বুধবার

২২শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

৯ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ সংবাদ

প্রতিদিনই বাড়ছে প্রবাসী মৃত্যুর সংখ্যা

Paris
Update : বুধবার, ২২ এপ্রিল, ২০২৬

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হলো প্রবাসী আয়। কিন্তু এই রেমিট্যান্সের পেছনে লুকিয়ে আছে এক ভয়াবহ বাস্তবতা- প্রতিদিনই প্রবাসীদের লাশ দেশে ফিরছে। ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর দেশে ফিরেছে পাঁচ হাজারের বেশি প্রবাসীর মরদেহ। সে হিসেবে গড়ে প্রতিদিন ১৪ জনের লাশ দেশে আসে। এরমধ্যে চলতি বছরের প্রথম দুই মাসেই এসেছে প্রায় ৯০০ জনের লাশ। জানা যায়, ১৯৯৩ সাল থেকে এ তথ্য সংরক্ষণ করা হচ্ছে, আর গত তিন দশকে দেশে ফিরেছে ৬২ হাজারের বেশি প্রবাসীর মরদেহ। এই সংখ্যাগুলো শুধু পরিসংখ্যান নয়, প্রতিটি লাশের সঙ্গে যুক্ত আছে একটি পরিবার, একটি স্বপ্ন, একটি ভেঙে যাওয়া ভবিষ্যৎ। তিন বছর আগেও প্রতিদিন গড়ে ১০ জনের লাশ আসত, এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪ জনে। সবচেয়ে বেশি লাশ আসে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরব, কুয়েত, ওমান, জর্ডান, লিবিয়া ও মালয়েশিয়া থেকে। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশ থেকে শ্রম অভিবাসন শুরু হয় সত্তরের দশকে। প্রথমে মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোতে শ্রমিক পাঠানো হয়। তখন শ্রমিকদের সংখ্যা ছিল সীমিত, কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। আশির দশকে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, কোরিয়া, হংকংসহ বিভিন্ন দেশে শ্রমিক পাঠানো শুরু হয়। নব্বইয়ের দশকে শ্রম অভিবাসন আরও বিস্তৃত হয়। বর্তমানে প্রায় এক কোটি বাংলাদেশি বিভিন্ন দেশে কর্মরত। কিন্তু এই অভিবাসনের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যা। ২০০৫ সালে দেশে ফিরেছিল এক হাজারের বেশি লাশ। ২০০৮ সালে তা দুই হাজার ছাড়ায়। ২০১৩ সালে তিন হাজারের বেশি লাশ দেশে আসে। ২০২৩ সালে প্রথমবার চার হাজার ছাড়িয়ে যায়। ২০২৪ সালে এসেছে প্রায় পাঁচ হাজার লাশ। অর্থাৎ প্রতি বছরই মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। এদিকে, আন্তর্জাতিক তুলনায় বাংলাদেশের মৃত্যুর হার তুলনামূলকভাবে বেশি। নেপালের শ্রমিকরা সাধারণত পাহাড়ি অঞ্চলের হওয়ায় শারীরিকভাবে বেশি সহনশীল। ফিলিপাইনের শ্রমিকরা তুলনামূলকভাবে দক্ষ এবং স্বাস্থ্যসচেতন। বাংলাদেশের শ্রমিকরা অধিকাংশই অদক্ষ, গ্রামীণ এলাকা থেকে আসা, স্বাস্থ্যসচেতনতা কম। ফলে তারা বেশি ঝুঁকিতে পড়েন। এদিকে, অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রাম (ওকাপ)-এর জরিপে দেখা গেছে, প্রবাসীর মৃত্যুর পর ৯৫ শতাংশ পরিবার আর্থিক সংকটে পড়ে। ৫১ শতাংশ পরিবারের আয় ৮০ শতাংশ কমে যায়। ৮১ শতাংশ পরিবার স্বাস্থ্যসেবা পেতে সংকটে পড়ে। ৬১ শতাংশ পরিবারের সন্তান স্কুলে যেতে পারে না। আর ৯০ শতাংশ পরিবার খাবারের পরিমাণ কমিয়ে দেয়। মানসিকভাবে পরিবারগুলো ভেঙে পড়ে- ৪৮ শতাংশ পরিবার বিষণ্ণতায় ভোগে, ৪০ শতাংশ পরিবারের ঘুমের সমস্যা তৈরি হয়। প্রবাসীদের মৃত্যুর কারণগুলোও উদ্বেগজনক। সরকারি হিসেবে রোগে মৃত্যু হলে তাকে স্বাভাবিক মৃত্যু বলা হয়। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, অধিকাংশ মৃত্যু হচ্ছে দুর্ঘটনায়, কর্মক্ষেত্রে চাপজনিত অসুস্থতায়, সড়ক দুর্ঘটনায়, আত্মহত্যায় কিংবা সহিংসতায়। গবেষণা বলছে, প্রবাসীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয় ব্রেইন স্ট্রোক ও হৃদরোগে। মৃতদের বড় অংশই তরুণ বা মধ্যবয়সী- ৩৮ থেকে ৪২ বছরের মধ্যে। অনেকেই কাজে যোগ দেওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই মারা যাচ্ছেন। রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিট (রামরু)-এর গবেষণা বলছে, প্রবাসে মারা যাওয়া কর্মীদের গড় বয়স মাত্র ৩৭ বছর। এত অল্প বয়সে মৃত্যুর বিষয়টি অস্বাভাবিক। মৃত্যুর সনদে হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোক লেখা হলেও অনেক মরদেহে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। মৃত কর্মীদের পরিবারের প্রায় অর্ধেকই মৃত্যু সনদে লেখা কারণ বিশ্বাস করে না। তাই ময়নাতদন্তের দাবি উঠছে। অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিকূল আবহাওয়া, প্রচণ্ড গরম, অমানুষিক পরিশ্রম, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে গাদাগাদি করে থাকা, দীর্ঘ সময় স্বজনদের থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা এবং মানসিক চাপের কারণে প্রবাসীরা স্ট্রোক বা হৃদরোগে আক্রান্ত হন। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রা আরও বাড়ছে, এতে মৃত্যু ঝুঁকি বাড়ছে। গবেষণা বলছে, অবকাঠামো নির্মাণ খাতে কর্মরত শ্রমিকরা দিনের বেলায় প্রচণ্ড তাপে কাজ করতে গিয়ে নানা রোগে আক্রান্ত হন। প্রবাসীদের অভিযোগ, কর্মস্থলে দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর ক্ষতিপূরণ এড়াতে অনেক সময় মৃত্যু সনদে হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোক লেখা হয়। অভিবাসন বিশেষজ্ঞ শাকিরুল ইসলাম বলেন, মৃত্যুর পর ময়নাতদন্ত করা দরকার, যাতে প্রকৃত কারণ জানা যায়। নিয়োগকর্তাদের দায় এড়ানোর সুযোগ কমাতে হবে। বিমার টাকা আদায়ে দূতাবাসকে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রবাসীদের মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধান করা জরুরি। বিদেশে যাওয়ার আগে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হলেও কর্মীরা সেখানে গিয়ে নানা রোগে আক্রান্ত হন। অতিরিক্ত পরিশ্রম, অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, চিকিৎসকের কাছে না যাওয়া- সব মিলিয়ে অকালমৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ে। সচেতনতা তৈরি করা গেলে অনেক মৃত্যু কমানো সম্ভব। নীতিনির্ধারকরা বলছেন, প্রতিটি লাশ দেশে আসার পর ময়নাতদন্ত করা উচিত। এতে প্রকৃত কারণ জানা যাবে। বিদেশে পাঠানোর আগে স্বাস্থ্য পরীক্ষা আরও কঠোর করা দরকার। শ্রমিকদের স্বাস্থ্যসচেতনতা বাড়াতে প্রশিক্ষণ দেওয়া উচিত। নিয়োগকর্তাদের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ে দূতাবাসকে সক্রিয় হতে হবে। প্রতিটি শ্রমিকের জন্য স্বাস্থ্যবিমা বাধ্যতামূলক করা উচিত। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশ থেকে শ্রম অভিবাসন বন্ধ হবে না। বরং আরও বাড়বে। ফলে মৃত্যুর সংখ্যা কমাতে হলে এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে তাপমাত্রা আরও বাড়বে। এতে মৃত্যুর ঝুঁকি আরও বাড়বে। তাই শ্রমিকদের সুরক্ষায় রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ জরুরি।-এফএনএস

 


আরোও অন্যান্য খবর
Paris