তৃত।
বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রকাশিত পশ্চিমাঞ্চল ট্রেন তালিকায় পার্বতীপুর-–চিলাহাটি, লালমনিরহাট–-পার্বতীপুর, পার্বতীপুর–-পঞ্চগড়, রংপুর–কুড়িগ্রাম,ঈশ্বরদী-রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রহনপুর একাধিক রুটে লোকাল, মিশ্র, আন্তঃনগর ও পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল করে। ফলে একটি নির্দিষ্ট অংশে রেললাইনের গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ চুরি হলেও তার প্রভাব কেবল ওই এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। কোনো স্থানে ক্লিপ বা ফিসপ্লেট খুলে যাওয়ার বিষয়টি সময়মতো শনাক্ত না হলে ট্রেন চলাচলের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তৃত রেল নেটওয়ার্ক : পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের আওতায় পাকশী ও লালমনিরহাট—এই দুটি পরিচালন বিভাগ রয়েছে। এই নেটওয়ার্কের সঙ্গে উত্তরাঞ্চলের পার্বতীপুর, দিনাজপুর, চিলাহাটি, পঞ্চগড়, লালমনিরহাট, রংপুর, কুড়িগ্রাম ও বুড়িমারী; মধ্যাঞ্চলের ঈশ্বরদী, রাজশাহী, সিরাজগঞ্জ, নাটোর ও সান্তাহার; এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পোড়াদহ, কুষ্টিয়া, রাজবাড়ী, গোয়ালন্দ, যশোর, খুলনা, দর্শনা ও বেনাপোলসহ গুরুত্বপূর্ণ রেলপথ যুক্ত।
বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী পশ্চিমাঞ্চলের ট্রেন পরিচালনায় পাকশী বিভাগে আন্তঃনগর, মেইল/কমিউটার, লোকাল/মিশ্র এবং পণ্যবাহীসহ ১১৯টি এবং লালমনিরহাট বিভাগে ৭৭টি ট্রেনের তালিকা রয়েছে। অর্থাৎ দুই বিভাগ মিলিয়ে প্রায় ২০০ ট্রেনের পরিচালন নেটওয়ার্ক এই অঞ্চলের রেল অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল।
এই বিশাল নেটওয়ার্কের গুরুত্বপূর্ণ রুটগুলোর মধ্যে রয়েছে ঈশ্বরদী-পার্বতীপুর, পার্বতীপুর-–চিলাহাটি, পার্বতীপুর–-পঞ্চগড়, লালমনিরহাট-পার্বতীপুর, লালমনিরহাট- বুড়িমারী, রংপুর–-কুড়িগ্রাম, সান্তাহার–-লালমনিরহাট, পোড়াদহ-গোয়ালন্দঘাট, পোড়াদহ-রাজবাড়ী, ঈশ্বরদী-রাজবাড়ী, রাজশাহী-খুলনা, রাজশাহী-ঢাকা, খুলনা–যশোর, দর্শনা এবং যশোর-বেনাপোলসহ বিভিন্ন সংযোগপথ। এগুলোর অনেকগুলোই আন্তঃনগর, মেইল, কমিউটার, লোকাল ও পণ্যবাহী ট্রেনের চলাচলের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে। পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের প্রকাশিত আন্তঃনগর ট্রেনের তালিকাতেও ঢাকা, রাজশাহী, খুলনা, রংপুর, চিলাহাটি, পঞ্চগড়, গোয়ালন্দসহ বিভিন্ন গন্তব্যের সংযোগ দেখা যায়।
জনবল সংকট : চুরি ঠেকাতে পার্বতীপুর–বিরামপুর রেলপথের ৮ কিলোমিটার অংশে ১১ সদস্যের এবং পার্বতীপুর–চিলাহাটি রেলপথের ৭ কিলোমিটার অংশে ৮ সদস্যের ওয়েম্যান দল দায়িত্ব পালন করছে। কিন্তু এত গুরুত্বপূর্ণ রেলপথে বিশেষ করে রাতের বেলায় সীমিত জনবল দিয়ে নিয়মিত নজরদারি করা কঠিন হয়ে পড়েছে। পার্বতীপুর রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন উপসহকারী প্রকৌশলী (পিডব্লিউআই) শেখ আল আমিন জানান, জনবল চেয়ে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হলেও এখনো প্রয়োজনীয় সাড়া পাওয়া যায়নি। জনবল সংকটের কারণে রেলপথের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণও ব্যাহত হচ্ছে।এমন বাস্তবতায় চোর চক্র যদি কোনো এলাকায় রেললাইনের সরঞ্জাম খুলে নিয়ে যায়, তাৎক্ষণিকভাবে তা শনাক্ত ও প্রতিস্থাপন করা কঠিন হয়ে পড়ে।
রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থাও প্রশ্নের মুখে : পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের জনবল সংকট নতুন কোনো বিষয় নয়। সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে পাকশী ও লালমনিরহাট বিভাগের স্টেশন পরিচালনা ও রেলসেবায় জনবল ঘাটতির চিত্র উঠে এসেছে। ২০২৪ সালের এক প্রতিবেদনে পশ্চিমাঞ্চলে স্টেশন মাস্টার, গার্ড, পয়েন্টসম্যান ও গেটকিপারসহ বিভিন্ন পদে বড় ধরনের শূন্যতার তথ্য প্রকাশিত হয়েছিল। অন্যদিকে পশ্চিমাঞ্চলের পাকশী বিভাগের ১১৩টি স্টেশনের মধ্যে ৪২টি সম্পূর্ণ এবং ১৭টি আংশিকভাবে বন্ধ থাকার তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে। রেলওয়ের মতো উচ্চঝুঁকির পরিবহন ব্যবস্থায় ট্রেন পরিচালনা, পয়েন্ট পরিবর্তন, লেভেল ক্রসিং, রেললাইন পরিদর্শন ও রক্ষণাবেক্ষণ—সব ক্ষেত্রেই পর্যাপ্ত জনবল প্রয়োজন। ফলে রেললাইন থেকে একটি ক্লিপ বা ফিসপ্লেট চুরি যাওয়ার ঘটনাকে নিছক চুরি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
পুরোনো ঘটনাও আছে : পশ্চিমাঞ্চলের অন্যান্য এলাকাতেও রেললাইনের গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম হারিয়ে যাওয়ার নজির রয়েছে। কয়েক বছর আগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় রেললাইনে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনায় ৯২টি প্যান্ডেল ক্লিপ ও একটি স্টিল স্লিপার হারিয়ে যাওয়ার তথ্য মামলার এজাহারে উঠে এসেছিল। অর্থাৎ রেললাইনের উপকরণ চুরি বা নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি শুধু পার্বতীপুর এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বিভিন্ন সময়ে পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন রুটেই রেল অবকাঠামোর সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত বা হারিয়ে যাওয়ার ঘটনা সামনে এসেছে।
ঝুঁকিতে যাত্রী ও পণ্যবাহী ট্রেন : রেললাইনের প্যান্ডেল ক্লিপ, ফিস বোল্ট ও ফিসপ্লেট কোনো সাধারণ লোহার সামগ্রী নয়। রেলপথের বিভিন্ন অংশকে নির্দিষ্ট অবস্থানে ধরে রাখা এবং রেলের জোড় ও সংযোগস্থলের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এসব উপকরণের প্রয়োজন হয়। এগুলো খুলে গেলে বা অনুপস্থিত থাকলে রেললাইনের নির্ধারিত অবস্থান ও স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিশেষ করে পশ্চিমাঞ্চলের দীর্ঘ রেল নেটওয়ার্কে প্রতিদিন আন্তঃনগর ট্রেনের পাশাপাশি মেইল, কমিউটার, লোকাল এবং পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল করে। ফলে রাতের বেলায় কোনো অংশে সরঞ্জাম চুরি হলেও সেটি ভোরের আগে শনাক্ত না হলে পরবর্তী ট্রেন চলাচলের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
প্রয়োজন সমন্বিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা : সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু ওয়েম্যান দিয়ে রেললাইনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। রেলওয়ের প্রকৌশল বিভাগ, নিরাপত্তা বাহিনী, জিআরপি ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত নজরদারি প্রয়োজন। বিশেষ করে যেসব এলাকায় নিয়মিত রেল সরঞ্জাম চুরির অভিযোগ রয়েছে, সেখানে রাতের টহল, ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্ট চিহ্নিত করে নজরদারি, চুরি যাওয়া সরঞ্জামের দ্রুত প্রতিস্থাপন এবং চোরাই মাল কেনাবেচার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করা দরকার। একই সঙ্গে রেলপথের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ রুটে পর্যাপ্ত ওয়েম্যান ও রক্ষণাবেক্ষণ কর্মী নিয়োগের দাবি উঠেছে। কারণ পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের বিশাল নেটওয়ার্কে কোনো একটি অংশের নিরাপত্তা দুর্বল থাকলে তার প্রভাব পুরো ট্রেন পরিচালন ব্যবস্থায় পড়তে পারে। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, পার্বতীপুরের ১৫ কিলোমিটার রেলপথে প্রায় সাত হাজার সরঞ্জাম চুরির ঘটনা তাই কেবল স্থানীয় কোনো চুরির ঘটনা নয়; এটি পশ্চিমাঞ্চলের দীর্ঘ ও ব্যস্ত রেল নেটওয়ার্কের নিরাপত্তা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং জনবল ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার একটি সতর্ক সংকেত।

পাঠকদের ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন