শাহানুর রহমান রানা
রাজশাহী নগরীর চন্দ্রিমা থানাধীন চন্দ্রিমা থানার মোড় এখন আতঙ্কের নাম। আর এই আতঙ্কের অন্যতম কারণ হচ্ছে সড়ক দূর্ঘটনা। নওদাপাড়াস্থ কেন্দ্রীয় বাসটার্মিনাল থেকে ছেড়ে আসা গাড়িগুলোর সার্বক্ষণিক চলাচলা ছাড়াও ট্রাক, প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস, ইজিবাইক, রিক্সা, মটরসাইকেল সহ অন্যান্য হালকা ও মাঝারি ধরনের যানবাহনের গন্তব্যমূখী সার্বক্ষণিক চলাচল বহুমূখি এই চত্বর দিয়েই। চারলেন সমৃদ্ধ চতুর্মূখী রাস্তার সংযোগস্থল এই চন্দ্রিমা থানা মোড় মোড়। চারিদিক থেকে রাস্তার সমারোহ একদিকে যেমন দৃষ্টিনন্দন দৃশ্যের সৃষ্টি করেছে ঠিক অন্যদিকে, উক্তস্থানটি এখন দূর্ঘটনার প্রধান পয়েন্ট হিসেবে চিহিৃত হয়েছে স্থানীয়দের কাছে। প্রায় নিয়মিতই স্থানটিতে ঘটে ছোট বড় নানাধরনের দূর্ঘটনা। স্থানীয়দের দেয়া তথ্যমতে, গেল বছর এই সড়কের প্রধান কেন্দ্রস্থলে ঘটেছে প্রায় দেড়শটির মতো দুর্ঘটনা। এরমধ্যে বড় দুর্ঘটনা ঘটেছে প্রায় ২০-২৫ টির মতো। যথার্থ চত্বরবিহীন বহুরাস্তার সমারোহে তৈরি হওয়া উন্মুক্ত কেন্দ্রস্থলই দুর্ঘটনা ঘটার অন্যতম কারণ বলে মন্তব্য স্থানীয়দের। এছাড়াও বেপরোয়া গতিতে বাস-ট্রাক চলাচলের বিষয়টিও দূর্ঘটনা ঘটার একটি কারণ। একই দিনে তিনটি বড় বড় দুর্ঘটনা ঘটারও ইতিহাস আছে এখানে। ঐ মোড়ের ব্যবসায়ি ইমারত হোসেন জানান, প্রায় বারোটি ছোট বড় রাস্তার কেন্দ্রস্থলে কোন প্রকার চত্বর না থাকায় প্রায় প্রতিনিয়তই এখানে ছোট বড় দূর্ঘটনা ঘটে। বাস-ট্রাক, বাস-মাইক্রো, বাস-ইজি বাইক, সিএনজি-বাস, ট্রাক-ইজিবাইক, বাইক-অটোরিক্সা, প্রাইভেটকার-ইজিবাইক, বাস-বাস এমন ভিন্ন ধরনের দূর্ঘটনা এখানে প্রায়শই ঘটে। এখানে একটি বড় আকৃতির চত্বর হবে বলে শুনেছি; কিন্তু কবে নাগাদ হবে সেটা আমরাও জানিনা। তিনি আরো জানান, এবছরের এপ্রিল মাসসহ গেলবছরে বড় বড় দূর্ঘটনা (বাস-ট্রাক-বাস) ঘটেছে প্রায় ২০-২৫টির মতো। একদিনে তিনটা বড় দূর্ঘটনা ঘটার মতো রেকর্ডও আছে এখানে। এছাড়া, মাঝেমধ্যেই এখানে মাঝারি আর ছোটখাটো দূর্ঘটনা ঘটতেই থাকে। বিষয়টি পাশর্^বর্তী চন্দ্রিমা থানার ওসি (তদন্ত) মাঈনুল ইসলাম কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বড় বড় দূর্ঘটনা এখানে অনেকগুলোই হয়েছে। তবে, মৃত্যুবরণ না করা আর লিখিত অভিযোগ না আসার কারণে ছোট ও মাঝারি ধরনের দূর্ঘটনার বর্ণনা ও চিত্র আমাদের কাছে নেই। দবে গেল বছর প্রায় ১৫টির মতো বড় দূর্ঘটনা এই চত্বরে ঘটেছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, চারদিকে তৈরি করা রাস্তাগুলো প্রতিটিই চারলেন হবার কারণে প্রধান সড়কে চলমানবস্থায় দূর্ঘটনা তেমন একটা না ঘটলেও কেন্দ্রস্থলে (চত্বরবিহীন বিশালা আয়তনের চতুর্মূখী মোড়) প্রায়শই ঘটে কোন না কোন দূর্ঘটনা বলে জানান স্থানীয়রা। আর এই নিয়মিত দূর্ঘটনার বেশ কয়েকটি কারণের মধ্যে অন্যতম হলো, বহুমূখী রাস্তার সমারোহে তৈরি হওয়া বিশাল বৃত্তাকৃতির চত্বরের কেন্দ্রগুলো সরাসরিভাবে উন্মুক্ত থাকা। মূলকেন্দ্রস্থল ছাড়াও একাধিক রাস্তার বাঁধাহীন সংযোগস্থলগুলোও চরম ভয়ানক পারাপারের জন্য বলে মন্তব্য গাড়ির চালকদের। এক রাস্তা থেকে অন্য একটি সংযোগ সড়কে গাড়ির টার্নিং নেবার সুবিধার্থে সড়কের মূলকেন্দ্রস্থলের উত্তর-পশ্চিম ও উত্তর-পূর্ব অংশে দুটো ত্রিভূজাকৃতির সড়কদ্বীপ (আইল্যান্ড) নির্মাণ করা হলেও সেগুলোর পাশ দিয়ে তৈরি করা সংযোগ সড়কগুলোতে চলমান হালকা গাড়িগুলোও মাঝেমধ্যেই পতীত হয় বিপরীত দিক থেকে বেপরোয়া গতিতে ছুটে আসা দূরপাল্লার বাস ও ট্রাকগুলোর জন্য বলে মন্তব্য স্থানীয়দের। চত্বরবিহীন উন্মুক্ত মূলকেন্দ্রস্থলটি সর্বদাই দূর্ঘটনার ঝুঁকির বহন করলেও সেই ঝুঁকি নিয়েই চলাচল করছে বিভিন্ন ধরনের যানবাহন। চত্বরবিহীন উন্মুক্ত এই কেন্দ্রস্থলে পৌছানো মাত্রই ঘটে যায় কোন না কোন দূর্ঘটনা। সড়কটির কেন্দস্থলে পৌছানোকালে চতুর্দিক থেকে আসা গাড়িগুলোর বেপরোয়া গতিকে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করতে কোন সড়কেই নেই ‘স্পীড ব্রেকার’, ‘জ্রেবা ক্রসিং’ কিংবা গতিনিরধক তেমস কোন চিহ্নের ব্যবহার। এছাড়াও, উত্তর-দক্ষিণ থেকে আসা গাড়িগুলো মূলচত্বরে পৌছানো অবদি পূর্ববর্তী কোন সুযোগ নেই; পূর্ব-পশ্চিম থেকে আসা গাড়ির গতি ও শ্রেণি সম্পর্কে। একই ঝুঁকিপূর্ণবস্থা বিরাজ করে পূর্ব-পশ্চিম দিক থেকে চত্বরমূখী আসা গাড়িগুলোর জন্যও। রাস্তার মূলকেন্দ্রস্থলে পৌছানের ঠিক আগমূহুর্তে চালকরা বাঁধার সম্মুখিন হন প্রতিটি রাস্তার দুইধারে গড়ে ওঠা বৈধ বাড়ি ঘর আর ছোটখাটো স্থাপনাগুলো। যার কারণে, সড়য়েকর মূলকেন্দ্রস্থলটি অতিক্রম কালীন সময়ে গাড়ির গতি যতসামান্য বেশি থাকা আর কিঞ্চিত পরিমাণ অসাবধানতা মুহুর্তের মধ্যেই ঘটিয়ে দিতে পারে ছোট বড় দূর্ঘটনা। প্রথম থেকে এপর্যন্ত যতগুলো দূর্ঘটনা ঘটেছে তার অধিকাংশ কারণই হচ্ছে উপরোক্ত বিষয়গুলো বলে মন্তব্য স্থানীয় ও প্রত্যক্ষদর্শীদের।
রোজার আগে একইদিনে একইস্থানে তিনটি দূর্ঘটনা ঘটারও নজির আছে বলে জানান স্থানীয়রা। দূর্ঘটনাস্থলের পাশেই চা স্টলের মালিক সোহেল জানান, ঐদিন দুপুরে প্রথম দূর্ঘটনা ঘটে বাস-ট্রাকের সংঘর্ষের কারণে। ঠিক তার একঘন্টা পরেই ঘটে বাস আর ইজিবাইকের সংঘর্ষ। ঐদিন সন্ধ্যার একটু আগে আবারো দূর্ঘটনা ঘটে মাইক্রোবাস আর ইজিবাইকের মধ্যে। বিশালা পরিসরের চত্বরবিহীন বহুরাস্তার কেন্দ্রস্থলে প্রায়শই ঘটে ছোট বড় নানা দূর্ঘটনা।
ঐস্থানের পাশেই রাস্তা সংলগ্ন কফি পয়েন্ট ও টি-স্টলের মালিক কাউসার, পশ্চিম পাশের চা দোকানী কাচ মিয় দৈনিক আমাদের রাজশাহীকে জানান, প্রায় প্রতিনিয়তই ছোট খাটো দূর্ঘটনা এখানে ঘটতেই থাকে। গেল বছরে বেশ কয়েকটি বড় বড় দূর্ঘটনা এখানে ঘটেছে। কাউসার জানান, গত ২৫ এপ্রিল বেলা আনুমানিক বারোটার সময় ট্রাক ও বাসের দূর্ঘটনাটি ছিল বেশ ভয়ঙ্কর। দূর্ঘটনায় পতীত হওয়া ট্রাকটি গাড়ির নিয়ন্ত্রণ রাখতে না পেরে আইল্যান্ড ভেঙ্গে আমার স্টলের সামনে থাকা একটি গাছ ভেঙ্গে রাস্তার পাশে থাকা বেশ কয়েকটি মোটর সাইকেলকে চাঁপা দেয়। ভাগ্যক্রমে ঐসময় কোন বাইক চালক ও ক্রেতা ঐস্থানে দাড়িয়ে ছিলেন না। এছাড়াও ঐ দূর্ঘটনাটি যদি বিকেলে ঘটতো, তবে নির্ঘাত একাধিক ব্যক্তি মারা যেতেন। কারণ প্রতিদিন বিকেলে বিভিন্ন শ্রেণী ও পেশাজীবির ব্যক্তিরা এই এলাকার রাস্তা সংলগ্ন চায়ের দোকানগুলোতে চা খেতে আসেন। প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয়দের দেয়া তথ্যমতে, ঐদিন বেলা বারোটার দিকে বিমান মোড় থেকে একটি ট্রাক যাচ্ছিল পূর্বদিকে। ঠিক একইসময় উত্তরদিক থেকে দক্ষিণমুখি আসছিল একটি বাস। পশ্চিম দিক থেকে আসা দ্রুতগতির ট্রাকটি চতুর্মূখী রাস্তার ঐ পয়েন্ট অতিক্রম করা মাত্রই উত্তর দিক থেকে আসা বেপরোয়া গতির বাসটি ট্রাকের পেছনের অংশে ধাক্কা দেয়। মুহুর্তের মধ্যেই ট্রাকটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তা সংলগ্ন আইল্যান্ডের একাংশ ভেঙ্গে নিয়ে পশ্চিম-উত্তর কোণের একটি কফি ও টি স্টলের সামনে গিয়ে থাক্কা খেয়ে থেমে যায়। চারদিক থেকে আসা চারলেনের রাস্তাগুলোর মূলকেন্দ্রস্থলে চলমান গাড়িগুলো পৌছানোর ঠিক আগমূহুর্তে ডান-বাম থেকে আসা অন্যান্য গাড়িগুলোর গতি বা অবস্থান কোথায় সেটা বোঝার কোন উপায় না থাকার কারণে মূলকেন্দ্রস্থলে পৌছানোটা চলমান গাড়ির জন্য চরম ঝুঁকি। দূর্ঘটনা কমাতে এখানে একটি চত্বর অত্যাবশ্যক বলে মন্তব্য স্থানীয়দের। প্রতিনিয়ত এই সড়ক ব্যবহারে গাড়ি ঘোড়ার সংখ্যা বৃদ্ধি পাবার পাশাপাশি থেমে নেই দূর্ঘটনার সংখ্যাও। আগামীদিনে এই সড়কটি হয়ে উঠবে নগর ও বহির্গমণ যোগাযোগের ক্ষেত্রে অন্যতম বাতিঘর। তাই সড়কটিকে ঝুঁকিমুক্ত করতে প্রয়োজন একটি যথার্থ গোলচত্বর প্রয়োজন বলে মনে করেন সেখানকার ব্যবসায়ী ও জনগন।