স্টাফ রিপোর্টার : রাজশাহীর বানেশ্বর-ঈশ্বরদী আঞ্চলিক মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ চারঘাট ও বাঘা বাজার এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে চলমান সড়ক ও ড্রেন নির্মাণ প্রকল্পের কাজ বন্ধ ছিল। সম্প্রতি কাজ পুনরায় শুরু হলেও নির্মাণকাজের মান ও জমি অধিগ্রহণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের অভিযোগ, কাজের শুরু থেকেই নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা হচ্ছে। পাশাপাশি যে পরিমাণ উপকরণ ব্যবহারের কথা রয়েছে, বাস্তবে তারও ঘাটতি দেখা যাচ্ছে।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, সড়কের পাশের কিছু জমির মালিকের কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা নিয়ে সরকারের অধিগ্রহণ করা জমির নির্দিষ্ট অংশ বাদ দিয়ে ড্রেন নির্মাণ করা হচ্ছে। ফলে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে জমি অধিগ্রহণের পরও প্রকল্পের মূল নকশা ও নির্ধারিত মাপ অনুযায়ী কাজ হচ্ছে না। স্থানীয়দের আশঙ্কা, বর্তমান অবস্থায় কাজ শেষ হলে ভবিষ্যতে জলাবদ্ধতা ও সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থেকে যাবে। তাই দ্রুত অনিয়ম তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তারা।
তিন দফা প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধি করার পরেও ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতা ও কতৃপক্ষের উদাসীনতায় দীর্ঘ পাঁচ বছরেও কাজ শেষ হয়নি ৫৪ কিলোমিটার আঞ্চলিক মহাসড়কের মাত্র দেড় কিলোমিটার অংশের নির্মাণ কাজ। অথচ বাকি সাড়ে ৫২ কিলোমিটার সড়কের কাজ দুই বছর আগেই শেষ হয়েছে। রুপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সাথে রাজশাহী শহরের যোগাযোগ স্থাপনকারী এ মহাসড়ক দিয়ে বরিশাল ও খুলনার বিভাগের অধিকাংশ যানবাহন চলাচল করে।
রাজশাহী সড়ক ও জনপথ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ৫৫৪ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার বানেশ্বর থেকে চারঘাট-বাঘা-নাটোরের লালপুর হয়ে পাবনার ঈশ্বরদী পর্যন্ত এই সড়কের দৈর্ঘ্য ৫৪ কিলোমিটার। ১৮ ফুট চওড়া সড়কটি হয়েছে ৩৪ ফুট চওড়া। মহাসড়কের প্রশস্তকরণ কাজ ২০২০ সালে শুরু হয়ে শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২২ সালের ৩১ ডিসেম্বর। পরবর্তীতে দুই দফায় আরো এক বছর সময় বাড়িয়ে চারঘাট ও বাঘা বাজারের দেড় কিলোমিটার বাদে পুরো অংশের কাজ শেষ হয়েছে ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে। সাতজন ঠিকাদার সাতটি প্যাকেজে কাজটি বাস্তবায়ন করেছেন।
এদিকে গত বছরের ২০ মার্চ সড়ক বিভাগ প্রায় ২২ কোটি টাকা ব্যয়ে চারঘাট ও বাঘা উপজেলা সদরের দেড় কিলোমিটার আরসিসি ঢালাই সড়ক, ড্রেন নির্মাণ ও আলোকায়নের জন্য শামীম এন্টারপ্রাইজ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সাথে চুক্তিপত্র স্বাক্ষর করে। চুক্তি অনুযায়ী গত ৩০ জুনের মধ্যে কাজ শেষ করতে বলা হয়েছিল। অধিগ্রহণকৃত জায়গা ফাঁকা না থাকায় চুক্তিপত্রের পরদিনই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করা সম্ভব নয় বলে সড়ক বিভাগকে লিখিতভাবে জানায় ঠিকাদার। অধিগ্রহণ করা জমি ফাঁকা না থাকায় জায়গায় কাজ শুরুর কদিন পর প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলে কাজ বন্ধ হয়ে যায়। পরে এ বছরের জানুয়ারি মাসে আবারও ১৯ কোটি টাকার দরপত্র আহবান করা হয়। একই ঠিকাদার কাজটি বাস্তবায়ন করছে।
চারঘাট ও বাঘা উপজেলা সদর সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, চারঘাট মেডিকেল মোড় এলাকায় জমি অধিগ্রহণ করার পরও সড়ক ও ড্রেনের নকশা পরিবর্তন করে কাজ করা হচ্ছে। তাপসী রানী, গৌতম কুমার, শাহীন হোসেনসহ সড়ক সংলগ্ন একাধিক জমির মালিক সরকারের কাছে জমি বিক্রি করলেও জমির দখল ছাড়েনি৷ সড়ক ও জনপথ বিভাগ ও ঠিকাদারের লোকজন অনৈতিক সুবিধা নিয়ে এসব ব্যক্তিদের জমির কিছু অংশ অধিগ্রহণ না করে কাজ করছে।
চারঘাট বাজার এলাকায় সড়কটির জন্য অধিগ্রহণ করা জমির মালিক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আমরা সবাই সরকার অধিগ্রহণ করা জমি ছেড়ে দিয়েছি। কিন্তু কিছু মানুষ সড়ক ও জনপথ বিভাগের সাথে লাইন করে এখনো বাড়ি ভাঙেনি।
পাবনার রুপপুর-রাজশাহী রুটে চলাচলকারী বাস চালক মোশাররফ হোসেন বলেন, রাজশাহীর সাথে খুলনা ও বরিশাল বিভাগের চলাচলে গাড়িগুলোর জন্য এই সড়কটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নকশা ও মাপ অনুযায়ী যদি সড়ক নির্মাণ না হয় তবে সড়কে দূর্ঘটনার পরিমাণ বাড়বে। তবে অভিযোগ উঠার বিষয়ে তাপসী রানী, গৌতম কুমার ও শাহিন আলী বলেন, আমরা নিজেদের জমিতেই আছি। সরকারের অংশটুকু ভেঙে নিয়েছি। অভিযোগ মিথ্যা।
এ বিষয়ে চারঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, অভিযোগের বিষয়গুলো আমিও শুনেছি। এ বিষয়ে সড়ক ও জনপথ বিভাগের সাথে কথা হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী কাজ করতে বলা হয়েছে। সড়ক ও জনপদ অধিদপ্তর রাজশাহীর উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী রেজওয়ান করিম বলেন, অধিগ্রহণ করা জায়গা ছেড়ে কাজ করার সুযোগ নেই। অভিযোগ পেয়ে আবারও সার্ভেয়ার দিয়ে মেপে কাজ শুরু হয়েছে। নকশা ও মাপ অনুযায়ী কাজ বাস্তবায়ন করা হবে।