বৃহস্পতিবার

৩০শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

১৭ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মাদক-ভেজাল খাবারের বিরুদ্ধে গোদাগাড়ীর ইউএনও’র লড়াই

Paris
Update : রবিবার, ২৯ জুন, ২০২৫

শহিদুল ইসলাম, গোদাগাড়ী : মাদক আর ভেজাল খাবার উৎপাদনের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করেছেন রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফয়সাল আহমেদ। পাশাপাশি মাদকপ্রবণ এই উপজেলার যুবসমাজকে খেলাধুলায় আকৃষ্ট করতে কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। মাথায় রেখেছেন শিশুদের কথাও। তাদের জন্য উপজেলা ক্যাম্পসের ভিতরে তৈরি করেছেন শিশু পার্ক এবং ০৯ টি ইউনিয়ন পরিষদে এমন শিশু পার্ক তৈরি করা হবে। এ সব কর্মকাণ্ডে প্রংসিত হচ্ছেন তিনি। উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ইউএনও ফয়সাল আহমেদ গোদাগাড়ীতে আসার পর থেকেই সাধারণ মানুষের নিরাপদ খাবার নিশ্চিতের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন। প্রায়ই তিনি বাজারে ভেজালবিরোধী অভিযান চালাচ্ছেন। বিশেষ করে উপজেলার বেকারি কারখানাগুলোকে নজরদারির আওতায় এনেছেন তিনি। এছাড়া অবৈধ পুকুর খনন বন্ধ ও বাল্য বিবাহ বন্ধে অভিযান চালাচ্ছেন। নিয়মিত পরিদর্শনের মাধ্যমে উন্নয়ন প্রকল্প যথাযথভাবে বাস্তবায়নের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। গোদাগাড়ী উপজেলায় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮ অনুযায়ী সম্প্রতি একটানা অভিযান চালিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। বিভিন্ন এলাকায় পরিচালিত মোবাইল কোর্টে একাধিক হোটেল, বেকারি ও খাদ্যদ্রব্য বিক্রেতাকে জরিমানা করা হয়েছে। এরমধ্যে গত ২৬ জুন কাঁকনহাট এলাকায় পরিচালিত ইউএনও’র অভিযানে মোবাইল কোর্টে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও সঠিক লেবেলিং না থাকায় কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হয়। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী ‘আব্দুল্লাহ মিষ্টান্ন ভান্ডার’কে পাঁচ হাজার টাকা, ‘আব্দুল্লাহ হোটেল’কে পাঁচ হাজার টাকা, ‘মাসুদ হোটেল’কে পাঁচ হাজার টাকা, ‘সোহাগ হোটেল’কে দুই হাজার টাকা এবং ফাউজিয়া বেগমকে পাঁচশ টাকা অর্থদণ্ড প্রদান করা হয়। আগের দিন ২৫ জুন গোদাগাড়ী পৌরসভার মহিশালবাড়ী, রেলবাজার ও সিএন্ডবি এলাকায় মোবাইল কোর্ট পরিচালিত হয়। অভিযানে বাসী-পচা খাবার, পোড়া তেল, নিষিদ্ধ ক্যামিকেল (হাইড্রোজ) ব্যবহার এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাবার প্রস্তুত রাখার অভিযোগে কয়েকজনকে এক হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা করা হয়। এর আগের দিন ২৪ জুন মহিশালবাড়ী এলাকার ‘উজ্জ্বল বেকারির’ মালিক সেতাবুর রহমানকে ইন্ডাস্ট্রিয়াল রং, মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য বিক্রি ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাদ্য প্রস্তুতের দায়ে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। একইদিন মোহনপুর, বাসুদেবপুর ও গোদাগাড়ী পৌর এলাকার কিছু অংশে পরিচালিত মাদকবিরোধী টাস্কফোর্স অভিযানে আব্দুল আলিমকে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এই অভিযানে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন অনুযায়ী ইউসুফ আলী নামের এক ব্যক্তিকে দুই বছর বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও দেড় হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। একই অপরাধে ফিরোজ কবির, শামীম রেজা, সেলিনা বেগম, শাহ আলম, মো. মফিজ এবং মুকুল ডোমকে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড প্রদান করা হয়। গত ২১ জুন মাটিকাটা ইউনিয়নের গোপালপুর এবং দেওপাড়া ইউনিয়নের রাজাবাড়ীহাট এলাকায় মোবাইল কোর্ট পরিচালিত হয়। খাদ্যে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর রাসায়নিক, মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য বিক্রি এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাবার সংরক্ষণের দায়ে ‘খাইরুল হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট’কে দুই হাজার, ‘চাঁপাই হোটেল’কে পাঁচ হাজার এবং মো. টনি নামে একজনকে দুই হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এছাড়া ২০ জুন আইহাই রাহী এলাকায় পরিচালিত মোবাইল কোর্টে হোটেল, মিষ্টির দোকান, মুদিখানা ও ফলের দোকানে মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য, নিষিদ্ধ দ্রব্য এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাদ্য সংরক্ষণের দায়ে কয়েকজনকে এক হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা করা হয়। আগের দিন ১৯ জুন ‘আসমা বেকারি অ্যান্ড কনফেকশনারি’কে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাদ্য প্রস্তুত ও ভেজাল পণ্য উৎপাদনের দায়ে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী তিন হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। একই দিনে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন অনুযায়ী চৌদুয়ার গ্রামের সূর্য রায়কে ছয় মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং জরিমানা করা হয়। মাদকবিরোধী কার্যক্রমের অংশ হিসেবে গোদাগাড়ী উপজেলায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, পুলিশ বাহিনী ও উপজেলা প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগে ধারাবাহিকভাবে অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। এসব অভিযানে নেতৃত্ব দিচ্ছেন ইউএনও। এ অভিযানে একদিকে যেমন মাদকসেবী ও ব্যবসায়ীদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে, অন্যদিকে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করতেও নেওয়া হচ্ছে নানা পদক্ষেপ। গত ২৩ জুন গোদাগাড়ী উপজেলায় মাদকবিরোধী টাস্কফোর্স অভিযান পরিচালিত হয়। এ অভিযানে সাতজন মাদকসেবী ও মাদক ব্যবসায়ীকে আটক করে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন অনুযায়ী প্রত্যেককে দুই বছর করে বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ড প্রদান করা হয়। এর আগে কাকনহাট পৌরসভার অধীন কাকনপাড়া এলাকায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সমন্বয়ে এবং পুলিশ বাহিনীর সহযোগিতায় যৌথ অভিযান পরিচালিত হয়। অভিযানে দুইজন ব্যক্তিকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮ অনুযায়ী ৬০ দিন ও ১০ দিন বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করেন। যুবসমাজকে খেলাধুলায় আকৃষ্ট করতে ইউএনও ফয়সাল আহমেদ নিজেই ফুটবল হাতে ছুটে যাচ্ছেন খেলার মাঠে। আবার অফিসে ডেকেও বিভিন্ন ক্লাবকে খেলার সামগ্রী দিচ্ছেন তিনি। শিশুদের কথা চিন্তা করে ইউএনও উপজেলা পরিষদ চত্বরে গড়েছেন শিশুপার্ক। এখানে আশপাশের শিশুরা গিয়ে বিনোদনের খোরাক মেটাচ্ছে। এমন উদ্যোগের প্রশংসা করছেন অভিভাবকেরা। এদিকে ক্রীড়া চর্চা ও গ্রাম পর্যায়ে খেলাধুলার প্রসারে উপজেলা প্রশাসন এবং উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার সম্মিলিত উদ্যোগেও বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। খেলার সামগ্রী বিতরণ থেকে শুরু করে প্রীতি ফুটবল ম্যাচ আয়োজন এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা-সব মিলিয়ে এক প্রাণবন্ত পরিবেশ সৃষ্টি হচ্ছে স্থানীয় ক্রীড়াঙ্গনে। গত ২৬ জুন গোদাগাড়ী উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও পৌরসভার ওয়ার্ডভিত্তিক স্পোর্টিং ক্লাবগুলোতে খেলার সামগ্রী বিতরণ করেন ইউএনও ফয়সাল আহমেদ। উপজেলা প্রশাসনের নিজস্ব কার্যালয় থেকে এই বিতরণ কার্যক্রম পরিচালিত হয়। খেলোয়াড়দের মধ্যে ফুটবল, জার্সি, হুইসেল, জাল, স্টপওয়াচসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম পৌঁছে দেওয়া হয়। এর আগে ১৯ মে গোগ্রাম ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ড স্পোর্টিং ক্লাবের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে খেলার সামগ্রী হস্তান্তর করা হয়। সেদিন নিজেই সেখানে যান ইউএনও। গত ১০ মে গোগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের মাঠে অনুষ্ঠিত হয় প্রীতি ফুটবল ম্যাচ-২০২৫। স্থানীয় তরুণদের অংশগ্রহণে আয়োজিত এই ম্যাচে দর্শকদের বিপুল সাড়া লক্ষ্য করা যায়। খেলা দেখতে যান ইউএনও। তিনি সবাইকে উৎসাহ দেন। স্থানীয় ক্লাবগুলোর চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে এই বিতরণ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। গোদাগাড়ী উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, উপজেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে অচিরেই একটি বৃহৎ ফুটবল প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হবে। এতে ইউনিয়ন পর্যায়ের দলগুলো অংশগ্রহণ করবে। প্রশাসনের এই উদ্যোগ গ্রামাঞ্চলের খেলোয়াড়দের মাঝে উৎসাহ তৈরি করবে এবং ভবিষ্যতে জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ের মানসম্মত খেলোয়াড় তৈরিতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন সংশ্লিষ্টরা। এসব বিষয়ে জানতে চাইলে ইউএনও ফয়সাল আহমেদ বলেন, গোদাগাড়ী উপজেলা একটি উন্নত মানের মডেল উপজেলা হিসাবে গড়ে তোলা সহ মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স, বাল্য বিবাহ প্রতিরোধ, বিনোদনের জন্য গোদাগাড়ী পৌরসভাসহ ০৯টি ইউনিয়নে শিশু পার্ক গড়ে তোলা সহ যুবকদের মনোবিকাশের জন্য পর্যাপ্ত খেলাধুলা সামগ্রী হাতে তুলে দিতে কাজ করছি। তাই উপজেলা সর্বস্থরের মানুষের সহযোগিতা কামনা করছি। এদিকে উপজেলা নির্বাহী অফিস ফয়সাল আহমেদ সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে গোদাগাড়ী পৌর বিএনপির নেতা গোলাম কিবরিয়া রুলু জানান উপজেলা নির্বাহী অফিসার ফয়সাল আহমেদ অত্যান্ত ভাল মনের মানুষ। তিনি যোগদানের পর যে সব কাজ করেছেন সেগুলো প্রসংসার দাবীদার।


আরোও অন্যান্য খবর
Paris