বায়া-তানোর সড়ক যেন মৃত্যুফাঁদ!
স্টাফ রিপোর্টার : রাজশাহীর বায়া থেকে তানোর পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সড়কটি এখন যেন দুর্ভোগের আরেক নাম। সড়কের বিভিন্ন অংশ ভেঙে বড় বড় গর্ত ও খানাখন্দের সৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টির পানি জমে কোথাও কোথাও সড়ক পরিণত হয়েছে কাদামাটির জলাশয়ে। ঝুঁকি নিয়ে চলছে বাস, ট্রাক, অটোরিকশা ও মোটরসাইকেল। পথচারী ও স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগও চরমে। এরই মধ্যে শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) দুপুরে সড়কের ভাঙা অংশে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটি যাত্রীবাহী বাস পাশের ড্রেনে নেমে যায়। বাসভর্তি যাত্রীরা অল্পের জন্য প্রাণে রক্ষা পান। স্থানীয়দের দাবি, সড়কটির বর্তমান অবস্থা যে কতটা ভয়াবহ, এই ঘটনাই তার সর্বশেষ উদাহরণ।
জানা গেছে বায়াবাজার থেকে তানোর উপজেলার কাশিমবাজার পর্যন্ত সাড়ে ৭ কিলোমিটার সংস্কারে প্রায় ১১ কোটি টাকা ব্যয়ে সড়কটির নির্মাণ কাজ চলছে। তথ্যোনুযায়ী কাজটি স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) অধীনে এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে সৈকত এন্টারপ্রাইজের কাজটি পেয়েছে। এই প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ২০২৫ সালের ১৫ জুন এবং সড়ক প্রশস্ত ও শক্তিশালীকরণের পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে ড্রেন, কালভার্ট ও ব্রিজের কাজও প্রকল্পের আওতায় রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের উদ্ধৃত করে সেখানে প্রায় ৬৫ শতাংশ কাজ শেষ হওয়ার তথ্য দেওয়া হয়েছে।
এখানেই প্রশ্ন উঠছে—সংস্কার ও উন্নয়নকাজ চলমান থাকার পরও বায়া-তানোর সড়কের কিছু অংশ কেন এমন বিপজ্জনক অবস্থায় রয়েছে? প্রকল্পের আওতায় থাকা অংশ থাকা বায়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে তেঘর পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত অংশ একই প্রকল্পের আওতায় কি না, সেটিও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। তানোর-মুন্ডুমালা সড়কের অবকাঠামো নিয়েও গত কয়েক মাসে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। ইত্তেফাকের ১৩ মে ২০২৬-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, ৪৩ কিলোমিটার সড়কটি ২০১২ সালে বিএমডিএ এলজিইডির কাছে হস্তান্তর করে। এরপর এলজিইডি পর্যায়ক্রমে মুন্ডুমালা থেকে বাগধানী পর্যন্ত সড়কটি ২০ ফুট পর্যন্ত সম্প্রসারণ করে। কিন্তু সরু কালভার্টগুলো যথাযথভাবে প্রশস্ত না করায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি রয়ে গেছে। ২০২৫ সালেও একই ধরনের অভিযোগ সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছিল—সড়ক প্রশস্ত করা হলেও সড়কের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কালভার্টগুলো প্রশস্ত করা হয়নি। অর্থাৎ শুধু সড়কে নতুন কার্পেটিং বা প্রশস্তকরণ করলেই যে যোগাযোগব্যবস্থার নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না, বায়া-তানোর অঞ্চলের সড়ক অবকাঠামো তারই উদাহরণ হয়ে উঠছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, হিমালয় কোল্ড স্টোরেজের দেয়ালঘেঁষা সড়কের পাশের ড্রেনের একটি অংশ দখল করে কাঠ-খড়ির ব্যবসা পরিচালনা করা হচ্ছে। ফলে পানি স্বাভাবিকভাবে নিষ্কাশিত হতে পারছে না। তাদের দাবি, সড়কের পাশে নতুন করে তৈরি করা পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থায় পানি যাওয়ার পথ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় সামান্য বৃষ্টিতেই সড়কের ওপর পানি জমে যায়। দীর্ঘসময় পানি জমে থাকায় সড়কের পিচ ও ভিত্তি দুর্বল হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত অংশ আরও দ্রুত নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে ড্রেন দখলের অভিযোগটি সরেজমিনে মাপজোক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। বায়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও আশপাশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াতকারী শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে সড়কটি ব্যবহার করতে হচ্ছে। পানি ও কাদায় অনেক জায়গায় পায়ে হেঁটে চলাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, দিনের বেলায় কোনোভাবে যানবাহন চলাচল করলেও রাত ও বৃষ্টির সময় ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। গর্তে পানি জমে থাকায় কোনটি অগভীর আর কোনটি গভীর—তা বোঝার উপায় থাকে না। একদিকে কোটি কোটি টাকার সড়ক উন্নয়ন প্রকল্প, অন্যদিকে একই অঞ্চলের সড়কের বিভিন্ন অংশে ভাঙাচোরা অবস্থা, জলাবদ্ধতা ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি—এই বৈপরীত্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। তাদের দাবি, সড়কের কোন অংশ কোন প্রকল্পের আওতায়, কত টাকা বরাদ্দ, কাজের নির্ধারিত মেয়াদ কত, ঠিকাদার কত শতাংশ কাজ শেষ করেছেন এবং কাজের মান যাচাইয়ে কী ধরনের তদারকি হয়েছে—এসব তথ্য প্রকাশ করা হোক। একই সঙ্গে সড়কের দুই পাশের ড্রেন সরকারি জায়গার মধ্যে পড়লে তা জরিপ করে অবৈধ দখল উচ্ছেদ, পানি নিষ্কাশনের পথ উন্মুক্ত এবং ঝুঁকিপূর্ণ অংশ জরুরি ভিত্তিতে সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী। তাদের আশঙ্কা, আজ বাস ড্রেনে পড়েছে; আগামী দুর্ঘটনাটি আরও ভয়াবহ হতে পারে। তাই প্রাণহানির ঘটনা ঘটার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে এখনই সড়কটি নিরাপদ করার দাবি তাদের।
