আজ বিএনপির সমাবেশ: নয়াপল্টন নয়, গোলাপবাগে

Paris
Update : শনিবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০২২

এফএনএস: ১০ ডিসেম্বর নয়াপল্টনে সমাবেশ নিয়ে অনেক নাটকীয়তার পর বিএনপিকে অবশেষে রাজধানীর সায়েদাবাদে গোলাপবাগ মাঠে সমাবেশের অনুমতি দিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। গতকাল শুক্রবার গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) প্রধান মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ এ তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, বিএনপির প্রস্তাবিত দাবির পরিপ্রেক্ষিতে তাদের গোলাপবাগ মাঠে সমাবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। আজ শনিবার দুপুর ১২টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত সমাবেশ করতে পারবে দলটি। এর আগে মিন্টো রোডে ডিবি কার্যালয়ের সামনে সাংবাদিকদের একই কথা জানান বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, আমাদের প্রত্যাশা ছিল কমলাপুর স্টেডিয়ামে গণসমাবেশ করবো। সেখানে যেহেতু খেলা চলছে এবং কর্তৃপক্ষ আমাদের অন্য একটা জায়গায় বিবেচনা করতে বলেছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে আমরা গোলাপবাগ মাঠের কথা বলেছি। ওঁরা (ডিএমপি) বিষয়টি লিখিতভাবে জানাতে বলেছেন। আমরা লিখিতভাবে জানিয়েছি। এরপর ওঁরা সেখানে গণসমাবেশ করার জন্য বলেছেন। সমাবেশে নিরাপত্তার বিষয়ে ডিবিপ্রধান সাংবাদিকদের বলেন, সমাবেশের শর্ত আগেরগুলোই থাকবে। নিরাপত্তায় থাকবে পর্যাপ্ত সংখ্যক পুলিশ। পোশাকে এবং সাদা পোশাকে পুলিশের সমন্বয়ে যেভাবে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ঘিরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, সেই নিরাপত্তা ব্যবস্থা গোলাপবাগ মাঠে থাকবে। আমাদের টিম অলরেডি কাজ করছে। এদিকে অনুমতি পাওয়ার পরপরই সেখানে জড়ো হতে শুরু করেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। গতকাল শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে গোলাপবাগ মাঠে হাজারখানেক নেতাকর্মীকে দেখা গেছে। এ সময় তাদেরকে বিভিন্ন স্লোগান দিতে দেখা যায়। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে নেতাকর্মীরা সেখানে আসেন। বিএনপি নেতাকর্মীরা জানিয়েছেন, দ্রুতই মঞ্চ বানানোসহ সব ধরনের প্রস্তুতি শুরু হবে। এদিকে ২৬ শর্তে বিএনপিকে গণসমাবেশের অনুমতি দিয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। এর আগে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানেও একই শর্ত দেয় ডিএমপি। গতকাল শুক্রবার ডিএমপির কমিশনারের পক্ষে স্পেশাল অ্যাসিসট্যান্ট (পুলিশ সুপার পদে পদোন্নতিপ্রাপ্ত) মো. তানভীর সালেহীন ইমন সই করা এক লিখিত স্মারকে এ তথ্য জানানো হয়। শর্তগুলো হলোÑ
১. এই অনুমতিপত্র স্থান ব্যবহারের অনুমতি নয়, স্থান ব্যবহারের জন্য অবশ্যই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে অনুমোদন নিতে হবে।
২. স্থান ব্যবহারের অনুমতিপত্রের উল্লিখিত শর্তাবলি যথাযথভাবে পালন করতে হবে।
৩. সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ভেতরে সমাবেশের যাবতীয় কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রাখতে হবে।
৪. নিরাপত্তার জন্য নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় পর্যাপ্তসংখ্যক স্বেচ্ছাসেবক (দৃশ্যমান আইডি কার্ডসহ) নিয়োগ করতে হবে।
৫. স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের নির্দেশনা অনুযায়ী নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় সমাবেশস্থলের ভেতরে ও বাইরে উন্নত রেজুলেশনের সিসি ক্যামেরা স্থাপন করতে হবে।
৬. নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় প্রতিটি প্রবেশ গেটে আর্চওয়ে স্থাপন করতে হবে এবং সমাবেশস্থলে আগতদের হ্যান্ড মেটাল ডিটেক্টরের মাধ্যমে চেকিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে।
৭. নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ভিউকল স্ক্যানারের মাধ্যমে সমাবেশস্থলে আসা সব যানবাহন তল্লাশির ব্যবস্থা করতে হবে।
৮. নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় সমাবেশস্থলে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা রাখতে হবে।
৯. সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বাইরে ও আশপাশে মাইক ব্যবহার করা যাবে না।
১০. সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রজেক্টর স্থাপন করা যাবে না।
১১. সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বাইরে, রাস্তায় বা ফুটপাতে কোথাও লোক সমবেত হওয়া যাবে না।
১২. আজান, নামাজ ও অন্যান্য ধর্মীয় সংবেদনশীল সময় মাইক ব্যবহার করা যাবে না।
১৩. ধর্মীয় অনুভূতির ওপর আঘাত আসতে পারে এমন কোনো বিষয়ে ব্যঙ্গচিত্র প্রদর্শন, বক্তব্য প্রদান বা প্রচার করা যাবে না।
১৪. অনুমতি দেওয়া সময়ের মধ্যে সমাবেশের কার্যক্রম শেষ করতে হবে।
১৫. সমাবেশ শুরুর দুই ঘণ্টা আগে লোকজন সমবেত হওয়ার জন্য আসতে পারবে।
১৬. সমাবেশস্থলের আশপাশসহ রাস্তায় কোনো অবস্থায় সমবেত হওয়াসহ যান ও মানুষ চলাচলে প্রতিবন্ধকতা করা যাবে না।
১৭. পতাকা, ব্যানার ও ফেস্টুনের আড়ালে কোনো ধরনের লাঠি-রড ব্যবহার করা যাবে না।
১৮. আইনশৃঙ্খলা পরিপন্থি ও জননিরাপত্তা বিঘ্নিত হয় এমন কোনো কার্যকলাপ করা যাবে না।
১৯. রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপ ও বক্তব্য দেওয়া যাবে না।
২০. উসকানিমূলক বক্তব্য প্রদান বা প্রচারপত্র বিলি করা যাবে না।
২১. মিছিল সহকারে সমাবেশস্থলে আসা যাবে না।
২২. নির্ধারিত স্থানে গাড়ি পার্কিং করতে হবে, মূল সড়কে কোনো পার্কিং করা যাবে না।
২৩. সমাবেশস্থলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতি হলে আয়োজনকারী কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে।
২৪. স্বাস্থ্যবিধি যথাযথভাবে অনুসরণ করে সমাবেশ করতে হবে।
২৫. উল্লিখিত শর্তাবলি পালন না করলে তাৎক্ষণিকভাবে এই অনুমতির আদেশ বাতিল বলে গণ্য হবে।
২৬. জনস্বার্থে কর্তৃপক্ষ কোনো কারণ দর্শানো ছাড়া এই অনুমতি আদেশ বাতিল করার ক্ষমতা সংরক্ষণ করেন।
এদিকে সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালের কাছে গোলাপবাগ মাঠে অনুষ্ঠেয় গণসমাবেশে সবাইকে শরিক হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে বিএনপি। গতকাল শুক্রবার রাতে গুলশানে বিএনপির চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে এ কথা জানান দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, শনিবার বেলা ১১টায় গোলাপবাগ মাঠে গণসমাবেশ শুরু হবে। সমাবেশ সফল করতে দলের নেতাকর্মী ও সাধারণ জনগণ ও যুগপৎ আন্দোলনের বিষয়ে যারা একমত হয়েছিলেন তাদের শরিক হওয়ার জন্য আহ্বান করছি। তিনি বলেন, নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে দলীয় কার্যালয়ের সামনে নয়াপল্টন সড়কে ঢাকা বিভাগীয় সমাবেশের সম্মতি চেয়ে লিখিত চিঠি দেওয়া সত্ত্বেও তা নিয়ে সরকার গড়িমসি করে। আমরা না চাওয়া সত্ত্বেও অযাচিত ও স্বপ্রণোদিত হয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ২৬ শর্তে গণসমাবেশের সম্মতি দেয় পুলিশ। তা প্রত্যাখ্যান করে বিএনপি আলোচনার মাধ্যমে তৃতীয় কোনো উপযুক্ত স্থানে সমাবেশ করার অনুমতি চায়। তাতেও গড়িমসি করা হয়। আজ (গতকাল শুক্রবার) দুপুরে আমাদের একটি প্রতিনিধিদল ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার বরাবর রাজধানীর সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালের কাছে গোলাপবাগ মাঠে গণসমাবেশ করার জন্য চিঠি দেয়। আমাদের চাহিদা মোতাবেক গোলাপবাগ মাঠে গণসমাবেশের অনুমতি দিয়েছে পুলিশ। এত গরিমসি করে এ গোলাপবাগ মাঠ দেওয়া হয়েছে এর একটিই উদ্দেশ্য হচ্ছে যাতে ঢাকা বিভাগীয় গণসমাবেশে সবার অংশগ্রহণ সুনিশ্চিত করতে না পারি। সেজন্যই ভেন্যু নিয়ে এত লুকোচুরি….। বিএনপির এ নেতা বলেন, বিএনপি নেতাকর্মী, জনগণ ও ভবিষ্যতে যুগপৎ আন্দোলনে যেসব দল, ব্যক্তি সহযোগিতা করবেন তাদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই- শনিবার গোলাপবাগ মাঠে ঢাকা বিভাগীয় গণসমাবেশ সকাল ১১টা থেকে শুরু করবো। আমরা আমাদের সব নেতাকর্মী, সমর্থক, এবং অন্যান্য দল যারা ভবিষ্যতে আমাদের সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলন করবেন তাদের সবাইকে এ ব্রিফিংয়ের মাধ্যমে আহ্বান জানাতে চাই শনিবারের শান্তিপূর্ণ সমাবেশ সফল করার জন্য সবাই উপস্থিত হবেন। বিশেষ করে ঢাকাবাসীকে আমার আবেদন ঢাকার যারা জনসাধারণ আছেন, দলের নেতাকর্মী নয়, সেই সব পর্যায়ের জনসাধারণকে আহ্বান জানাচ্ছি নিজেদের মনের কথা বলার জন্য সমাবেশে উপস্থিত হোন। ১০ ডিসেম্বর সমাবেশে কী হবে এ নিয়ে অপপ্রচার করা হয়েছে মন্তব্য করে মোশারফ বলেন, বিএনপি মহাসচিব বারবার বলেছেন- যে জনগণ বিভাগীয় সমাবেশগুলোতে যে রায় দিয়েছে, যে মতামত ব্যক্ত করেছে…সেগুলোই আমাদের দাবি। আমাদের দাবি হলো- খালেদা জিয়ার মুক্তি, নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ করা, লোডশেডিং কন্ট্রোলে আনা, ভবিষ্যতে একটি নিরপেক্ষ নির্দলীয় সরকারের মাধ্যমে নির্বাচন। এসব দাবিগুলোতে কিন্তু আমরা আমাদের সমাবেশগুলো করেছি। শনিবার এ দাবি নিয়েই সমাবেশ হবে। যে সমাবেশ থেকে আমরা আগামীদিনের এ সরকারের বিদায়ের জন্য কতগুলো দফা ঘোষণা করবো এবং এখান থেকেই আমাদের যুগপৎ আন্দোলনের প্রস্তুত। তাদের সঙ্গে এরইমধ্যে আলোচনা হয়েছে। মোশাররফ হোসেন বলেন, গত বৃহস্পতিবার রাত সোয়া তিনটার দিকে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলা আলমগীর ও ঢাকা বিভাগীয় সমাবেশের প্রধান উপদেষ্টা স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসকে নিজ নিজ বাসা থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সাদা পোশাকে নিয়ে যায়। গতকাল শুক্রবার ডিবি কার্যালয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। বর্তমানে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়েছে। আমরা এ ধরনের ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। এসময় এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে মোশারফ বলেন, পুলিশ কমিশনার নয়, এ স্থানের জন্য আমরাই প্রস্তাব দিয়েছি। আমরা গতকাল (গত বৃহস্পতিবার) রাতে এ প্রস্তাব দিয়েছি। পুলিশ কমিশনারকে মির্জা আব্বাস সাহেব নিজেই এ প্রস্তাব দিয়েছেন। তার সেই প্রস্তাব নিয়ে আজকে আমাদের প্রতিনিধি পুলিশ কমিশনারের কার্যালয়ে গিয়েছিল। এর তারা আমাদের গোলাপবাগ মাঠে সমাবেশ করার অনুমতি দেয়। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিএনপি মহাসচিব ও গণসমাবেশের প্রধান উপদেষ্টার অনুপস্থিতিতে সমাবেশ করছি…। আমি বলবো, এ সমাবেশ এখন আর দলীয় কোনো সমাবেশ না, এটা জনগণের সমাবেশ। জনগণ এ সমাবেশকে তরান্বিত কববে। তাই আমরা কেউ থাকলাম, না থাকলাম সেটা গুরত্বপূর্ণ নয়। এখন সমাবেশটাই গুরত্বপূর্ণ। আর সরকার এতসব করছে যাতে সমাবেশ না করি, কিন্তু আমরা দৃঢ়ভাবে প্রতিজ্ঞ জনগণের এ সমাবেশ জনগণই করবে। এসময় সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, সেলিমা রহমান, আবদুল মঈন খান, দলের ভাইস চেয়ারম্যান ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, আইন বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার কায়সার কামাল উপস্থিত ছিলেন।


আরোও অন্যান্য খবর
Paris