স্টাফ রিপোর্টার : রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (আরডিএ) প্রথম চেয়ারম্যান ছিলেন শফিউল আলম। দায়িত্ব পালন করেছেন ২১-১২-১৯৭৬ হতে ১৮-০২-১৯৮০ ইং তারিখ পর্যন্ত। তারপর ক্রমান্বয়ে ৩৩তম চেয়ারম্যান হিসেবে গত ১৯ আগস্ট ২০২৪ তারিখে দায়িত্ব নেন এস.এম তুহিনুর আলম (যুগ্মসচিব)। অতঃপর ৩৪তম চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পেলেন রাজশাহী মহানগর বিএনপি’র ‘সহ-সভাপতি’ আবুল কালাম আজাদ। ১১ জুন’২০২৬ ইং (২৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ) তারিখে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের চুক্তি ও বৈদেশিক নিয়োগ শাখার উপসচিব মো: গোলাম রব্বানী কর্তৃক স্বাক্ষরিত একটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (আরডিএ) চেয়ারম্যান পদে মো. আবুল কালাম আজাদকে একবছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। প্রজ্ঞাপনজারির দুইদিন পর গত ১৪ জুন রবিবার মোঃ নজরুল ইসলাম (গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়) সচিবের কাছে আরডিএ’র চেয়ারম্যান হিসেবে দাপ্তরিকভাবে দায়িত্ব বুঝে নেন আবুল কালাম আজাদ।
গত দুই দশকে রাজশাহীর নগরায়ণের চিত্র আমূল বদলে গেছে। শহরজুড়ে গড়ে উঠেছে অসংখ্য বহুতল ভবন। তবে এই উন্নয়নের আড়ালে ইমারত নির্মাণ বিধিমালা উপেক্ষা করে নির্মিত হচ্ছে অনেক ভবন, যেগুলোর বড় একটি অংশের নেই রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (আরডিএ) ও ফায়ার সার্ভিসের প্রয়োজনীয় অনুমোদন। ফলে এসব ভবন এখন নগরবাসীর জন্য বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আরডিএ’র তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহী জেলায় বর্তমানে বহুতল ভবনের সংখ্যা ১২৪৫টি। এর মধ্যে ৮৪৮টি ভবনই প্রয়োজনীয় রাস্তার জায়গা না রেখে নির্মাণ করা হয়েছে। অনুমোদনহীন ও নিয়মবহির্ভূত ভবন নির্মাণের অভিযোগে বর্তমানে ১৪টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। আরডিএর ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. আব্দুল্লাহ আল তারিক জানান, গত পাঁচ বছরে দেড় শতাধিক ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে ১৪০টি ভবনের বর্ধিত অংশ অপসারণ করা হয়েছে। নিয়ম লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। আরডিএর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মশিউর রহমান বলেন, “অনুমোদনহীন ভবনের মালিকদের বিরুদ্ধে নোটিশ ও মামলা করার প্রক্রিয়ায় কিছুটা সময় লাগে। তবে নিয়মবহির্ভূত সব বর্ধিত অংশ পর্যায়ক্রমে অপসারণ করা হবে। বর্তমানে কোনো কর্মকর্তাকে প্রভাবিত করে প্ল্যান পাস করানোর সুযোগ নেই।” এদিকে, রাজশাহী ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক জানান, বাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও মার্কেটসহ নগরীর ৭২১টি ভবন বর্তমানে চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। নিয়ম না মেনে ভবন নির্মাণের কারণে ভবিষ্যতে বড় ধরনের দুর্ঘটনা বা বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
নামপ্রকাশ না করার শর্তে কর্মরতদের অনেকেই মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ কার্যালয়ের বিভিন্ন অনিয়ম আর উদাসিনতার লাগামটানার বিষয়টি বেশ চ্যালেঞ্জিং। এই দপ্তরে বেশকিছু কর্মকর্তা অনিয়মের বিষয়ে যথেষ্ট শক্তবস্থানে থাকলেও; বিগত সময়গুলোতে কিছু কর্মকর্তার অনিয়ম আর উদাসিনতার ফলশ্রুতিতে নিয়মবহির্ভূত বহুতল ভবনের সংখ্যা বেড়েছে অনেক। এছাড়াও ভার্টিক্যাল এক্সটেনশন নিয়ম না থাকলেও শহরের অনেকস্থানেই বহুভবন উপরের দিকে বৃদ্ধি করা হয়েছে ভবন মালিকের ইচ্ছেনুযায়ী।
নগরবাসী ও সচেতন মহলের অভিযোগ, আরডিএর কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে অনেক ক্ষেত্রে নিয়মবহির্ভূতভাবে নকশা অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। স্থানীয়রা মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, “ভূমিকম্প বা অগ্নিকাণ্ডের মতো দুর্ঘটনা ঘটলে এসব ভবনের আশপাশে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি প্রবেশের সুযোগ থাকবে না। এতে উদ্ধারকাজ ব্যাহত হবে এবং প্রাণহানির ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাবে।” নতুন এই চেয়ারম্যানকে রাজশাহী মহানগর বিএনপি সহ সাবেক ছাত্রদল, যুবদল অন্যান্য অঙ্গ-সংগঠণের নেতাকর্মীরা পূর্ণনামের পাশাপাশি চেনেন সুইট নামে। আবুল কালাম আজাদ ওরফে সুইট রাজশাহী মহানগর বিএনপি’র সহ-সভাপতি হিসেবে বেশ গুরুত্বপূর্ণ পদেও ছিলেন (নিয়মানুযায়ী আরডিএ’র চেয়ারম্যান পদে যোগদানের পূর্বে যেকোন সংগঠণের পদ থেকে অব্যাহতি দেবার নিয়ম রয়েছে)। তিনি রাজশাহী মহানগর ছাত্রদল ও যুবদলের সভাপতির পদেও ছিলেন দীর্ঘসময়।
আরডিএ সূত্রে জানা গেছে, গত এক দশকে নকশা বহির্ভূত বা অবৈধভাবে ভবন নির্মাণের অভিযোগে রাজশাহীর সাড়ে ছয় হাজারের বেশি ভবন মালিককে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিকল্পিত নগরায়ণের পথে এসব অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ বহুতল ভবন এখন অন্যতম প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন একটি সংবিধিবদ্ধ সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠান। রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন, নওহাটা পৌরসভা, কাটাখালী পৌরসভা, চারঘাট পৌরসভা (আংশিক), দামকুড়া, হড়গ্রাম, হরিপুর, হুজুরিপাড়া, হরিয়ান, বড়গাছি, পারিলা, ইউসুফপুর, বেলপুকুর, বানেশ্বর ও সলুয়া ইউনিয়ন পরিষদের এলাকা সহ মোট ১৫টি প্রশাসনিক এলাকা নিয়ে রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের এলাকা বিস্তৃত। বিশাল এই এলাকার নিয়মবহির্ভূত অসংখ্য ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ও অন্যান্য নিয়মনীতি সঠিকভাবে পরিচালনা করাসহ আইনি পদক্ষেপের সুষ্ঠু প্রয়োগের বিষয়টি বেশ চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়াবে নবাগত এই চেয়ারম্যানের জন্য বলে মন্তব্য অনেকের। আরডিএ কার্যালয়ে কর্মরতদের অনেকেই মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, নতুন চেয়ারম্যানকে মাত্র ৩৬৫ দিনে সামলাতে হবে ৭২১ ভবনের ধাক্কা। আরডিএ’র নতুন এই চেয়ারম্যানের জন্য সামনে রয়েছে অনেক কঠিন দাপ্তরিক চ্যালেঞ্জ।