শাহানুর রহমান রানা : সমাজসেবা অধিদফতরের আওতায় পরিচালিত বিভিন্ন কার্যক্রমের মধ্যে ‘ভিক্ষুক পুনর্বাসন ও বিকল্প কর্মসংস্থান’ রাজস্ব বাজেটে পরিচালিত একটি অন্যতম কর্মসূচি। সেই প্রকল্পের আওতায় ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রাজশাহী জেলার জন্য প্রাপ্ত মোট বরাদ্দের পরিমাণ ছিল ১৭ লাখ ১৫ হাজার টাকা। তবে, কিস্তির সংখ্যা (চার কিস্তি) বিবেচনায় এর পরিমাণ দাড়ায় ১৭ লাখ ৮৮ হাজার ৬৪ টাকা বলে জানান রাজশাহী জেলা সমাজসেবা কার্যালয় সূত্র। জানতে চাইলে সহকারি পরিচালক রবিউল ইসলাম ও সমাজসেবা অফিসার (রেজিঃ) মোঃ মতিনুর রহমান জানান (তথ্য অধিকার আইনে আবেদনের মাধ্যমে), ২০২৩-২৪ অর্থবছরে শহরাঞ্চলের (রাজশাহী মহানগর) জন্য বরাদ্দ ছিল ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা। আর জেলার মোট সাতটি উপজেলার জন্য বরাদ্দের পরিমাণ ছিল ১৩ লাখ ৬৫ হাজার টাকা। এরমধ্যে, পুঠিয়া ও দূর্গাপুর উপজেলার জন্য বরাদ্দ তিন লাখ করে, পবা ও বাঘা উপজেলার জন্য বরাদ্দ ছিল ২ লাখ ৫০ হাজার করে, তানোর ও মোহনপুর উপজেলার জন্য ১ লাখ করে। আর চারঘাট উপজেলার জন্য বরাদ্দ ছিল ৬৫ হাজার টাকা।
মহানগর ও উপজেলা ভিত্তিক বরাদ্দ, বিভাজন ও পুনর্বাসন চিত্রের অবস্থা সরেজমিনে জানার চেষ্টা করলে বেড়িয়ে আসে অনেক অজানা তথ্য ও বরাদ্দের বিপরীতে বাস্তবচিত্রের কিছু ভিন্নতা। সংশ্লিষ্ট কর্তা ও দপ্তরের কাছ থেকে শহর কেন্দ্রিক সংশ্লিষ্ট তথ্য কিছুটা পেলেও; উপজেলা ভিত্তিক সর্বমোট বরাদ্দ ব্যতীত সেটির বিভাজন ও পরবর্তী অবস্থা বা চিত্র সম্পর্কে তেমন কোন তথ্য দায়িত্বরতদের কাছ থেকে পাওয়া যায়নি। যেটুকু তথ্য নেয়া সম্ভব হয়েছে, সেটিও আবার তথ্য অধিকার আইনে দরখাস্তের মাধ্যমে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কর্মরতদের অনেকেই বলেন, নগরীর বিভিন্ন ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলরদের কার্যালয় থেকে প্রেরিত তালিকানুযায়ী পুনর্বাসন ও বিকল্প কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে ভিক্ষুক/ভিক্ষুক পরিবারকে অর্থ সহায়তা/কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দেয়া হয়েছে। সেক্ষেত্রে বিগত সময়ের সরকারদলীয় নেতাকর্মীদের দেয়া তালিকার মধ্য থেকে তাদের নির্বাচিত ব্যক্তিদেরকেই দেয়া হয়েছে সরকারি প্রকল্পের সহায়তা। তারই ধারাবাহিকতায় প্রথমদফায় রাসিকের একটিমাত্র ওয়ার্ডেই দেয়া হয়েছিল বরাদ্দের প্রায় অর্ধেক অর্থ। নগরীর ৫ নং ওয়ার্ডের কয়েকজন ভিক্ষুক জনপ্রতি পেয়েছিলেন পঞ্চাশ হাজার টাকার সমমূল্যের সহায়তা। আর বাকি অর্থ থেকে গেছে অবন্টিত। শহরে নাকি ভিক্ষুক খুজে পাওয়া যায়নি; আর পেলেও অনেকেই এই অর্থ সহায়তা নিতে রাজি হননি বলে দাবি শহর সমাজসেবা কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের। স্থানীয়রা জানান, প্রকৃত অর্থে যেসকল ভিক্ষুক সহায়তা পাবার উপযুক্ত ছিলেন; তারা কেউই সহায়তা পাননি। যেটুকু দেয়া হয়েছে তাও আবার দলীয় বিষয়টিকে প্রাধান্য দিয়ে। সূত্র জানায়, গেলবছরের ২৪ এপ্রিল রাজশাহী সমাজসেবা কার্যালয়ে ‘ভিক্ষুক পুনর্বাসন ও বিকল্প কর্মসংস্থান’ কর্মসূচীর দ্বিতীয় তালিকা পৌছায়। দ্বিতীয় তালিকাতেও চলে দলের নেতাকর্মীদের স্বজনপ্রীতি বলে মন্তব্য স্থানীয়দের।
সামাজসেবা কার্যালয়ের এক কর্মকর্তার দেয়া তথ্যানুযায়ী, মহানগরের জন্য প্রথম ধাপে সাতজনের নামে মোট ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ এলেও সুবিধা ভোগ করেছেন মাত্র তিনজন। বরাদ্দকৃত একটি চেকের প্রাপক (ভিক্ষুক) এখনো পর্যন্ত বুঝে নেয়নি বলে দাবি কর্মকর্তাদের।
সরেজমিনে গিয়ে দেখাগেছে, সাতজনের মধ্যে যে তিনজন ভিক্ষুককে পুনর্বাসনের পঞ্চাশ হাজার টাকার চেক সহায়তা প্রদান করা হয়েছে; তাদের মধ্যে একজন ইতোমধ্যেই মৃত্যুবরণ করেছেন। নগরীর ৫ নং ওয়ার্ডের মহিষবাথান এলাকার উপকারভোগী (ভিক্ষুক) মনির খানের স্ত্রী আকলিমা বলেন, আমাদের নামে চেক ইস্যু করা থাকলেও আমরা নগদ টাকা হাতে পায়নি। ব্যবসা শুরু করার জন্য কয়েকজন এসে আমাদেরকে কিছু জিনিসপত্র কিনে দিয়েছেন। এরপর আজ অবদি কোন কর্মকর্তা আর কোন খোজখবর নেয়নি বলে দাবি মনিরের স্ত্রী আকলিমার। আকলিমা আরো জানান, বিশ হাজার টাকা ধার করে পুরাতন একটা ভ্যান কিনেছি। ঐ ভ্যানে করে আমার নাতি রাজশাহী কোর্ট স্টেশনের পাশে ফুসকা-চটপটি বিক্রি করে। একই ওয়ার্ডের মহিষবাথান উত্তরপাড়া এলাকার উপকারভোগী সুফিয়া রেললাইনের পাশে বসিয়েছেন ভাঙ্গাচোড়া ছোট্ট একটি কাঠের ঢোপ দোকান। দোকানটিতে সর্বসাকুল্যে পণ্য-সামগ্রী আছে পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকার মতো। অর্থসহায়তার বিষয়ে তিনি শুধু বলেন, পেয়েছি; সেটা দিয়েই তো ব্যবসা করছি। শীতের সময় এখানেই ধুপিও বিক্রি করি। টাকা পেয়েছেন নাকি দোকানের মালামাল (পণ্য-সামগ্রী) প্রশ্নের জবাবে সুফিয়া আবারো উত্তর দেন পেয়েছি। ভিক্ষাবৃত্তিতে নিয়োজিত ব্যক্তির কর্মসংস্থানের জন্য দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা ভিত্তিক উপার্জনমুখী প্রশিক্ষণের কথা বলা থাকলেও প্রশিক্ষণ পাবার বিষয়টি সম্পর্কে উপকারভোগীরা অপরিচিত।
একই ওয়ার্ডের টুলটুলি পাড়ার শাহালম সহায়তা গ্রহণের কয়েকদিন পর মৃত্যুবরণ করেন। জানতে চাইলে সমাজসেবার কর্মকর্তারা বলেন, তাদের হাতে নগদ টাকা দিলে খরচ করে ফেলতে পারে; তাই আমরা পঞ্চাশ হাজার টাকার সমপরিমাণ অর্থের পণ্যসামগ্রী ও ব্যবসার উপকরণ কিনে দিয়েছি। ৫ নং ওয়ার্ডের আরো একজন তালিকাভুক্ত ভিক্ষুক আমেনা বেগমের নামে পঞ্চাশ হাজার টাকার চেক প্রস্তুত থাকলেও, আজ অবদি তা নেয়নি আমেনা বেগম বলে দাবি কর্মকর্তাদের। রাজশাহী শহরজুড়ে রয়েছে হাজার হাজার ফকিরের বিচরণ। রয়েছে চরম অসহায় আর অচল ভিক্ষুক। অনেকেই মুখিয়ে আছেন ভিক্ষাবৃত্তি ছেড়ে যে কোন কর্মসংস্থানের আশায়। কিন্তু কর্তারা বলছেন, টাকা নিয়ে ভিক্ষাবৃত্তি ছেড়ে দিবে এমন ভিক্ষুক খুঁজে পাওয়া বড়ই দায়। তারা প্রতিদিন চার থেকে পাঁচশ টাকা উপার্জন করে। তাই কোন বাধ্যবাধকতার মধ্যে অধিকাংশ ভিক্ষুকই আসতে চাননা।
নগরীর আট রাস্তার মোড় খ্যাত রেলগেটের উত্তর-পশ্চিম কোণে প্রায় প্রতিদিন ভিক্ষাবৃত্তি করেন কিসমত আরা (৫৫)। বসবাস করেন নগরীর ১৫ নং ওয়ার্ডের সপুরা এলাকায়। পাঁচ বছর আগে মারা গেছে ছোট ছেলে। স্বামী আমেউদ্দিন মারা গেছে আরো আগে। বেঁচে থাকার দায়ে তাই বাধ্য হয়ে শারীরিক প্রতিবন্ধী ছেলে রাকিবকে নিয়ে ঘুরে ঘুরে ভিক্ষাবৃত্তির পেশায় নাম লিখিয়েছেন চার বছর আগে। নগরীর দড়িখরবনা-কাদিরগঞ্জ ও রেলগেট এলাকায় ভিক্ষাবৃত্তি করেন উপশহর এলাকায় বসবাসকারি নূরজাহান (৭০)। বৃদ্ধা এই ভিক্ষুকের মন্তব্যও একইরকম। তিনি বলেন, ‘শুনেছি বেটা, কিন্তু আমি তো পায়নি এখনো…তুমি কে বেটা, আমার নামটা লিস্টে দিয়ে দিও’। বৃদ্ধ, প্রতিবন্ধী, অক্ষম ও প্রায় অক্ষম হাজারো ভিক্ষুকের ছড়াছড়ি রাজশাহী নগরীজুড়ে।