সোমবার

৮ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

২৫শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ সংবাদ
বিএমডিএ’র ৮৬তম পরিচালনা বোর্ড সভা নতুন সরকারের অধিনে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম বাজেট অধিবেশন শুরু প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে সরকারদলীয় এমপিদের সভা অনুষ্ঠিত ডেঙ্গমুক্ত রাজশাহী নগরী গড়তে প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে : রিটন রাজশাহীতে বৈদ্যুতিক খুঁটিতে ঘুঘুর বাচ্চা আনতে গিয়ে প্রাণ হারালেন এক কিশোর দেশের ৬৫ শতাংশ গ্রাহক বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির বাইরে থাকছেন : তথ্যমন্ত্রী বিশ্বে প্রথম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় তৈরি হল ভ্যাকসিন, মানবদেহে সফল পরীক্ষা বাগমারার তাহেরপুর হাটে অতিরিক্ত খাজনা আদায়ের অভিযোগ পাবনায় নতুন বিসিক শিল্পনগরী গড়ে তোলা হবে : শিল্পমন্ত্রী নওগাঁ সীমান্তে বিএসএফ’র পুশইনের অপচেষ্টা ব্যর্থ করে দিলো বিজিবি

রাজশাহী টেক্সটাইল মিলস-এর বৃক্ষ পুকুর সাবাড়

Paris
Update : শনিবার, ৮ মার্চ, ২০২৫

শাহানুর রহমান রানা : ৩০ বছরের জন্য রাজশাহী টেক্সটাইল মিলস চুক্তিভিত্তিক লিজ নিয়েই দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগ্রুপ প্রাণ-আরএফএল বিশালাকৃতির পুকুর ভরাটসহ কর্তন করলো কয়েকশ গাছ। ভবন ও স্থাপনা নির্মাণ করার জন্য পরবর্তীতে প্রয়োজন পড়লে আরো কয়েকশ গাছ কর্তন করা হবে বলেও জানান কর্মরতরা। গাছ কর্তন আর জলাশয় ভরাটের কারণে শুধু টেক্সটাইল মিলের পরিবেশই নয়; এর আশেপাশের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও বৈচিত্রে পড়বে বিরূপ প্রভাব বলে মন্তব্য স্থানীয় সচেতন ব্যক্তিদের। ১৯৭৪ সালে ২৬.৫৩ একর জায়গার ওপর স্থাপিত হয় রাজশাহী টেক্সটাইল মিলস। প্রাকৃতিক পরিবেশ আচ্ছাদিত সবুজায়নের সেই চিত্র প্রতিনিয়তই ধাবিত হচ্ছে ধ্বংসলীলার দিকে। বিষয়টি নিয়ে এখন উদ্বিগ্ন স্থানীয়রা।
সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রতি মিনিটে পূর্ণবয়ষ্ক কোন মানুষ প্রায় ৮ লিটার বাতাস নেয়, দিনে প্রায় ১১ হাজার লিটার বাতাস দরকার মানুষের। একটি বড় গাছ প্রায় চারজন মানুষের জন্য অক্সিজেন সরবরাহ করতে পারে। বিনামূল্যে অক্সিজেনের এই জোগানদার গাছের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব ও উপলব্ধি আমাদের ভেতর কাজ করেছে করোনাকালে? করোনা মহামারীতে অক্সিজেনের জন্য উন্মুখ হয়েছিল সমস্ত দুনিয়া। একটি অক্সিজেনের সিলিন্ডার সংগ্রহে মানুষকে ব্যয় করতে হয়েছে হাজার হাজার টাকা। কিন্তু, সেই জীবনরক্ষাকারী অক্সিজেনের প্রাকৃতিক যন্ত্রকে বিলুপ্ত করে কর্তন করা হলো কয়েকশ বড় বড় গাছ। এভাবে অক্সিজেন ভান্ডার ধ্বংস করলে প্রাকৃতিক ভারসাম্য বিনষ্ট হবার পাশাপাশি অদূর ভবিষ্যতে বিপন্ন হবে জনজীবন বলে মন্তব্য নওদাপাড়া এলাকার বাসিন্দাদের। স্থানীয় সচেতন ব্যক্তিরা মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, আবারো এই এলাকার অক্সিজেন ভান্ডার ধ্বংস করা হলো। বছরতিনেক আগে নওদাপাড়াতে অবস্থিত বনবিভাগের প্রায় ২০৫টি গাছ কর্তন করা হয়েছিল নানা অজুহাতে। সেটির ধকল সামলানোর আগেই আবারো একই এলাকার আরো কয়েকশ গাছ কর্তন করলো প্রাণ-আরএফএল শিল্পগ্রুপ।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস করপোরেশনে নিয়ন্ত্রণাধীন একটি প্রতিষ্ঠান এই রাজশাহী টেক্সটাইল মিলস। গত ২৭-১০-২০২৪ ইং তারিখে পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপের (পিপিপি) মাধ্যমে রাজশাহী টেক্সটাইল মিল পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগ্রুপ প্রাণ-আরএফএল। প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের সাথে চুক্তির পর প্রতিষ্ঠানটির নতুন নামকরণ করা হয়েছে বরেন্দ্র টেক্সটাইল মিলস। চুক্তি মোতাবেক আগামী ৩০ বছরের জন্য টেক্সটাইল মিলস এর পুরোটাই ব্যবহার করবে প্রাণ-আরএফএল। পরবর্তীতে আরো ১০ বছর মেয়াদ বাড়ানোর সুযোগ আছে বলেও জানান সংশ্লিষ্টরা। মিলটিতে পাঁচ হাজার লোকের কর্মসংস্থান হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন, প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের (বরেন্দ্র টেক্সটাইল মিলস) রাজশাহীস্থ এজিএম শরিফ উদ্দিন আহমেদ। পুকুর ভরাটসহ কেনো গাছ কর্তন করা হলো জানতে চাইলে এজিএম শরিফ উদ্দিন বলেন, এখানের সমস্ত কিছুই আমরা কিনে নিয়েছি। প্রতিটি ভবন ও কোয়ার্টার আমরা ব্যবহার করবো, ভবন-গোডাউন ও অন্যান্য স্থাপনা বর্ধন ও মেরামত করা ছাড়াও নতুন স্থাপনা তৈরি করবো। কিন্তু চুক্তিতে গাছ কর্তন ও পুকুর ভরাট করে কোন স্থাপনা তৈরির বিষয়ে কোন নির্দেশনা আছে কি। কিংবা আপনারা বনবিভাগ ও পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে গাছ কর্তনের কোন অনুমতি নিয়েছেন কিনা জানতে চাইলে তিনি কোন উত্তর দেননি। বিষয়টি নিয়ে রাজশাহী টেক্সটাইল মিলস এর উপ-মহাব্যবস্থাপক মোঃ রবিউল করিম এর সাথে কথা বলতে বলেন। সে মোতাবেক ডিজিএম রবিউল করিমের দপ্তরে গেলে তাঁকে পাওয়া যায়নি। গাছগুলো কর্তন করে কোথায় বা কার কাছে বিক্রি করা হচ্ছে প্রশ্নের জবাবে এজিএম শরিফ উদ্দিন আহমেদ বলেন, আমাদের (প্রাণ-আরএফএল) অঙ্গ প্রতিষ্ঠান রিগাল ফার্নিচার ফ্যাক্টরিতে গাছগুলো পাঠানো হয়েছে। গাছ কর্তনে স্থানীয়রা বাধা দিলেও কর্ণপাত করেনি কর্তৃপক্ষ। কয়েকমাস আগে প্রাণ-আরএফএল কর্তৃপক্ষ টেক্সটাইল মিলের উচ্চমূল্যের মেশিনারিজ বিক্রি করার টেন্ডার দেয়। ঠিকাদাররা মেশিনগুলো ক্রয়ের অভিপ্রায় নিয়ে যথাসময়ে সিডিউল ক্রয় করে জমা দেয়। তার কয়েখদিন পর সেই টেন্ডার প্রক্রিয়া বাতিল করা হয় বলে জানান ঠিকাদার ও স্থানীয়রা। পরবর্তীতে, ভারি মেশিনগুলো গভীর রাতে অন্যত্র পাঠানোর চেষ্টা করলে স্থানীয় ঠিকাদার ও এলাকাবাসির বাঁধারমূখে পরে। অনেক নাটকিয়তার পর সেনাবাহিনীর সদস্যদের হস্তক্ষেপে অবরোধকারিদের শান্ত করে প্রশাসন। সেই মেশিনারিজগুলো নিজেদের আরএফএল টিউবওয়েল ফ্যাক্টরিতে পাঠানো হয়েছে বলে জানায় সূত্র। বিষয়টি স্থানীয়রাসহ কর্মরতদের অনেকেই স্বীকার করেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানাগেছে, মিলটি উৎপাদনে যায় ১৯৭৯ সালে। ১৯৭৮ সালে ভারত থেকে ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে যন্ত্রপাতি কিনে কারখানা স্থাপন করার মধ্য দিয়ে উত্তরাঞ্চলের তাঁতীদের সুতার চাহিদা মেটানো ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে চালু হয় রাজশাহী টেক্সটাইল মিল। দীর্ঘ সময় নিজস্ব উৎপাদন না থাকার কারণে ঘারে চাঁপে প্রায় ১২ কোটির দেনা। যার কারণে লিজ ভিত্তিতে টেক্সটাইল মিলের কারখানা, গোডাউন, আবাসিক কোয়ার্টার, পুকুর ও ভবন ভাড়া দেওয়া হয়েছিল বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে। এরমধ্যে অন্যতম হল, ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি), স্বপ্ন কনফেকশনারী, অ্যাগ্রোলিংক বিডি, রাইট অ্যাগ্রো, বন্ধু ডিস্ট্রিবিউটরসহ বিভিন্ন ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠানের কাছে ভাড়া দিয়ে কয়েক বছর কিছুটা দেনা পরিশোধ করেছে মিল কর্তৃপক্ষ। ঐসকল প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে প্রতিমাসে মিল কর্তৃপক্ষ ভাড়া পেতো প্রায় ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা।
প্রতিষ্ঠাকাল থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত চলার পর গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের মাধ্যমে ১৫০০ জন শ্রমিককে বিদায় করে দিয়ে ২০০৩ সালের ৩০ জুন মিলটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর ২০০৪ সালের আগস্ট থেকে এটি সম্পূর্ণ অস্থায়ী ভিত্তিতে দৈনিক মজুরিতে সার্ভিস চার্জ পদ্ধতিতে চালু করা হয়। ২০০৮ সালের নভেম্বরে মিলটি আবার বন্ধ হয়ে যায়। এক বছর পর পুনরায় চালু হয়ে ২০১৭ সালের ২৮ অক্টোবরে আবারও বন্ধ হয়ে যায় রাজশাহী টেক্সটাইল মিল। সেবারও কারখানা সচল ছিল ওই সার্ভিস চার্জ পদ্ধতিতে। ২০১৭ সালের পর থেকে কারখানা পুরোপুরি ভাড়া দিয়ে চলছে। পূর্ববর্তী সময়ে টেন্ডারের মাধ্যমে তিন বছরের জন্য কারখানাটি ভাড়া দেওয়া হয়েছিল। নিজেদের ঘাড়ে চেঁপে বসে থাকা মোটা অংকের ঋণ পরিশোধের নিমিত্তে অবশেষে পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপের (পিপিপি) মাধ্যমে রাজশাহী টেক্সটাইল মিল পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া হয় দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগ্রুপ প্রাণ-আরএফএল কোম্পানীকে।


আরোও অন্যান্য খবর
Paris