এফএনএস : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ২০০৯ সাল থেকে গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা ও স্থিতিশীলতা বজায় থাকায় বাংলাদেশ এখন বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিকভাবে একটি মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম (ডব্লিউইএফ) আয়োজিত ‘নিউ ইকোনমি অ্যান্ড সোসাইটি ইন স্মার্ট বাংলাদেশ’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। শেখ হাসিনা বলেন, ২০০৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত আওয়মী লীগ সরকারের আমলে দেশ বিভিন্ন আর্থ-সামাজিক সূচকে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে। ২০০৯-২০২৩ মেয়াদে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের মাধ্যমে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন যে মাথাপিছু আয় ২৮২৪ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে, যা ২০০৬ সালে ছিল মাত্র ৫৪৩ মার্কিন ডলার। দারিদ্র্যের হার প্রায় ৪১.৫ শতাংশ থেকে প্রায় ১৮.৭ শতাংশে নেমে এসেছে এবং চরম দারিদ্র্যের হার ২৫.৫ শতাংশে থেকে ৫.৬ শতাংশে নেমে এসেছে। শেখ হাসিনা বলেন, ১৯৭৫ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পরিবারের অধিকাংশ সদস্যসহ হত্যার পর যারা অবৈধভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এসেছিল, তারা দেশের মানুষের উন্নয়নে কিছুই করেনি। গণতন্ত্র ছাড়া দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, তিনি ১৯৮১ সালে দেশে ফিরে দীর্ঘ সংগ্রামের মাধ্যমে দেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে কাজ করেছেন। প্রধানমন্ত্রী ৫০ লাখ গৃহহীন ও ভূমিহীন মানুষকে বাড়ি বিতরণের কথা উল্লেখ করে বলেন, দেশে একজন মানুষও গৃহহীন ও ভূমিহীন থাকবে না। তিনি বলেন, কোভিড-১৯ মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং নিষেধাজ্ঞা ও পাল্টা নিষেধাজ্ঞা এবং বিশ্বব্যাপী খাদ্যপণ্য ও জ¦ালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপরও চাপ সৃষ্টি করেছে।
শেখ হাসিনা অবশ্য বলেন যে তার সরকার এ চাপ কাটিয়ে উঠতে চেষ্টা করছে। একটি জাতির ভবিষ্যৎ গড়তে ভিশন থাকার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে আওয়য়ামী লীগ ২০২১ সালের রূপকল্প ঘোষণা করেছিল এবং সেই রূপকল্প ২০২১ বাস্তবায়ন হয়েছে। বাংলাদেশকে একটি উন্নত-সমৃদ্ধ ও স্মার্ট জাঁতি হিসেবে গড়ে তুলতে তার সরকার রূপকল্প-২০৪১ ঘোষণা করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তার সরকার সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছে। এদিকে অনুষ্ঠানে এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চতুর্থ শিল্পবিপ্লব সংশ্লিষ্ট সরঞ্জাম মানবতাকে আঘাত করে বা ক্ষুণ্ন করে এমন কাজে ব্যবহার না করার বিষয়টি নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, আমাদের নিশ্চিত করতে হবে যে, চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সরঞ্জাম যেন আমাদের মানবতাকে আঘাত বা ক্ষুণ্ন করে এমন কাজে নিয়োজিত করা না হয়। অনুষ্ঠানের পর প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যলেখক মো. নজরুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, চুতুর্থ শিল্পবিপ্লব যাতে সমাজে বিভাজন সৃষ্টি না করে সে বিষয়টিও নিশ্চিত করার ওপর প্রধানমন্ত্রী জোর দিয়েছেন। শেখ হাসিনা আরও বলেন, আমরা নিশ্চিত করতে চাই যে, ৪আইআর আমাদের সমাজের মধ্যে আরও বিভাজন তৈরি করবে না। এ উদ্দেশ্যে আমাদের আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কার্যকর সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে হবে। এ প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, তার সরকার দেশের তরুণদের ৪আইআর ও ভবিষ্যৎ কাজের জন্য তৈরি করতে শুরু করেছে।
তিনি আরও বলেন, আমি আত্মবিশ্বাসী যে আমাদের ছেলেমেয়েরা শুধু ৪আইআরকে শুধু অনুসরণ করবে না বরং প্রকৃতপক্ষে এর নেতৃত্ব দেবে। দেশের শিক্ষার্থীরা রোবোটিক্সে যে ধরনের উদ্ভাবনী কাজ করছে, তা দেখে তিনি উৎসাহবোধ করেন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা সারাদেশে যে উদ্ভাবন মেলার আয়োজন করে আসছি, সেখানেও তাদের মধ্যে দারুণ উৎসাহ দেখেছি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ অবশ্যই ডব্লিউইএফের সঙ্গে অংশীদারত্বে একটি স্বাধীন ৪আইআর কেন্দ্রকে স্বাগত জানাবে। সরকার এরইমধ্যে বাংলাদেশে ৪আইআরের জন্য যথাযথ আইন, নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরির জন্য কাজ করছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, আমরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ইন্টারনেট অব থিংস, ন্যানোটেকনোলজি ইত্যাদি বিষয়ে পৃথক জাতীয় কর্মকৌশল তৈরি করেছি। তিনি বলেন, এ লক্ষ্যে সরকার দেশের বিভিন্ন স্থানে ফ্রন্টিয়ার টেকনোলজি, ন্যানোটেকনোলজি এবং অন্যান্য বিষয়ে বিশেষায়িত ইনস্টিটিউট স্থাপন করছে। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, স্মার্ট গভর্ন্যান্সের জন্য ভবিষ্যতের রাজনৈতিক নেতাদের বিকাশের জন্য আমরা স্মার্ট লিডারশিপ একাডেমিও চালু করেছি। তাই বাংলাদেশ একটি গ্লোবাল ডিজিটাল কমপ্যাক্ট তৈরির বিষয়ে জাতিসংঘের কাজে আগ্রহী উল্লেখ করে শেখ হাসিনা আরও বলেন, আমরা আশা করি যে, এ গ্লোবাল কমপ্যাক্টে ডিজিটাল ও সীমান্তপ্রযুক্তির দায়িত্বশীল ও উৎপাদনশীল ব্যবহারের বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য স্পষ্ট নির্দেশনা থাকবে।
তিনি সাইবার-আক্রমণ, বিভ্রান্তিকর তথ্য ও অন্যান্য অপকর্মের বিরুদ্ধে সুরক্ষাব্যবস্থা রাখার ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, আমাদের সম্মিলিতভাবে সাইবার-আক্রমণ, বিভ্রান্তমূলক তথ্য ও অন্যান্য অপকর্মের বিরুদ্ধে সুরক্ষাব্যবস্থা রাখতে হবে। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কোভিড-১৯ মহামারি পরিস্থিতি ব্লেন্ডেড শিক্ষার অপার সম্ভাবনার বিষয়ে সরকারের চোখ খুলে দিয়েছে। তিনি বলেন, আমরা মহামারির সময়ে দেশব্যাপী ডিজিটাল কাঠামোর সম্পূর্ণ সুবিধা গ্রহণ করেছি। আমরা শিক্ষাব্যবস্থাকে অনলাইনে চালু করেছি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কাজ কমবেশি নিরবচ্ছিন্নভাবে চালিয়ে গেছে। তিনি বলেন, সরকার সারাদেশের শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছাতে দৈনিক লেকচার সেশন সম্প্রচারের ব্যবস্থা করে সংসদ টিভি চ্যানেলকে একটি শিক্ষা চ্যানেলে পরিণত করেছে। শেখ হাসিনা উল্লেখ করেন, সরকার সব পাঠ্যপুস্তক অনলাইনে আপলোড করে বিনামূল্যে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে। এটি শিক্ষার বিষয়বস্তু এবং মডেল ক্লাস লেকচার আপলোড করার জন্য ‘মুক্তপথ’ নামে একটি অ্যাপ চালু করেছে। তিনি বলেন, আমরা শিক্ষকদের অনলাইন শিক্ষার পদ্ধতির সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য তাদের অভিযোজন করার ব্যবস্থা করেছি। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরকার মূল্যায়ন পদ্ধতিতে যথাযথ পরিবর্তন আনার জন্য শিক্ষক ও প্রশাসকদের পরামর্শ দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিক্ষার্থীদের মধ্যে গঠনমূলক চিন্তাভাবনা ও সৃজনশীলতার ওপর জোর দিতে সরকার এখন দেশের স্কুল পাঠ্যক্রমকে নতুন করে সাজিয়েছে। তিনি বলেন, আমরা তাদের মুখস্থবিদ্যা রপ্ত করার পরিবর্তে নিজেরাই যেন চিন্তা করতে এবং কাজ করতে পারে সে বিষয়ে উৎসাহিত করছি। আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সামাজিক এবং বিশ্লেষণাত্মক দক্ষতা দিয়ে গড়ে তোলার আশা করি, যাতে তাদের বিশ্বব্যাপী প্রতিযোগিতার জন্য প্রস্তুত করতে পারি।