শাহানুর রহমান রানা : রাজশাহী নগরীর অভ্যন্তরীন যোগাযোগ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে বিশেষ স্থানগুলো এখন ভোগান্তির শীর্ষে। শুধু ভোগান্তির দিক দিয়েই শীর্ষবস্থানে নয়; কিছু কিছু স্থান পরিণত হয়েছে সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে। যৎসামান্য কারণে ঘটতে পারে মর্মান্তিক মৃত্যুর মতো ঘটনাও। এমনটাই বলছেন হালকা ও ছোট যানবাহন চালক-যাত্রী ও স্থানীয়রা। অভ্যন্তরীন যোগাযোগ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের লক্ষ্যে শুরু হওয়া ফ্লাইওভারগুলোর নির্মাণযজ্ঞ থেমে যাওয়ার কারণেই ভোগান্তি আর ঝুঁকি উঁকি দিচ্ছে সড়কগুলোতে। বর্ষা মৌসুমের বৃষ্টিরদিন সেই ভোগান্তি আর ঝুঁকির মাত্রা বৃদ্ধি পায় কয়েকগুণ বলে জানান চলাচলকারিরা। যত্রতত্র পরে থাকা নির্মাণসামগ্রী, ভারি ও ঝুঁকিপূর্ণ উপকরণ ও বেষ্টনির উপস্থিতি একদিকে বাঁধাগ্রস্থ করছে নির্বিঘ্ন চলাচলে, তো অন্যদিকে ভোগান্তি আর ঝুঁকির প্রতীক হয়ে স্থান করে নিয়েছে সড়কের একাংশ। রাস্তা ঘেঁষে সম্মুখভাগে বেড়িয়ে থাকা রডগুলোর স্তুপ চলাচলকারিদের জন্য ঝুঁকির বাহক হিসেবে জানান দিচ্ছে প্রতিনিয়ত।
রাজশাহী সিটি করপোরেশনের তথ্যমতে, ‘সমন্বিত নগর অবকাঠামো উন্নয়ন’ প্রকল্পের অধীন তিনটি প্যাকেজে পাঁচটি ফ্লাইওভার ও ১৯টি অবকাঠামো নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছিল নগরীর বিভিন্ন পয়েন্টে। গত ৫ আগস্টের পর থেকে সবকটি ফ্লাইওভার নির্মাণকাজ বন্ধ রয়েছে। কাজের জন্য বন্ধ রাস্তাগুলোও খুলে দেওয়া হয়েছে। কয়েকদিন আগেও এসব রাস্তা বন্ধ রাখা ছিল। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো নির্মাণকাজের সঙ্গে যুক্ত ভারী মেশিনপত্র সরিয়ে নিয়েছে। কবে নাগাদ আবার কাজ শুরু হবে তা বলতে পারছেন না এখানকার নিরাপত্তায় থাকা কর্মীরা। নির্মাণকাজ এলাকার সড়কের বিভিন্নস্থানে দৃশ্যমান হয়েছে বিভিন্ন আকৃতির খানা-খন্দ। বৃষ্টির দিন মুহূর্তের মধ্যেই কর্দমাক্তবস্থা পরিণত হবার কারণে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে সড়কের বিভিন্ন পয়েন্টগুলো। সড়কের কোথাও কোথাও সৃষ্টি হয়েছে মাঝারি ও বড় আকৃতির গর্ত।
নগরীর বিলসিমলা, সপুরা ওয়াপদার মোড় (পানি উন্নয়ন বোর্ড), কাশিয়াডাঙ্গা ও হড়গ্রাম এলাকা সহ ভোগান্তিস্থলের পাশর্^বর্তী বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীরা বলেন, কাজ শুরু হবার পর থেকে এখন অবদি ভোগান্তি পিছুই ছাড়ছেনা। কাজ পুরোদমে বন্ধ হয়ে যাওয়ায়, সামান্য বৃষ্টি হলেই রাস্তার বিভিন্ন জায়গায় পানি জমে যায়। পিচ্ছিল কাদার জন্য যাতায়াতে ভোগান্তি পোহাতে হয়। ভারি আর বড় বড় নির্মাণ সামগ্রী ও উপকরণগুলো পরে থাকার কারণে ব্যবসায়িক ধীরগতি গ্রাস করেছে অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে। কারণ ভোগান্তি পেরিয়ে অনেক ক্রেতাই দোকানে আসতে চায় না। শিশু কিশোর আর বয়স্করা পড়েছেন সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি আর ঝুঁকির মধ্যে। গত ২৩ সেপ্টেম্বর নগরীর নিউমার্কেট ইসলামী ব্যাংকের সামনে ‘ফ্লাইওভার নির্মাণের প্রতিবাদে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছে স্থানীয় বিভিন্ন দোকানের মালিক ও কর্মচারীরা।
রাজশাহী শিক্ষা বোর্ড সরকারি মডেল স্কুল এন্ড কলেজের সম্মুখভাগের রাস্তায় রডের বান্ডিল (ফ্লাইওভারের পিলার নির্মাণ করার জন্য তৈরিকৃত রডের খাঁচা) উন্মুক্তবস্থায় দিনের পর দিন পড়ে থাকার কারণে চলাচলে বাড়ছে মৃত্যু ঝুঁকি বলে মন্তব্য স্থানীয়দের। এছাড়াও রাজশাহী জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের সামনে রাস্তা ঘেষে পড়ে থাকা উন্মুক্ত রডের কারণে বৃদ্ধি পচ্ছে ঝুঁকি। হড়গ্রাম ও কাশিয়াডাঙ্গা এলাকার অবস্থা আরো বেশি খারাপ। এবড়োখেবড়ো আর খানাখন্দে একাকার হয়ে আছে এই এলাকার রাস্তাগুলো। কর্তৃপক্ষের চরম অবহেলা আর দায়িত্বহীনতাকেই দায়ি করছেন সচেতন ব্যক্তিরা। রডগুলোর উন্মুক্ত অগ্রভাব অংশটিকে টিন বা কিছু দিয়ে সুরক্ষিত রাখলে ঝুঁকির বিষয়টিও হ্রাস পেতো সমহারে বলে মন্তব্য স্থানীয়দের।
জানতে চাইলে রাসিকের নির্বাহী প্রকৌশলী (উন্নয়ন) মাহামুদুর রহমান বলেন, নতুন করে কোন উন্নয়নমূলক অবকাঠামো তৈরি হবে কিনা জানিনা, তবে, ‘সমন্বিত নগর অবকাঠামো উন্নয়ন’ প্রকল্পের আওতাধীন চলমান কাজগুলো চলবে। এগুলো বন্ধের কোন নির্দেশনা আসেনি। এদিকে, রেলগেট কামারুজ্জামান চত্বর ফ্লাইওভার নির্মাণ কাজের দায়িত্বে থাকা স্ট্যান্ডার্ড ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানীর একজন দায়িত্বশীল কর্তা জানান, কাজ আবারো শুরু হবে। তবে, কবে নাগাদ কাজ পুণরায় আরম্ভ হবে সেটা এই মুহুর্তে বলা যাচ্ছেনা।
প্রাপ্ত তথ্য ও সূত্রমতে, নগরীর শহীদ এ এইচ এম কামারুজ্জামান চত্বর রেলক্রসিংয়ে ৮৯৭ মিটার দৈর্ঘ্য ও ১২ মিটার প্রস্থ ফ্লাইওভার নির্মাণে ২০৮ কোটি ৬৭ লাখ টাকা, ভদ্রা রেলক্রসিং ৫২০ মিটার দৈর্ঘ্য ও ১২ মিটার প্রস্থ ফ্লাইওভার নির্মাণে ১১৩ কোটি ৪৭ লাখ টাকা, বর্ণালী সংলগ্ন বন্ধ গেট এবং নতুন বিলসিমলা রেলক্রসিং পর্যন্ত ১২৫৫ মিটার দৈর্ঘ্য ও ১২ মিটার প্রস্থ সমন্বিত ফ্লাইওভার নির্মাণে ২৯১ কোটি ৩৬ লাখ টাকা, কোর্ট স্টেশন রেলওয়ে ক্রসিংয়ে ৫২১ মিটার দৈর্ঘ্য ও ১২ মিটার প্রস্থ ফ্লাইওভার নির্মাণে ১১৮ কোটি ৬৯ লাখ টাকা এবং হড়গ্রাম নতুনপাড়া রেলওয়ে ক্রসিংয়ে ৪০০ মিটার দৈর্ঘ্য ও ১২ মিটার প্রস্থ ফ্লাইওভার নির্মাণে ৮৯ কোটি ৭৪ লাখ টাকা সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে। রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী নূর ইসলাম তুষার প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্বে আছেন বলেও জানায় দপ্তর সূত্র।