এফএনএস : সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার (এটিইও) পদ থেকে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার (টিইও) পদে পদোন্নতির কোটা বাড়ানোর বিষয়ে ১৯৯৪ সালের সুপারিশ বাতিলে করা রিট খারিজের পরেও তথ্য গোপন করে মন্ত্রণালয়ে দেওয়া রায়ের কপি জাল ও ভুয়া বলে আদেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। তাই এ জাল এবং ভুয়া রায়ের তৈরির সঙ্গে জড়িতদের খুঁজে বের করে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলকে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে হাইকোর্টের বৃহত্তর বেঞ্চের আদেশের কপি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা সচিব, জনপ্রশাসন সচিব, সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) সচিব এবং প্রাথমিক শিক্ষা অধিপ্তরের মহাপরিচালকের (ডিজি) কাছে পাঠাতে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। এ বিষয়ে ফেনী প্রাইমারি টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের (পিটিআই) ইনস্ট্রাক্টর ও বাংলাদেশ পিটিআই কর্মকর্তা সমিতির আইন সম্পাদক জাকির হোসেনের করা আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গঠন করা হাইকোর্টের বৃহত্তম বেঞ্চ গত বুধবার এ আদেশ দেন। জালিয়াতি করে রায়ের অনুলিপি সংশ্লিষ্ট দপ্তরে যাওয়ার পরে কর্তৃপক্ষ বিষয়টি অবগত হওয়া বিচারপতি নাঈমা হায়দারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের হাইকোর্টের বৃহত্তর বেঞ্চ এ আদেশ দেন।
এ বেঞ্চের অপর দুই সদস্য হলেন- বিচারপতি মো. জাকির হোসেন ও বিচারপতি কাজী জিনাত হক। গত বুধবার আদালতে আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মোহাম্মদ মশিউর রহমান ও আইনজীবী মো. তাজুল ইসলাম। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল অমিত তালুকদার। হাইকোর্ট বলেছেন, এটিইওদের পদোন্নতির বিষয়ে দুটি রায় দেখা যাচ্ছে। একটি রুল খারিজের, অন্যটি রুল মঞ্জুরের (অ্যাবসলুটের)। আমাদের পর্যবেক্ষণ হলো এখানে জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে। রুল খারিজের রায়টি সঠিক। তা বহাল থাকবে। জানা গেছে, সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) সুপারিশক্রমে ‘প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের গেজেটেড অফিসার ও নন-গেজেটেড কর্মচারীদের নিয়োগ বিধিমালা-১৯৮৫’ তৈরি করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
এ বিধিমালায় এটিইওদের মধ্য থেকে টিইও পদে পদোন্নতির জন্য ৫০ শতাংশ কোটা রাখা হয়। আর বাকি ৫০ শতাংশ টিইও সরাসরি নিয়োগের বিধান রাখা হয়। ১৯৯১ সালে এটিইওদের মধ্য থেকে ৮০ শতাংশ টিইও নিয়োগের জন্য শিক্ষাসচিব বরাবর সুপারিশ করে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর। কিন্তু ১৯৯৪ সালে এ বিধিমালা সংশোধন করে এটিইও থেকে টিইও হওয়ার কোটা ২০ শতাংশে নামিয়ে আনে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। ২০০২ সালে আবারও এ কোটা ৮০ শতাংশ করার সুপারিশ করে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর। পরে কোটা কমাতে ১৯৯৪ সালে করা বিধি চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করেন এটিইও মুন্সি রুহুল আসলাম। ২০১৬ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি বিচারপতি আশফাকুল ইসলাম ও বিচারপতি জাফর আহমেদের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ রিটটি পর্যবেক্ষণসহ খারিজ করে রায় দেন। এরপরই রায় জালিয়াতির ঘটনা ঘটে। রুল মঞ্জুর হয়েছে মর্মে জাল রায় তৈরি করে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট বিবাদীদের কাছে দাখিল করে রিটকারীপক্ষ। এ আগে জাল রায়ে বলা হয়, ২০০২ সালে কোটা বাড়ানোর যে সুপারিশ করা হয় তা বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। জাল রায়ের আলোকে ১৯৮৫ সালের বিধিমালা পুনরায় সংশোধনের উদ্যোগ নেয় সরকার।
সংশোধিত বিধিমালায় হাইকোর্টের (জাল) রায়ের আলোকে এটিইওদের মধ্য থেকে টিইও পদে পদোন্নতির কোটা ৮০ শতাংশ করার বিধান করা হয়। এরপর এ জাল রায়ের ভিত্তিতে এটিইওদের মধ্য থেকে টিইও পদে পদোন্নতির কোটা ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৮০ শতাংশ করতে বিধিমালা সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। বর্তমানে সংশোধিত ওই পদোন্নতির বিধিমালাটি পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। অন্যদিকে, রায় জালিয়াতির বিষয়টি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অন্য একটি দপ্তরের কর্মকর্তারা টের পেয়ে যান। এরপর মূল রায় এবং নকল রায়ের কপি সংগ্রহ করে এ বিষয়ে তদন্ত চেয়ে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল বরাবর আবেদন করা হয়। ফেনী পিটিআই ইনস্ট্রাক্টর ও বাংলাদেশ পিটিআই কর্মকর্তা সমিতির আইন সম্পাদক জাকির হোসেন এ আবেদন করেন। পরবর্তীতে রায় জালিয়াতির বিষয়টি প্রাথমিক অনুসন্ধানে সত্যতা পায় সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন। এরপর প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী এ জাল রায়ের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বিচারপতি নাঈমা হায়দারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্য বিশিষ্ট হাইকোর্টের বৃহত্তর বেঞ্চ গঠন করে দেন। গত বুধবার হাইকোর্টের বৃহত্তম বেঞ্চ রুল খারিজের রায়টি সঠিক বলে ঘোষণা করে আদেশ দেন এবং রায় জালিয়াতির ঘটনা তদন্ত করে ব্যবস্থার নেওয়ার নির্দেশ দেন।