বৃহস্পতিবার

১৫ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

১লা মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ সংবাদ
তানোরে ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠান পরিদর্শনে অস্ট্রেলিয়ান-কানাডিয়ান হাই কমিশনার বেগম খালেদ জিয়া তাঁর জীবন দিয়ে মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে গেছেন : মিলন পদ্মাচরে মুড়িকাঁটা পেঁয়াজের বাম্পার ফলন মান্দায় অবৈধভাবে উত্তোলনকৃত বালি জব্দ, প্রকাশ্যে নিলামে বিক্রি রাজশাহী অঞ্চলে ৬ হাজার হেক্টর জমিতে কমেছে আলু চাষ তালন্দ কলেজে নিয়োগের আগেই কোটি টাকার লেনদেন গাজা উপত্যকায় মারাত্মক পুষ্টিহীনতায় ভুগছে ৯৫ হাজার শিশু : জাতিসংঘ রাজশাহীর অধিকাংশ সোলার সিস্টেম ৬ মাসেই অকেজো! রাজশাহী চেম্বার অব কমার্স’র নির্বাচন স্থগিত তারেক রহমানের আহ্বানে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করছেন বিদ্রোহী প্রার্থিরা

কৃষাণী সুলতানার ‘কমিউনিটি বীজ ব্যাংক’

Paris
Update : মঙ্গলবার, ৩০ ডিসেম্বর, ২০২৫

স্টাফ রিপোর্টার : মানবজাতির আদি পেশা কৃষিকাজ। কৃষির ইতিহাস নারীদের হাত ধরেই। তখন থেকেই প্রয়োজনীয় খাদ্যশস্য বীজ সংরক্ষণ, শস্য রোপণ ও খাদ্য উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন নারীরা। এই কাজটি করে একদিকে নিজেদের দেশীয় জাতকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করছেন, অন্যদিকে ভবিষ্যৎ পৃথিবীর সঙ্গে সেতুবন্ধ তৈরি করছেন। যুগ যুগ ধরে নারীরাই হয়েছেন কৃষির ধারক। কৃষিতে নারীর অবদান তুলে ধরে এভাবেই বিখ্যাত ‘নারী’ কবিতায় কবি লিখেছিলেন ‘এ-বিশ্বে যত ফুটিয়াছে ফুল, ফলিয়াছে যত ফল, নারী দিল তাহে রূপ-রস-মধু-গন্ধ সুনির্মল।’ আবার নারী-পুরুষ সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় উন্নয়ন, সেই অবদানকে তুলে ধরে লিখেছেন, ‘বিশ্বে যা কিছু সৃষ্টি চির কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর’। তারই বাস্তব রুপ দিয়ে কাজ করছেন রাজশাহীর পবা উপজেলার দর্শনপাড়া ইউনিয়নের বিলনেপাল পাড়া গ্রামের কৃষাণী মোসা. সুলতানা খাতুন ও তার পরিবার। প্রাচীন সেই প্রথা টিকিয়ে রাখতে এই নারীকে স্থানীয়ভাবে দেশীয় উদ্ভিদের বীজ সংরক্ষণে সহযোগিতা করছেন বেসরকারি গবেষণা উন্নয়ন সংস্থা ‘বারসিক’।

কৃষকদের উৎসাহিত করতে তিনি কৃষি প্রতিবেশ বিদ্যা শিখন কেন্দ্রে গড়ে তুলেছেন ‘কমিউনিটি বীজ ব্যাংক’। রবিশস্য থেকে শুরু করে সোয়াস গুড়গুড়ি (আলকুশি), আমলকী, তুলসি, কালকাসিন্দা, খেসারি, যব, কাউন, তিসি, বিভিন্ন জাতের ধান, শাক-সবজি, ফুল, ফল, বনজ, ফলজ ও ঔষধি বীজ এবং গাছসহ তাঁর সংগ্রহে সংরক্ষিত রয়েছে ১৮৫ জাতের বীজ। এই ‘কমিউনিটি বীজ ব্যাংক’ থেকে বীজ নিজেরা ব্যবহারের পাশাপাশি প্রতিবেশীদের সাথে বীজ দিয়ে বীজ বিনিময় করেন। মানে ফসল করার পর যখন বীজ হয়, তখন ধার করা বীজ ফেরত দেয়া হয়। লক্ষ্য দেশি জাতের বীজ সংরক্ষণ ও জাত টিকিয়ে রাখা। প্রতিবেশিরা বাড়ির আঙিনা অথবা পতিত জমিতে প্রয়োজন অনুযায়ী বীজ নিয়ে বপন করেন। আবার মৌসুম শেষে সেখান থেকে আবার বীজ সংগ্রহ করেন। এভাবে সারা বছর বাড়িতে বিভিন্ন নিরাপদ ও পুষ্টিকর শাক-সবজি উৎপাদন করেন। নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে ভার্মিকম্পোস্ট সার ও জৈব বালাইনাশক (পরিবেশবান্ধব কীটনাশক) ব্যবহারে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করছেন। তার এসব কার্যক্রমে উদ্বুদ্ধ হয়ে নানা পদের বীজ সংরক্ষণ করছেন ওই ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের কৃষক। বীজ সংরক্ষণের ফলে পরিবারগুলোর যেমন শাকসবজির চাহিদা মিটছে, অন্য দিকে সেসব সবজি বিক্রি করে লাভবান হচ্ছেন তাঁরা। এছাড়াও নারীদের অধিকার, নারীর ক্ষমতায়ন, নারী-পুরুষের সমতা, নারীদের কাজের মূল্যায়ন ও সমাজে তাদের গুরুত্ব এবং নারী নেতৃত্ব তৈরিসহ বিভিন্ন জনসচেতনামূলক কাজ করছেন তিনি।
তালুক ধর্মপুর গ্রামের কৃষাণী শিল্পী বেগম বলেন, ‘আমরা নিজেরা দেশীয় জাতের বীজ সংরক্ষণ করি, সেই বীজ থেকেই চারা উৎপাদন করে শাক-সবজি চাষ করি। পাড়ার যাঁদের যে বীজ প্রয়োজন হয়, তাঁরা ‘কমিউনিটি বীজ ব্যাংক’ থেকে নিয়ে যায় আবার উৎপাদিত ফসলের বীজ সেখানে জমা রাখে। এতে বাড়িতে বারো মাসই সবজি থাকে। বাজার থেকে সবজি কিনতে হয় না। অন্যদেরকেও দেওয়া যায়। শাক-সবজির কখনো ঘাটতি হয় না। আর বাড়ির এসব শাকসবজি নিরাপদ ও বিষমুক্ত হয়।’
উপসহকারি উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা হাফিজুর রহমান বলেন, ‘নারীরা নিজেদের ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে দেশীয় জাতকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করছেন। আগে আমাদের মা-চাচি, দাদা-দাদিরা বাড়িতে দেশীয় জাতের বীজ সংরক্ষণ করতেন। কালের আবর্তে তা হারিয়ে যাচ্ছে। দেশীয় জাতের বীজ থেকে হওয়া গাছে পোকা কম হয়। এ কারণে তাতে সার ও কীটনাশক দেওয়ার প্রয়োজন হয় না তেমন। কৃষকরা নিজেদের উৎপাদিত দেশীয় ফসলের বীজ যদি নিজেরা সংরক্ষণ করে তাহলে জাতগুলো টিকে থাকবে। এর ফলে ওই পরিবারগুলো নিরাপদ সবজিসহ পুষ্টির চাহিদা মেটাতে পারে।’
বেসরকারি গবেষণা উন্নয়ন সংস্থা বারসিক’র আঞ্চলিক সমন্বয়কারী মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘বীজ সার্বভৌমত্ব¡, বীজের অধিকার নিশ্চিত করতে কমিউনিটি পর্যায়ে এরকম গড়ে উঠা বীজ ব্যাংকগুলো দেশের স্থায়ীত্বশীল কৃষির উন্নয়নে অন্যতম ভূমিকা পালন করতে পারে। সরকারীভাবে দেশি বীজ সুরক্ষায় এরকম কমিউনিটি ভিত্তিক দেশি বীজের জীন ব্যাংক তৈরী করতে নীতিগতভাবে সিদ্ধান্ত ও বাস্তবায়ন করা দরকার।’

উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ এম এ মান্নান বলেন, ‘আগেকার দিনে কৃষকের বাড়িতে সংরক্ষিত থাকতো বিভিন্ন ফসলের বীজ। উৎপাদিত সবজি থেকে পরের বছর বপণের জন্য কৃষক বিভিন্ন মাটির পাত্রে বীজ সংরক্ষণ করার পাশাপাশি অন্যদের কাছে বিনিময়ও করতো কিন্তু নানা কারণে তা হারিয়ে যেতে বসেছে। নারীদের দেশি জাতের বীজ সংরক্ষণের এমন উদ্যোগ সত্যিই বেশ প্রশংসনীয়। প্রত্যন্ত অঞ্চলে ‘কমিউনিটি বীজ ব্যাংক’ এর মাধ্যমে কৃষির এতিহ্য টিকিয়ে রাখতে গ্রহনকৃত উদ্যোগগুলো দেখে ভাল লাগলো। এই উদ্যোগগুলো উপজেলার অন্যান্য গ্রামে বিস্তার করলে গ্রামের কৃষাণ-কৃষাণীরা অনেক উপকৃত হবে। উপজেলা কৃষি অফিসের কর্মকর্তাগণ কৃষি সম্প্রসারণে মাঠ পর্যায়ে কাজ করছে। এধরনের সৎ উদ্যোগের পাশে কৃষি অফিসের সব ধরনের সহযোগিতা সর্বদা অব্যাহত থাকবে।’


আরোও অন্যান্য খবর
Paris