সর্বশেষ সংবাদ
রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ, ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি স্পিকার হাফিজ নতুন রাষ্ট্রপতি হতে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় মির্জা ফখরুল পবায় কলেজের শিক্ষকদের ফুলেল শুভেচ্ছায় সিক্ত হলেন এমপি মিলন বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশনের চেয়ারম্যান পদে দায়িত্ব পেলেন বুলবুল মোদির আশ্বাসেও দিল্লিতে থামছে না বিক্ষোভ মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে : এমপি মিলন শিগগিরই পদত্যাগ করতে পারেন রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন রাসিক প্রশাসকের সঙ্গে ওয়াসা এমডির উন্নয়ন-নাগরিক সেবা নিয়ে আলোচনা রাজশাহীতে ট্রেন অবরোধে ক্ষতি ৩৫ লাখ টাকা, ভোগান্তিতে পড়েন ২০ হাজার যাত্রী পাবনায় খাদ্য গুদাম কর্মকর্তাসহ তার বাবা ও স্ত্রীর পাঁচ বছর করে কারাদন্ড

রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ, ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি স্পিকার হাফিজ

Paris
Update : শুক্রবার, ২৪ জুলাই, ২০২৬

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করেছেন। শারীরিক অসুস্থতা ও দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার প্রয়োজনের কথা উল্লেখ করে শুক্রবার (২৪ জুলাই) জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন তিনি। পরে স্পিকার তাঁর পদত্যাগপত্র গ্রহণের কথা জানান। শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে জাতীয় সংসদ ভবনে সংবাদ সম্মেলনে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, গুরুতর অসুস্থতা এবং বিভিন্ন রোগের কারণে শারীরিক ও মানসিকভাবে রাষ্ট্রপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদের দায়িত্ব পালনে নিজেকে অসমর্থ মনে করায় মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করেছেন। রাষ্ট্রপতির পদত্যাগপত্র বঙ্গভবন থেকে তাঁর সামরিক সচিব সংসদ সচিবালয়ে নিয়ে যান। পদত্যাগপত্রে মো. সাহাবুদ্দিন হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কিডনি জটিলতাসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন বলে উল্লেখ করেন। মো. সাহাবুদ্দিন ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। আওয়ামী লীগের মনোনয়নে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। তাঁর পাঁচ বছরের মেয়াদ ২০২৮ সালের এপ্রিলে শেষ হওয়ার কথা ছিল। রাষ্ট্রপতির দপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা এবং তার ঘনিষ্ঠ একজন গত বৃহস্পতিবার বলেছিলেন, রাষ্ট্রপতি পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন। তবে স্পিকার দেশে না থাকায় পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার বিষয়টি বিলম্বিত হচ্ছে। রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের সময় স্পিকারকে দেশে বা সশরীরে উপস্থিত থাকতে হবে, সংবিধানে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা না থাকলেও রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্পিকারকে দায়িত্ব নিতে হয়। সে কারণে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে সফরসূচি সংক্ষিপ্ত করে স্পিকারকে শুক্রবার দেশে ফিরতে অনুরোধ করা হয় বলে কর্মকর্তাদের ভাষ্য। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ তার ব্যক্তিগত সফর সংক্ষিপ্ত করে গতকাল শুক্রবার দুপুরে দেশে ফিরলেও দাবি করেন, গত এক সপ্তাহ বিদেশে থাকায় রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। রাষ্ট্রপ্রধানের গুঞ্জনের বিষয়ে তিনি এও বলেন, সাংবাদিকরা যেমন শুনেছেন, তিনিও তেমনই শুনেছেন। তার কয়েক ঘণ্টা পর মো. সাহাবুদ্দিন ইস্তফা দেওয়াই রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব এখন হাফিজ উদ্দিন আহমেদেরই কাঁধে পড়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল পাঁচ বছরের জন্য রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিয়েছিলেন সাহাবুদ্দিন। এক সময় তিনি ছিলেন দুর্নীতি দমন কমিশনের কমিশনার, তখন দেশের মানুষ তাকে সাহাবুদ্দিন চুপপু নামে চিনত। রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে মো. সাহাবুদ্দিন বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক। এর বাইরে পদটি মূলত আনুষ্ঠানিক। দেশের কার্যনির্বাহী ক্ষমতা থাকে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার হাতে। দায়িত্ব নেওয়ার ১৬ মাসের মাথায় অভাবনীয় এক পরিস্থিতির মধ্যে পড়েন তিনি। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে, প্রধানমন্ত্রীর পদ ছেড়ে শেখ হাসিনা চলে যান ভারতে। হাসিনা আমলের কোনো কিছু অবশিষ্ট না থাকলেও অনিবার্য পরিণতির মত বঙ্গভবনে থেকে যান মো. সাহাবুদ্দিন। তাকেই সংসদ বিলুপ্ত করার আদেশ দিতে হয়েছে, মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারকে শপথ পড়াতে হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোকে অধ্যাদেশে পরিণত করতে তাকেই সই দেওয়ার আনুষ্ঠানিকতা সারতে হয়েছে। অভ্যুত্থানের পক্ষের কয়েকটি সংগঠন গত অক্টোবরে সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের দাবিতে তুমুল আন্দোলনও শুরু করেছিল। কিন্তু ‘সাংবিধানিক সংকট’ এড়াতে সরকার তাকে আর সরানোর পথে যায়নি। সব মিলিয়ে দুর্বিষহ পরিস্থিতির মধ্যে দিন কাটছিল রাষ্ট্রপ্রধানের চেয়ারে থাকা সাহাবুদ্দিনের। নির্বাচনের আগে ২০২৫ সালের ১১ ডিসেম্বর বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনের পর সরে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। রাষ্ট্রপতি বলেছিলেন, “আমি বিদায় নিতে আগ্রহী। আমি এখান থেকে চলে যেতে চাই।” সেদিন সরাসরি যোগাযোগ করে কখন পদত্যাগ করতে চান জানতে চাইলে রাষ্ট্রপতি বলেছিলেন, “নতুন সরকার আসলে নতুন সরকার বললে, অনুরোধ করলে।” কেন পদত্যাগের কথা ভাবছেন, সেই প্রশ্নে তার উত্তর ছিল, “আমার ভালো লাগে না।” অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তাকে কোণঠাসা করে রাখা, বিদেশে বাংলাদেশের মিশনগুলো থেকে তার ছবি সরিয়ে ফেলা এবং বঙ্গভবনের প্রেস উইং সংকুচিত করায় ‘অপমানবোধ’ করার কথাও পরে বলেছিলেন মো. সাহাবুদ্দিন। নির্বাচনের পর তারেক রহমানের নতুন সরকার রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের কাছ থেকে শপথ নেয়। গত ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে এফএনএসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রপ্রধান অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে কঠিন সময় পার করার কথা জানিয়েছিলেন। মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ে নানা ‘চক্রান্ত’ হয় দাবি করে মো. সাহাবুদ্দিন সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা ‘চিরতরে ধ্বংস করার এবং সাংবিধানিক শূন্যতা সৃষ্টি করার অনেক পাঁয়তারা’ হয়েছে। “আমি দৃঢ়চিত্তে আমার সিদ্ধান্তে অবিচল ছিলাম। যে কারণে কোনো ষড়যন্ত্রই সফল হয়নি। বিশেষ করে অসাংবিধানিক উপায়ে রাষ্ট্রপতিকে উপড়ে ফেলার অসংখ্য ছক ব্যর্থ হয়েছে।” তার এ দুঃসময়ে বিএনপির কাছ থেকে ‘শতভাগ সমর্থন’ পাওয়ার কথাও বলেছিলেন তখনকার রাষ্ট্রপ্রধান। তিনি বলেছিলেন, “আমি নির্দ্বিধায় বলতে পারি, ওই কঠিন সময়েও বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব আমার পাশে ছিলেন। তারা তখনো সংবিধানের ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন রাখার বিষয়টি আমার কাছে স্পষ্ট ভাষায় ব্যক্ত করেছেন। “বিশেষ করে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ঘিরে আমার মনের মধ্যে অনেক কৌতূহল জমা ছিল। কিন্তু আমি পর্যায়ক্রমে বুঝতে পারলাম, তিনি খুবই আন্তরিকতাপূর্ণ মানুষ। হি ওয়াজ সো কর্ডিয়াল! আমার দুঃসময়ে বিএনপির সহযোগিতা শতভাগ ছিল।” স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও চিকিৎসার জন্য গত মে মাসে লন্ডনে ঘুরে আসেন রাষ্ট্রপতি। পরিবারের সদস্য, চিকিৎসক, স্টাফ নার্স ও বঙ্গভবনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও তার সঙ্গে ছিলেন। ২০২৩ সালের অক্টোবরে সিঙ্গাপুরে তার কার্ডিয়াক বাইপাস সার্জারি হয়েছিল। চিকিৎসকদের পরামর্শে সেই অস্ত্রোপচারের ফলোআপ পরীক্ষা করাতেই তিনি যুক্তরাজ্যে যান। ১২ মে কেমব্রিজের রয়াল প্যাপওয়ার্থ হাসপাতালে রাষ্ট্রপতির এনজিওগ্রাম করা হয়। সে সময় হৃদযন্ত্রের একটি ধমনিতে গুরুতর ব্লক শনাক্ত হলে তাৎক্ষণিকভাবে এনজিওপ্লাস্টি করে একটি স্টেন্ট বসানো হয়। এরপর তাকে চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছিল। নয় দিন পর দেশে ফেরেন রাষ্ট্রপতি। তখন বঙ্গভবনের প্রেস বিভাগ ব্যক্তিগত চিকিৎসকদের বরাতে তার শারীরিক অবস্থা ‘স্থিতিশীল ও সন্তোষজনক’ বলে জানিয়েছিল। যুক্তরাজ্যে চিকিৎসাধীন অবস্থাতেও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ সারসংক্ষেপ ও নথিতে ডিজিটালি অনুমোদন দিয়েছিলেন রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন। লন্ডনে সুদানের প্রধানমন্ত্রী কামিল ইদ্রিসের সঙ্গে তার অনানুষ্ঠানিক সৌজন্য সাক্ষাতও হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২১ থেকে ২৬ জুন মালয়েশিয়া ও চীন সফর করেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর এটাই ছিল তার প্রথম বিদেশ সফর। দেশে ফিরে ২৭ জুন তিনি জাতীয় সংসদে সফরের অর্জন নিয়ে কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী বিদেশ সফর থেকে ফেরার পর রাষ্ট্রপতিকে তার সফরের বিষয়ে অবহিত করার রেওয়াজ রয়েছে। তবে তারেক রহমান গত বুধবার পর্যন্ত রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বা অন্য কোনোভাবে সফরের ফল তাকে অবহিত করেছেন, এমন কোনো তথ্য বঙ্গভবন কিংবা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় প্রকাশ করেনি। এ কারণে অনেকেই ধারণা করেন, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের নেপথ্যে স্বাস্থ্যগত কারণের পাশাপাশি তার সঙ্গে ক্ষমতাসীনদের দূরত্বও কাজ করেছে। কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, লন্ডনে চিকিৎসা নেওয়ার সময় রাষ্ট্রপতি ফোনে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার সঙ্গে কথা বলেছিলেন। সেই ঘটনায় তার সঙ্গে ক্ষমতাসীনদের দূরত্ব তৈরি হয়। তবে গত বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রপতি ফোন করে এক সাংবাদিককে বলেন, এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটেনি। রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ায় নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত সংবিধান অনুযায়ী স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন। সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি অনুপস্থিতি, অসুস্থতা বা অন্য কোনো কারণে দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হলে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত স্পিকার সেই দায়িত্ব পালন করবেন। সংবিধানের ১২৩(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, মৃত্যু, পদত্যাগ বা অপসারণের কারণে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হবে। সংবিধানের ৪৮(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।-এফএনএস


আরোও অন্যান্য খবর
Paris