রাজধানীর পল্লবীতে শিশু রামিসার হত্যাকারীর সর্বোচ্চ শাস্তি আগামী ১ মাসের মধ্যে নিশ্চিত করার ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, সেই সর্বোচ্চ শাস্তি হবে মৃত্যুদণ্ড। শনিবার (২৩ মে) দুপুরে ময়মনসিংহের ত্রিশালে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মজয়ন্তী অনুষ্ঠানের উদ্বোধন মঞ্চে প্রধানমন্ত্রী এমন ঘোষণা দেন। এসময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঢাকার মিরপুরে একটি নিষ্পাপ মেয়ের নির্মম মৃত্যুর মাধ্যমে মানুষের মানবিক মূল্যবোধে চূড়ান্ত অবক্ষয়ের প্রমাণ মিলেছে। এ বিষয়ে একটি কথা আজকের এই অনুষ্ঠানে আমি পরিষ্কারভাবে আপনাদের সামনে তুলে ধরতে চাই। এই ধরনের শিশু নির্যাতন বা নারী নির্যাতন বর্তমান সরকার কোনোভাবেই মেনে নেবে না। তিনি আগামী ১ মাসের মধ্যে শাস্তি নিশ্চিতের ঘোষণা দিয়ে বলেন, যাতে করে ভবিষ্যতে আর কোনো ব্যক্তি এভাবে শিশু বা নারী নির্যাতন করার সাহস না পায়। এর আগে গতকাল শনিবার বেলা আড়াইটার দিকে ময়মনসিংহের ত্রিশালে ধরার খাল পুনর্খনন কার্যক্রম উদ্বোধনের পর এক জনসভায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, রামিসার ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক। সরকার আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে চায়, কেউ অপরাধ করলে তাকে শাস্তি পেতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশ ও কাজী নজরুল ইসলাম এক অবিভাজ্য সত্তা। তিনি আমাদের জাতীয় সত্তার সার্থক প্রতিনিধি। আমাদের জাতীয় চেতনার প্রতীক, আমাদের জাতীয়তাবাদের প্রতীক। জাতীয় কবির জন্মদিনে আমরা অন্যায়, অবিচার, ক্ষুধা, দারিদ্র ও বিপদের গ্লানি মুছে ফেলি। সবার আগে বাংলাদেশকে ধারণ করি। শনিবার দুপুর ৪টা ২৭ মিনিটে ময়মনসিংহের ত্রিশালে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মজয়ন্তীর তিনদিনব্যাপী জাতীয় পর্যায়ের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য তিনি এ কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগামী ২৫ মে বাংলাদেশের জনগণের পরম প্রিয়জন কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মবার্ষিকী। তার চীর অম্লান স্মৃতির প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। কৃতজ্ঞতার সঙ্গে তাকে স্মরণ করছি। ২০০৬ সালের পর থেকে জাতীয় কবির অমর স্মৃতি বিজড়িত ত্রিশালে জাতীয় পর্যায়ে নজরু জয়ন্তী উদযাপন হয়নি। প্রায় দু-দশক পর আজ পুনরায় রাষ্ট্রীয়ভাবে জাতীয় কবির জন্মজয়ন্তী আয়োজন করতে পেরে সরকার গৌরব বোধ করছে। এ অনুষ্ঠানে অনেকে হয়তো একটি নামের সঙ্গে পরিচিত, আমি এ রকম একটি মানুষকে গভীর কৃতজ্ঞতায় স্মরণ করতে চাই, তিনি ছিলেন মরহুম দারোগা রফিজ উল্লাহ। এই মানুষটি ১৯১৪ সালে কবি নজরুল ইসলামকে ত্রিশালের কাজির শিমলা গ্রামে নিজ বাড়িতে এনে আশ্রয় দিয়েছিলেন। আমাদের জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের যদি আমরা গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ কিংবা বরণ করতে না পারি এটি তাদের নয় বরং জাতি হিসেবে আমাদেরই দৈন্যতা প্রকাশ পায়। এ প্রজন্মের অনেকেই হয়তো জানেন না। ১৯৭৬ সালে ঢাকার শেরে বাংলা উদ্যানে জাতীয় কবির নামাজে জানাজার পর কবির লাশবাহী খাটিয়া যারা কাঁধে করে বহন করেছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। ১৯৭৯ সালের ২৫ মে জাতীয় কবির জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে ঢাকার ফার্মগেট থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কবির মাজার পর্যন্ত অনুষ্ঠিত একটি র্যালিতেও অংশ নিয়েছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। ত্রিশালে জাতীয় কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন দেশনেত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়া। এভাবে জাতির কবির প্রতি সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা এবং সম্মান প্রদর্শনের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে কাউকে সম্মান জানালে নিজের সম্মান নষ্ট হয় না বরং বিনয় মানুষকে মহিমান্বিত করে। আমি মনে করি এইসব কালজয়ী আদর্শ থেকে দূরে চলে যাওয়ার কারণেই বর্তমানে আমাদের সমাজে মূল্যবোধের অবক্ষয় দৃশ্যমান। তিনি আরও বলেন, আমাদের জাতীয় ইতিহাসে অবিস্মরণীয় নাম কাজী নজরুল ইসলাম। পরাধীন, পর্যুদস্ত, পরাবত জাতির ভাগ্য আকাশে তার আবির্ভাব ছিল আলোকবর্তিকার মতন। আমাদের আশা, আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন, সংগ্রাম, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য তার রচনার মধ্যে মহিমাময় সৌন্দর্য নিয়ে বাকসময় রয়েছে। বিপ্লব, বিদ্রোহ কিংবা রণসঙ্গীত, ইসলামী তাওয়িজ, তমদ্দুন কিংবা ইসলামী মূল্যবোধের গান অথবা ভজন, কীর্তন কিংবা শ্যামা সঙ্গীত, প্রেম প্রকৃতি কিংবা মানবিক মূল্যবোধ, কৈশোরের আনন্দ কিংবা যৌবনের উন্মাদনা প্রতিটি ক্ষেত্রেই নজরুল ইসলাম আমাদের শুদ্ধ প্রকাশ। কাজী নজরুল ইসলাম মানেই বাংলা সাহিত্যে এক নতুন ভোরের উদয়। বাংলা সাহিত্যের এক নতুন রুচির বিপ্লব। তিনিই কবিতায় এনেছেন যুদ্ধের গর্জন। কণ্ঠে তুলে নিয়েছেন রাষ্ট্রীয় এবং আর্থিক স্বাধীনতার বজ্রনিদাত। তিনি ছিলেন নারী অধিকারী, মেহনতি মানুষের কল্যাণ আর অসাম্প্রদায়িক বিশ্ব মানবতার এক অনন্য ফেরিওয়ালা। এই মহাকবি বাংলাদেশের অবমানকালের সংস্কৃতির চিরযৌবনের প্রতীক। আমাদের হৃদয়ে জাগ্রত হয়ে আছেন। ইনশাল্লাহ থাকবেন। তিনি আরও বলেন, দীর্ঘদিনের ফ্যাসিবাদী শাসন শুধুমাত্র দেশের মানুষের অধিকার আর দেশের অর্থ সম্পত্তি লুট করেনি। বিচার বিভাগসহ দেশের সমস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করে দিয়েছে। সবচেয়ে যেটি বড় ক্ষতি হয়েছে, বিশেষ করে বিতারিত ফ্যাসিবাদের সময়ে মানবতা, মানবিকতা এবং দেশের আবহমানকালের ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধগুলোকে একেবারেই বিনষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। ঢাকার মিরপুরে একটি নিষ্পাপ মেয়ের নির্মম মৃত্যুর মাধ্যমে মানুষের মানবিক মূল্যবোধের চূড়ান্ত অবক্ষয়ের চূড়ান্ত প্রমাণ মিলেছে। এ বিষয়ে একটি কথা আজকের এই অনুষ্ঠানে আমি পরিষ্কারভাবে আপনাদের সামনে তুলে ধরতে চাই। এ ধরনের শিশু নির্যাতন বা নারী নির্যাতন বর্তমান সরকার কোনোভাবেই মেনে নিবে না এবং বর্তমান সরকার রামিসার এই হত্যাকারীর সর্বোচ্চ শাস্তি আগামী এক মাসের মধ্যে নিশ্চিত করবে এবং সেই সর্বোচ্চ শাস্তি হচ্ছে মৃত্যুদণ্ড। যাতে করে ভবিষ্যতে আর কোনো ব্যক্তি মানুষ এইভাবে শিশু বা নারী নির্যাতন করার সাহস না পায়। প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটি নিরাপদ মানবিক রাষ্ট্র এবং সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে হলে আমাদের আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতেই হবে। রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন ঘটাতে হবে। একই সঙ্গে আমাদের জাতীয় জীবনে পুনরায় বাংলাদেশের আবহমানকালের ধর্মীয়, সামাজিক, সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের পুনর্জীবন ঘটাতে হবে। এক্ষেত্রেও কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবন এবং কর্ম আমাদের জন্য প্রাসঙ্গিক। তিনি আরও বলেন, কবি নজরুলের জীবন এবং কর্ম বিশ্ব সাহিত্য দরবারে আরও বেশি ছড়িয়ে দেওয়া প্রয়োজন। তার জীবনবোধ, তার জীবন দর্শন প্রজন্মের পর প্রজন্ম পৌঁছে দিতে হবে। এরই অংশ হিসেবে আমাদের জাতীয় কবির স্মৃতি বিজড়িত ত্রিশালকে নজরুল সিটি হিসেবে ঘোষণা করা যায় কিনা এর ব্যাপারে সম্ভাবনাসম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য আমি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় এবং পর্যটন বিভাগের প্রতি আহ্বান জানাব। অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরীসহ রাষ্ট্রীয় অতিথিরা। এছাড়া অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন- ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু, বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স, বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী শরীফুল আলম, ত্রাণ ও দুর্যোগ প্রতিমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার এম ইকবাল হোসাইন, তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী, বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী রাশিদুজ্জামান মিল্লাত, জামালপুরের এমপি শাহ ওয়ারেস আলী মামুন, ময়মনসিংহ-৪ আসনের এমপি আবু ওয়াহাব আকন্দ ওয়াহিদ, ময়মনসিংহ-৫ আসনের এমপি জাকির হোসেন বাবলু, ত্রিশালের এমপি ডা. মাহাবুবুর রহমান লিটন, গফরগাঁওয়ে এমপি আকতারুজ্জামান বাচ্চু, ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক রুকুনোজ্জামান রোকন, জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. সাইফুর রহমান প্রমুখ-এফএনএস