জনগণের সঙ্গে পুলিশের আস্থার সম্পর্ক তৈরি হলে ‘অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সহজ হবে’ বলে বিশ্বাস প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের। তিনি বলেন, “জনগণের সহযোগিতা ছাড়া দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা কঠিন। এই কারণেই পুলিশের জন্য জনগণের আস্থা অর্জন অত্যন্ত জরুরি। কমিউনিটি পুলিশিং এবং ওপেন হাউস ডের মত জনমুখী উদ্যোগের মাধ্যমে জনগণকে পুলিশি কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করার প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকুক। “জনগণের সঙ্গে পুলিশের আস্থার সম্পর্ক তৈরি হলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সহজ হবে বলে আমি বিশ্বাস করি।” পুলিশ সপ্তাহ-২০২৬ উপলক্ষে রাজারবাগ পুলিশ অডিটোরিয়ামে ‘পুলিশ কল্যাণ প্যারেড’ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী কথা বলছিলেন। রোববার (১০ মে) সকাল ৯টায় রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স মাঠে, পুলিশ বার্ষিক প্যারেডের বর্ণাঢ্য কুচকাওয়াজ পরিদর্শনের মধ্য দিয়ে পুলিশ সপ্তাহ উদ্বোধন করেন। এরপর রাজারবাগ পুলিশ অডিটোরিয়ামে ‘কল্যাণ প্যারেড’ অনুষ্ঠানে আসেন।
পুলিশ বাহিনী নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমার বক্তব্য স্পষ্ট, পুলিশ প্রশাসন কোনো দলের নয়, বিধিবদ্ধ আইন অনুযায়ী পুলিশ প্রশাসন পরিচালিত হবে।” বাহিনীর দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দিয়ে সরকার প্রধান বলেন, “কোনো নিরপরাধ মানুষ যেন হয়রানির শিকার না হন, তা নিশ্চিত করা অবশ্যই আপনাদের দায়িত্ব। আমরা থানাগুলোর পরিবেশ এমনভাবে করতে চাই, যা আইজি সাহেব উনার বক্তব্যে উল্লেখ করেছেন যেন একজন মানুষ কোনো মাধ্যম ছাড়াই সরাসরি থানায় গিয়ে নির্ভয়ে তার অভিযোগ জানাতে পারেন এবং একসাথে প্রতিকারও পেতে পারেন।” ‘ফ্যাসিবাদ যেন আর ফিরে না আসে’ ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে পুলিশ বাহিনীর ভূমিকা উঠে আসে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে। তারা কথায়, “ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত অবাধ সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ নির্বাচনে, আপনারা সারাদেশে যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। আপনাদেরকে গণতন্ত্রকামী জনগণের পক্ষ থেকে আমি অভিনন্দন জানাই। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে, অবশ্যই পুলিশের পক্ষে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন সম্ভব।” সতর্ক করে তিনি বলেন, তবে ফ্যাসিবাদী শাসনামলে দেশের জনগণ ভিন্ন চিত্রও দেখেছে। বাংলাদেশে যেন আর কখনোই ফ্যাসিবাদী শাসন ফিরে না আসে আসুন এই পুলিশ সপ্তাহে সেটিই হোক আমাদের অঙ্গীকার। সরকারের পরিকল্পনা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, “দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং জনগণের জান মালের নিরাপত্তা বজায় রাখা বর্তমান সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। ফ্যাসিবাদী সরকার নিজেদের হীন দলীয় রাজনৈতিক স্বার্থে পুলিশ বাহিনীকে জনগণের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিল। সেই অন্ধকারের সময় পেরিয়ে এখন সময় এসেছে নতুনভাবে এগিয়ে যাওয়ার। “আমি মনে করি, জনগণের বিশ্বাস অর্জন এবং সেই বিশ্বাস বজায় রাখাই পুলিশের সামনে বর্তমানে বড় চ্যালেঞ্জ।”
প্রধানমন্ত্রী বলেন “পুলিশের কাজ ‘দুষ্টের দমন আর শিষ্টের লালন’। জনগণের সঙ্গে পুলিশের সম্পর্ক হবে আইনগত এবং মানবিক। জনগণের সঙ্গে পুলিশের সম্পর্ক হোক আস্থা এবং নির্ভরতার। যে কোনো বিপদে আপদে জনগণ যেন থানা পুলিশকে তাদের নির্ভরযোগ্য আশ্রয়স্থল মনে করতে পারে, আপনাদের কাছে আমার এতটুকুই চাওয়া। “দেশে বর্তমানে জনগণের ভোটে জনগণের কাছে দায়বদ্ধ একটি গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই সরকারের কাছে জন প্রত্যাশা অনেক বেশি। বর্তমান সরকার যে জনগণের কাছে দায়বদ্ধ সরকার আপনাদের কার্যক্রমে যেন সেটি প্রতিফলিত হয় সেটি নিশ্চিত করার দায়িত্ব আপনাদের।” তিনি বলেন, “আমরা বলে থাকি জনগণ রাষ্ট্রের মালিক। জনগণ যদি মালিক হয় তাহলে এই মালিক যখন বিপদে পড়ে থানায় যায় সেখানে তারা আপনাদের আচরণে যেন কিছুটা হলেও রাষ্ট্রের মালিকানা অনুভব করতে পারেন, সেটি নিশ্চিত করা আপনাদের দায়িত্বের অংশ বলে আমি মনে করি।” “আপনাদের মনে রাখা দরকার আইনি সহায়তা পেতে সাধারণ মানুষ প্রথমেই থানায় আসে। পুলিশের সহায়তা চান। বিপদে না পড়লে মানুষ থানায় যায়না। সুতরাং, থানায় যাওয়ার পর তার বিপদ কমবে, মানুষের মনে এমন ধারণা তৈরি হওয়া অত্যন্ত জরুরি। আপনারা অবশ্যই যে কোনো বিষয়ে আইনগত পদক্ষেপ নেবেন। তবে সেখানে যদি মানবিকতার ছোঁয়া থাকে তাহলে আপনাদের কারণে সরকারের সাফল্যগুলো জনমনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।”
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “কয়েকদিন আগে আমি জেলা প্রশাসকদের সম্মেলনে যে কথাটি বলেছিলাম, আমার মনে হয় সেটি আজকের এ অনুষ্ঠানেও আপনাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। আপনারা হচ্ছেন, মাঠ পর্যায়ে সরকারের অ্যাম্বাসেডর। আপনাদের দক্ষ এবং তাৎক্ষণিক কৌশলী সিদ্ধান্ত যে কোনো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে খুবই গুরুত্ত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। “আপনারা কেবল আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর সদস্য নন; আপনারাই হচ্ছেন রাষ্ট্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, জনগণের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা এবং ন্যায়বিচার প্রদানের প্রথম দ্বার। সুতরাং, পুলিশ যদি জনগণের কাছে বিশ্বাস এবং নিরাপত্তার প্রতীক হয়ে উঠতে পারে, একজন নাগরিক হিসেবে আমি মনে করি, সেখানেই পুলিশের সাফল্য। পুলিশের সাফল্য মানে এটি সরকারেরও সাফল্য।”
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাল্যবিবাহ, নারী ও শিশু নির্যাতন কিংবা চুরি ডাকাতি দাঙ্গা ফ্যাসীবাদের মতো সমাজে চলমান প্রথাগত অপরাধমূলক কার্যক্রমগুলোর পাশাপাশি শুধু আমাদের দেশেই নয় বিশ্ব জুড়েই বেড়ে চলেছে সাইবার ক্রাইম। অপরাধীরা অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে নতুন নতুন কৌশলে অপরাধ করছে। বিশেষ করে সাইবার বুলিং নারীদের জন্য বর্তমানে অশান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, এসবের পাশাপাশি সংঘবদ্ধ অপরাধ, কিশোর গ্যাং, আর্থিক জালিয়াতিসহ নানা ধরনের অপরাধ প্রবণতাও বিরাজমান। সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত এসব অপরাধের শিকার হচ্ছেন। দেশে মাদক এবং অনলাইন জুয়ার ব্যাপারেও জনমনে উদ্বেগ রয়েছে। “আমি মনে করি, আইনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে ‘মাদক সরবরাহকারী এবং মাদকের উৎসমূল’ টার্গেট করে মাদক নিয়ন্ত্রণে পুলিশকে কার্যক্রম চালানো জরুরি। মাদক, সন্ত্রাস ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে আমাদের সরকারের অবস্থান পরিষ্কার। আমরা এসবের সাথে কম্প্রোমাইজ করতে চাই না।”
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমরা সবাই জানি বিশ্ব এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে প্রবেশ করেছে। গ্লোবাল ভিলেজের এই বিশ্ব ব্যবস্থা একদিকে মানুষের মনোজগতে যেমন পরিবর্তন এনেছে অপরদিকে পাল্টেছে অপরাধের ধরণ। সুতরাং বাংলাদেশ পুলিশকে একটি প্রযুক্তিগত দক্ষতাসম্পন্ন আধুনিক, দক্ষ ও যুগোপযোগী বাহিনীতে রূপান্তর করতে অপরাধ বিশ্লেষণ সক্ষমতা জোরদার, অত্যাধুনিক প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার এবংবৈজ্ঞানিক তদন্ত পদ্ধতির বিস্তৃত প্রয়োগ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। “চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের প্রেক্ষাপটে উদ্ভূত বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সাইবার পুলিশ প্রতিষ্ঠা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), বিগ ডাটা বিশ্লেষণসহ বিকাশমান প্রযুক্তির সমন্বিত ও কার্যকর ব্যবহার আরও সম্প্রসারণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে। এ লক্ষেই সরকার একটি আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর পুলিশি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে বদ্ধ পরিকর। এই লক্ষে সাইবার ক্রাইম নিয়ন্ত্রণ, আর্থিক জালিয়াতি প্রতিরোধ, সন্ত্রাসবাদ ও আন্তঃদেশীয় অপরাধ মোকাবিলায় উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার, ডিজিটাল ও ফরেনসিক সুবিধা এবং আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করাসহ এসব বিষয়গুলোকে আরো কার্যকর করতে সরকার পর্যায়ক্রমিকভাবে পদক্ষেপ গ্রহণ করছে।”
দেশে মানবাধিকার সমুন্নত রেখে সরকার আইনের শাসন সুনিশ্চিত করতে চায় বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রি। তিনি বলেন, গুম অপহরণ কিংবা বিচারবহির্ভূত কর্মকাণ্ড কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। “প্রতিটি নাগরিকের অধিকার সুরক্ষা করা প্রতিটি পুলিশের নৈতিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব। বাংলাদেশ পুলিশের প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা, পেশাদারিত্ব ও জনআস্থা আরও সুদৃঢ় করতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বদলি, পদোন্নতি কিংবা পুলিশে নিয়োগ এসব ক্ষেত্রে মেধা যোগ্যতা, দক্ষতা এবং সততাকেই আমরা প্রাধান্য দিতে চাই।”
দ্রুত পরবর্তনশীল এই বিশ্ব ব্যবস্থার সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের পুলিশে বাহিনীকেও আরো দক্ষ এবং আধুনিক করে গড়ে তোলার বিকল্প নেই বলে জানিয়েছেন তারেক রহমান। এই লক্ষ্যে পুলিশ সদস্যদের জন্য আধুনিক প্রশিক্ষণের পাশাপাশি তাদের আবাসন সংকট সমাধান, মানসম্মত চিকিৎসা সুবিধা নিশ্চিত করা, রেশন এবং ঝুঁকি ভাতাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সুযোগসুবিধা বাড়ানোর বিষয়গুলো সরকারের বিবেচনার ভেতরে রয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। তিনি বলেন, “আপনারা জানেন, দুর্নীতি দুঃশাসনে পর্যুদস্ত একটি দুর্বল শাসন কাঠামো, অবনতিশীল আইনশৃংখলা পরিস্থিতি এবং ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে বর্তমান সরকারকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিতে হয়েছে। আমরা সরকার পরিচালনার দায়িত্ব নেয়ার কয়েক সপ্তাহের মাথায় বিশ্ব যুদ্ধ পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছি। এমন বাস্তবতার কারণেই আমাদের পক্ষে আপনাদের সকল প্রত্যাশা কয়েক সপ্তাহ কিংবা কয়েকমাসের মধ্যে পূরণ করা সম্ভব নয়। কিন্তু আমরা পর্যায়ক্রমে প্রতিটি অঙ্গীকার বাস্তবায়নে কখনোই পিছপা হবো না ইনশাআল্লাহ।” প্রধানমন্ত্রী বলেন, “ আমাদের মত দেশগুলোতে অস্ত্রের শক্তির চেয়ে মানবিকতা, ন্যায়বিচার এবং জাতীয় ঐক্যই প্রধান শক্তি। আমরা জানি, আমাদের পথ সহজ নয়, কিন্তু আমাদের উদ্দেশ্য মহৎ। আমরা একটি সমৃদ্ধ স্বনির্ভর গণতান্ত্রিক নিরাপদ মানবিক বাংলাদেশ গড়তে চাই।” “তেমন একটি শান্তিপূর্ণ নিরাপদ বাংলাদেশ গড়তে ন্যায়পরায়ণ এবং পেশাদার পুলিশ বাহিনীর বিকল্প নেই।” অনুষ্ঠানের শেষে উপস্থিত এবং অনলাইনে যুক্ত সকল কর্মকর্তা ও তাদের পরিবারের সদস্যদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, পুলিশের মহাপরিদর্শক আলী হোসেন ফকিরসহ ঊধর্বতন কর্মকর্তারা ছিলেন।