স্টাফ রিপোর্টার, লালপুর : নাটোর লালপুরের গোপালপুর পৌরসভা এলাকার বিরোপড়া গ্রামে কেঁচো সার বা ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদন করে নিজেদের ভাগ্য বদলে ফেলেছেন জুননুন রোমিও ও তাহামিদা মোস্তফা সাথী জুটি। একসময় সংসারের টানাপোড়নে জর্জরিত এই স্বামী ও স্ত্রীর জুটি এখন স্বাবলম্বী। তাদের হাতে উঠে এসেছে মাটির গন্ধ আর জীবনের স্বপ্ন বাস্তবায়ের আশার আলো। সার তৈরির খামারে গেলেই চোখে পড়ে একচালা টিনের ঘর। আর ঘরের ভিতরে সারি সারি ইটের তৈরি বড় বড় ব্যাডে মাটির গন্ধ ও জীবন্ত কেঁচো চলাচল। ৪৬ টি ব্যাডে উৎপাদন করা হয় পরিবেশবান্ধব জৈব সার। উপকরণ হিসেবে জীবন্ত থাইল্যান্ড ও সাউথ আফ্রিকান জাতের কেঁচোর সাথে ব্যবহার করা হয় গবর, কচুরিপানা ও কলাগাছের কুচি সহ বাবহার করা চায়ের পাতি। কেঁচো ছাড়া কোন উপকরণ ক্রয় করা লাগে না। প্রতি মাসে ১০ থেকে ১২ মণ জৈব সার উৎপাদন হয়। খামারে এখন কেঁচো নিজস্ব বংশবিস্তার হচ্ছে তাই আর বাইরে থেকে কেঁচো ক্রয় করার প্রয়োজন হয় না। বর্তমান প্রথমে ৫ লাখ টাকার আফ্রিকান ও দেশীয় কেঁচো ক্রয় করা লেগেছে। এখন খামারে প্রায় ১৫ লাখ টাকার আফ্রিকান ও দেশীয় জীবন্ত কেঁচো আছে। ২০২৩ ইং সালে সিরাজগঞ্জে শক্তি ভার্মি কম্পোস্ট নামের এক সংস্থা থেকে প্রশিক্ষন গ্রহণ করেন জুননুন রোমিও আর তাহামিদা মোস্তফা সাথী লালপুরের এক উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ও তার সহধর্মণীর নিকট থেকে উৎসাহ পেয়ে স্বামী ও স্ত্রী দুইজনের পথ চলা শুরু হয়। প্রথম যখন কেঁচো সার উৎপাদন কাজ শুরু করেন তখন ছিল নানা সমস্যা,আর্থিক সংকট ও উপহাস। ব্যাংক ও এনজিও থেকে ঋৃণ নেন ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা আর নিজেদের ৫০ হাজার টাকা মোট ৫ লাখ টাকা নিয়ে শুরু হয় তাদের জীবন সংগ্রাম। এখন তার খামার দেখতে দেশের বিভিন্ন এলাকার মানুষ আসে। খামের প্রতিদিন সকাল ৮ টা থেকে দুপুর ১ টা পর্যন্ত ২শ টাকা মুজুরিতে ৬জন শ্রমিক কাজ করেন। প্রতি মাসে ১০ থেকে ১২ মণ জৈব সার উৎপাদন হয় আর তারা প্রতি কেজি সার পাইকাড়ি বিক্রয় ১২ টাকা এবং খুচরা বিক্রয় করেন ১৫ টাকা। উৎপাদিত সার প্রতি মাসে দুই ধাপে ১০ থেকে ১২ টন সার বিক্রিয় করা হয়। সব খরচ বাদ দিয়ে প্রতি মাসে ৫০ থেকে ৫৫ হাজার টাকা লাভ করেন রোমিও ও সাথী জুটি। তাদের খামারের নাম রাখা হয়েছে তামান্না-সাথী অর্গানিক ফার্টিনাইজার। এবিষয়ে জুননুন রোমিও বলেন, ঢাকার এক বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করতাম। পরে চাকরি ছেড়ে বাড়ীতে চলে আসি। কোন কাজকর্ম না থাকায় বেকার হয়ে যায়। অর্থ সংকটে সংসারে অভাব দেখা দেয়। আমার স্ত্রীর উৎসাহে আমি ২০২৩ ইং সালে সিরাজগঞ্জে শক্তি ভার্মি কম্পোস্ট নামের এক সংস্থা থেকে প্রশিক্ষন গ্রহণ করি। পরে ব্যাংক এবং এনজিও থেকে ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা ঋৃণ নিয়ে ৫ লাখ টাকা দিয়ে আফ্রিকান ও থাইল্যান্ডের কেঁচো ক্রয় করে জৈব সার উৎপাদন শুরু করি। উপজেলা কৃষি আফিস ও স্থানীয় কৃষকরা সহ বিভিন্ন এলাকার সার ডিলার এসে সার ক্রয় করে নিয়ে যায়। এবিষয়ে তাহামিদা মোস্তফা সাথী বলেন, চাকরির পিছুনে না ছুটে ব্যাংক ও এনজিও থেকে ঋৃণ নিয়ে আমি ও স্বামী কেঁচো সার উৎপাদন শুরু করি। অনেক কষ্টের পথ পাড়ি দিয়ে আজ আমরা অর্থিক ভাবে স্বাবলম্বী হয়েছি। এজন্য আল্লাহু রাব্বুল আলামীন কে জানাই হাজার হাজার শুকরিয়া। এবিষয়ে উপজেলার শ্বালেশর গ্রামের পেয়ারা চাষী খোরশেদ আলম গাজী বলেন,জুননুন এর কেঁচো দিয়ে উৎপাদিত জৈব সার খুবই ভালো এবং উন্নত মানের। পেয়ারা বাগানে এই সার দেওয়া হলে অন্য সারের প্রয়োজন হয় না। এবিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা প্রীতম কুমার হোড় বলেন,মোঃ জুননুন গত ৩ বছরে তার নিজস্ব খামারে ভার্মি কম্পোস্ট বা কেঁচো সার উৎপাদন করেছেন। তার উৎপাদিত ঁেচো সার উপজেলার বিভিন্ন কৃষকের মাঝে বিক্রি করে আর্থিক ভাবে স্বাবলম্বী হয়েছেন এবং তার খামারে কৃষি শ্রমিকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছেন। এতে তিনি যেমন আর্থিক ভাবে লাভবান হচ্ছেন তেমনি উপজেলার কৃষি জমি স্বাস্থ্য রক্ষার্থে ভূমিকা রাখছেন। কৃষি বিভাগ থেকে তার উৎপাদিত কেঁচো সার কম্পোস্ট বিপণনে সহযোগিতা করা হচ্ছে এবং পরবর্তীতে তার এই কেঁচো কম্পোস্ট উৎপাদনে সরকার কর্তৃক আর্থিকভাবে যাতে সহায়তা করা হয় এব্যাপারে পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।