দেলোয়ার হোসেন (রনি). গোমস্তাপুর : চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুরে কৃষিতে উন্নতমানের পলি ওয়েলপেপারে আবৃত চাষযোগ্য কৃষি ঘর হচ্ছে ‘পলিনেট হাউজথ। অত্যাধুনিক এ প্রযুক্তির মাধ্যমে শীতকালীন ও গ্রীষ্মকালীন সময়ে উচ্চমূল্যের সব ধরেণের ফসল ও চারা উৎপাদন করতে পারবে চাষিরা। সেই সাথে তাপমাত্রাকে নিয়ন্ত্রণ করে বছরব্যাপী বিভিন্ন ধরনের ফসল ফলানো যায়। এ পদ্ধতিতে চাষাবাদ কৃষি উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা রাখছে বলে জানিয়েছেন কৃষি বিশেষজ্ঞরা। উপজেলায় দুইজন কৃষি উদ্যোক্তাকে প্রায় ৪৫ লাখ টাকা ব্যয়ে পলিনেট হাউজ বানিয়ে দিয়েছে কৃষি দপ্তর। যখন বৃষ্টির প্রয়োজন হয় তখন দেখা যায় তাপপ্রবাহ। আবার যখন রোদের প্রয়োজন হয় তখন দেখা যায় বৃষ্টি। জলবায়ুর এ বিরূপ প্রভাবে প্রকৃতির এখন অনেকটাই টালমাটাল অবস্থা। গবেষকরা বলছেন, সময় যত গড়িয়ে যাচ্ছে পৃথিবীর তাপমাত্রা ততটাই বাড়ছে। ফলে এ অবস্থায় ক্রমেই হুমকির মুখে পড়তে হচ্ছে কৃষিকে। তাই কৃষিকে বাঁচাতে নতুন নতুন গবেষণা ও উদ্ভাবনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে গবেষকরা। পলিনেট হাউস তেমনই এক গবেষণার ফসল। সূর্যের ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মি নিয়ন্ত্রণ, অত্যাধুনিক সেচ ব্যবস্থাপনা ও ক্ষতিকর পোকার প্রবেশ রুখে দিয়ে নিরাপদ ফসল উৎপাদনের এক আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি হল পলিনেট হাউজ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু মোকাবিলায় পলিনেট হাউজ কৃষিবিজ্ঞানে এক নতুন সম্ভাবনাময় উদ্ভাবন। এ প্রযুক্তির মাধ্যমে ভারী বৃষ্টিপাত, কীটপতঙ্গ, ভাইরাসজনিত রোগ, তীব্র তাপদাহ ইত্যাদির মতো প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও সকল ধরনের কৃষি উৎপাদন ব্যাবস্থায় ফসল নিরাপদ থাকবে। পলিনেট হাউজে উচ্চমূল্যের ফসল যেমন ক্যাপসিকাম, ব্রকলি, রঙিন তরমুজ, রঙিন ফুলকপি, বাঁধাকপি, লেটুস ও অন্যান্য অসময়ের সবজির পাশাপাশি চারা উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এছাড়াও গ্রীষ্মকালেও ফলবে শীতকালীন সবজি। এর মধ্যে টমেটো, ফুলকপি, বেগুন, গাজর ইত্যাদি ফসল রয়েছে। এর ফলে সবজি চাষে যেমন বৈচিত্র্য আসবে, তেমনি অনেকেই আয়ের নতুন উৎসের সন্ধান পাবে।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এর আধুনিক প্রযুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে রাজশাহী বিভাগের কৃষি উন্নয়ন প্রকল্প এর অর্থায়নে গোমস্তাপুর উপজেলায় কৃষি উদ্যোক্তা শামীম রেজা ও সাদিকুল ইসলাম টুটুলকে নিরাপদ ফসল উৎপাদনের জন্য কৃষি দপ্তর থেকে পলিনেট হাউজ নির্মাণ করে দেয়া হয়। এই দুইজন উদ্যোক্তা মিলে ২৫ শতাংশ করে মোট ৫০ শতাংশ জমিতে প্রথম বারের মতো পলিনেট হাউজে চাষাবাদ শুরু করেন। পলিনেট হাউজে উন্নত মানের পলি ওয়ালপেপার ব্যবহার করায় সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মি ভেতরে প্রবেশ করতে পারবে না এবং প্রাকৃতিক দূর্যোগেও ফসল থাকবে অক্ষত। এছাড়াও প্লাষ্টিক দিয়ে বানানো এই ঘরে রয়েছে ডিপ, ও স্প্রিংকুলার ইরিগেশনের সুবিধা। উৎপাদিত ফসলের প্রয়োজনভেদে এই প্রযুক্তিগুলো ব্যবহার করে জমিতে সেচ দেওয়া যাবে। এই প্রযুক্তিতে আরও রয়েছে অত্যাধুনিক বালাই ব্যবস্থাপনার সুবিধা। পলিনেট হাউজে পোকা-মাকড় আক্রমণ করতে না পারায় কিটনাশক ব্যবহার করতে হয় না। যার ফলে এ প্রযুক্তির মাধ্যমে বিষমুক্ত সবজি উৎপাদন করা সম্ভব বলে জানালেন কৃষি উদ্যোক্তা শামীম রেজা। প্রথমবারের মত আমি পলিনেট হাউজে বেগুন, মরিচ, টমেটো ও পেঁপের চারা উৎপাদন করে বেশ সফলতা অর্জন করেছি। বর্তমানে পলিনেট হাউজে আমি শসার চাষ করেছি। ফলন বেশ হয়েছে। আশা করছি ভালো লাভবান হব। তিনি আরো বলেন, ‘সহজ পদ্ধতিতে পলিনেট হাউজে চাষাবাদ করা যাচ্ছে। আবহাওয়ার কারণে ঘরের তাপমাত্রা বেড়ে গেলে, স্প্রিংকুলার ছেড়ে দিলে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। গাছের গোড়ায় পানি দেওয়ার প্রয়োজন হলে ইরিগেশন ছেড়ে দিলেই সহজেই সেচ দেওয়া যায়। সাদিকুল ইসলাম টুটুল নামের অপর আরেক কৃষি উদ্যোক্তা বলেন, ‘প্রথম বারের মতো পলিনেট হাউজে টমেটো ও চন্দ্রমল্লিকা ফুলের চাষাবাদ করেছি। হাউজের ভেতরে আবহওয়া অনুকূলে থাকায় গাছগুলোতে সহজেই ফুল এসেছে। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে বিষমুক্ত নিরাপদ টমেটোর ভালো ফলন পাবো বলে আশা করছি। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা তানভীর আহমেদ সরকার বলেন, কৃষিতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় পলিনেট হাউজ হচ্ছে একটি অত্যাধুনিক প্রযুক্তি। এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে সারাবছর উচ্চমূল্যের ফসল এবং ফুল-ফল ও সবজি চারা উৎপাদন করা যায় এবং নিরাপদ সবজি উৎপাদন সম্ভব হয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এর আধুনিক প্রযুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে রাজশাহী বিভাগের কৃষি উন্নয়ন প্রকল্প এর অর্থায়নে গোমস্তাপুর উপজেলায় ০২ টি পলিনেট হাউজ নির্মিত হয়েছে এবং এই পলিনেট হাউজ দুটিতে সবজি আবাদ ও মানসম্মত চারা উৎপাদন ও বিক্রয় হচ্ছে। আমরা কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে সার্বিকভাবে পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করছি।