স্টাফ রিপোর্টার : গত ২২ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে রাজশাহী নর্দার্ন ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি পিএলসি (নেসকো)-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন মো. মশিউর রহমান। যোগদানের পর থেকেই নিজ কর্মস্থলে অনিয়মিত কর্মকর্তার অলিখিত তালিকায় নাম উঠেছে সর্বোচ্চ এই কর্মকর্তার। দায়িত্ব গ্রহণের পর চার মাস অতিবাহিত হলেও তিনি এখন পর্যন্ত মাত্র চার দিন অফিস করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রতিষ্ঠানটির গুরুত্বপূর্ণ এই পদে থেকে নিয়মিত কর্মস্থলে উপস্থিত না থেকে ঢাকাস্থ লিয়াজো অফিসে বসেই নামমাত্র দায়িত্ব পালন করছেন নেসকোর এই কর্মকর্তা। প্রধান কার্যালয়ে নিয়মিত না আসার কারনে ইতোমধ্যেই প্রশাসনিক ও অন্যান্য দাপ্তরিক কার্যক্রমে বেশ স্থবিরতা সৃষ্টি হয়েছে বলে মন্তব্য কর্মরতদের। গত ১৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের বিদ্যুৎ বিভাগের উপসচিব ফারজানা খানম স্বাক্ষরিত এক আদেশে, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট ও বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি বিবেচনায় সকল বিদ্যুৎ কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিজ নিজ কর্মস্থলে উপস্থিত থেকে দাপ্তরিক দায়িত্ব পালনের নির্দেশনা দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্মাদের সেই নির্দেশনাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নিজ কর্মস্থলে উপস্থিত থাকার বিপরীতে তিনি এখনো অবস্থান করছেন ঢাকাস্থ লিয়াজো অফিসে। ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মশিউর রহমান ঢাকার বিজয়নগরে অবস্থিত ‘আল-রাজি’ নামের একটি ভবনের অষ্টম তলায় অবস্থিত নেসকোর লিয়াজোঁ অফিসে অবস্থান করে কার্যক্রম পরিচালনা করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এমডির অনুপস্থিতির কারণে জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ দাপ্তরিক বিষয়গুলোর সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব হচ্ছে। এছাড়াও জরুরী রক্ষণাবেক্ষণ ও বিদ্যুৎ সরবরাহ সংক্রান্ত সমস্যার দ্রুত সমাধান মিলছে না। দাপ্তরিক ফাইল নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রিতাসহ কালক্ষেপন হচ্ছে। সর্বোচ্চ কর্মকর্তার দীর্ঘসময় ধরে অনুপস্থিতির কারনে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে সমন্বয়হীনতা বৃদ্ধি পাবার পাশাপাশি চেইন-ইন-কমান্ডেও ধাক্কা লাগছে। এমডি’র অনিয়মিত উপস্থিতির কারনে প্রতিষ্ঠানজুড়ে অসন্তোষ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা করে অলৌকিক কারনে তিনি দিনের পর দিন ঢাকায় অবস্থান করে দায়িত্ব পালন করায় পরিস্থিতি দিনকে দিন জটিল হয়ে উঠছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকাস্থ লিয়াজোঁ কার্যালয়টি নেসকো’র প্রধান কার্যালয়ে স্থানান্তরিত করার কথা থাকলেও, বছর পেরিয়ে গেলেও সেটি আজও সম্ভব হয়নি।
ঢাকার বিজয়নগরে অবস্থিত নেসকোর লিয়াজোঁ অফিস পরিচালনায় প্রতি মাসে মোটা অংকের সরকারি অর্থ ব্যয় হচ্ছে। শুধুমাত্র অফিস ভাড়াবাবদ নেসকো কে গুণতে হচ্ছে প্রায় দুই লাখ টাকা। এর সঙ্গে ১০ জন কর্মচারীর বেতন, আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োজিত ড্রাইভারসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ যোগ হয়ে মাসিক ব্যয় দাঁড়াচ্ছে প্রায় ১২ লাখ টাকা।
অভিযোগ রয়েছে, ব্যবস্থাপনা পরিচালক ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য বিলাসবহুল গাড়ি ব্যবহার করছেন। এসব গাড়ির জন্য আউটসোর্সিং ড্রাইভার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং তাদের চলাচলে সরকারি মোটরসাইকেলও ব্যবহৃত হচ্ছে। এছাড়া ঢাকা জাতীয় প্রেসক্লাব সংলগ্ন এলাকায় দুটি ফ্ল্যাট রেস্ট হাউস হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, যার পেছনে প্রতি মাসে আরও প্রায় দুই লাখ টাকা ব্যয় হচ্ছে।
ঢাকায় অনুষ্ঠিত প্রতিটি মিটিংয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা করে ভাতা গ্রহণ করেন। মাসে গড়ে ১৫ থেকে ২০টি মিটিং অনুষ্ঠিত হওয়ায় এ খাতেও বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় হচ্ছে। এর মধ্যে ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিজেও প্রতি মিটিংয়ে উপস্থিতির জন্য বরাদ্দ হিসেবে পাচ্ছেন প্রায় ১২ হাজার টাকা সম্মানীভাতা। সরকারের অর্থ ব্যয় কমাতে বোর্ড সভার সিদ্ধান্তনুযায়ী ঢাকাস্থ লিয়াজোঁ অফিসটি নেসকোর সদর দপ্তর রাজশাহীতে স্থানান্তর হলে অর্থ ব্যয় হ্রাস পাবার পাশাপাশি কাজেও ফিরতো গতি বলে মন্তব্য কর্মরতদের।
উল্লেখ্য, নেসকোতে যোগদানের আগে মো. মশিউর রহমান নর্থওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানির আওতাধীন রূপসা ৮০০ মেগাওয়াট কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎ প্রকল্পে প্রকল্প পরিচালক (পিডি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বিগত সময়ের অন্তঃবর্তী সরকারের আমলের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বদলী কিংবা পদায়ন প্রক্রিয়া নিয়েও নানা আলোচনা-সমালোচনা রয়েছে। এ বিষয়ে নেসকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মশিউর রহমান বলেন, তিনি বর্তমানে দাপ্তরিক কাজে ঢাকায় অবস্থান করছেন। নেসকোতে যোগদানের পর থেকে গত চার মাসে মাত্র চার দিন রাজশাহীর সদর দপ্তরে আপনি অফিস করেছেন এমন অভিযোগ অনেকের। এপ্রসঙ্গে তিনি বলেন, দাপ্তরিক কাজ শেষ করে মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) রাজশাহী যাওয়ার কথা থাকলেও একটি জরুরি মিটিংয়ের কারনে যাওয়া হচ্ছনা। মূল অভিযোগের বিষয়ে তিনি নানারকম যুক্তি দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করেন।