রাব্বানী-মামুনের দিন শেষ হচ্ছে?
আলিফ হোসেন, তানোর : রাজশাহীর তানোর উপজেলা আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সভাপতি গোলাম রাব্বানী ও সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল-মামুনের দীর্ঘ প্রায় দেড় দশকের একচ্ছত্র আধিপত্যর অবসানের মধ্য দিয়ে প্রস্থান হতে চলেছে। আগামি ১৬ জুন তানোর উপজেলা আওয়ামী লীগের ত্রি-বার্ষিক সম্মেলন আয়োজন করা হয়েছে। ইতমধ্যে দলের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন বিগত দিনে যারা নৌকার বিরোধীতা করেছে, বিরোধীদের মদদ দিয়েছে, দলীয় সাংসদের বিরোধীতার নামে দলে কোন্দল সৃষ্টি করেছে তারা দলের কোনো পদে আসতে পারবে না, এমনকি কমিটি গঠনেও তাদের কোনো ভুমিকায় রাখা হবে না। আর প্রধানমন্ত্রী যা বলেন তা করেন। এসব বিবেচনায় রাব্বানী-মামুন ছিটকে পড়ছেন এটা প্রায় নিশ্চিত।
তৃণমূলের অভিযোগ স্থানীয় সাংসদের আর্শিবাদে এরা দলের দায়িত্বশীল পদে থেকে এমপির দুই বগলের নিচে স্থান নিয় এমপির কাছে কোনো নেতাকর্মীকেই ভিড়তে না দিয়ে তারা ফুঁলেফেঁপে উঠেন। অথচ দায়িত্বশীল পদে থেকেও দীর্ঘদিন ধরে দলীয় কোনো কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেননি, তবে সভাপতি-সম্পাদক পরিচয় বহণ করে সকল সুযোগ-সুবিধা নিয়ে বেশ মোটাতাজা ও পকেটভারী করে আদর্শিকতার নামে নীতি-নৈতিকতা ও আদর্শ বিসর্জন দিয়ে দল, নেতা ও নেতৃত্বের সঙ্গে বেঈমানী করেছেন। এমনকি বাঙালী জাতির জনক ও স্বাধীনতার মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস, জন্মশতবার্ষিকী (মুজিববর্ষ-২০২০) উদযাপন, ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস ও ২১ আগস্ট গ্রনেড হামলা দিবসের প্রতিবাদ কর্মসুচিতে অংশগ্রহণ করেননি।
এদিকে ২০২২ সালে এসে কমিটি গঠনের খবরে তারা নড়েচড়ে উঠে, তবে তৃণমুলের তোপের মুখে মাঠে নামতে পারেনি। আবার নিভৃত পল্লীতে তারা যে একটা কর্মসুচি করেছে সেখানেও একই কাসুন্দী কর্মসুচির উপর কোনো বক্তব্য না দিয়ে উদ্দেশ্যেপ্রণোদিত হয়ে এমপি, উপজেলা ও ইউপি চেয়ারম্যানসহ দলের আদর্শিক নেতাদের বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডা করেছে। অপরদিকে তানোর উপজেলা আওয়ামী লীগের কমিটি গঠনের জন্য ওয়ার্ড পর্যায়ে কমিটি গঠন কার্যক্রমে তৃণমূলের দাবী যারা আওয়ামী লীগের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা ও বেঈমানী করে জাতীয় সংসদ, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে কোনো ভূমিকা রাখেনি এমনকি আওয়ামী লীগবিরোধীদের সঙ্গে সখ্যতা করেছে তারা যত বড় মাপের নেতা হোক এবার আওয়ামী লীগের কমিটিতে তাদের জায়গা হবে না।
এসব বিবেচনায় গোলাম রাব্বানী ও আব্দুল্লাহ আল-মামুনের কপাল পুড়ছে এটা প্রায় নিশ্চিত বলে মনে করছে তৃণমুল। স্থানীয় নেতাকর্মীদের অভিযোগ, উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি গোলাম রাব্বানী এমপি ও সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল-মামুন উপজেলা চেয়ারম্যানের খোয়াব দেখে এমপি ফারুক চৌধূরীর বিরোধীতা ও পৃথক বলয় সৃষ্টির নামে দলীয়কোন্দল সৃষ্টি ও আওয়ামী লীগের খোলস পরে জামায়াত-বিএনপির আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতায় তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়নে তাদের বি-টিম হয়ে কাজ করেছে। তারা এমপির বিরোধীতার নামে প্রাসাদ ষড়যন্ত্র ও পরিকল্পনা করে মাঠে নেমে আওয়ামী লীগ এবং সহযোগী সংগঠনের নেতা ও কর্মী-সমর্থকদের কাছে টানতে ব্যর্থ হয়ে রাজনীতিতে ‘বাঁবুই ভেঁজা’ (সবকিছু থেকেও নাই) হয়ে পড়েছে।
তৃণমূলের ভাষ্য, রাব্বানী এমপি মনোনয়ন প্রত্যাশা করে এক সময় মাঠে নগদ নারায়ন (টাকা) ছড়িয়ে এলাকার কিছু জনবিচ্ছিন্নদের মধ্যে নিজের জনপ্রিয়তার মোহ সৃষ্টি করে ছিলেন। কিন্ত্ত যেই টাকা ছড়ানো বন্ধ অমনি মোহের হাটে ভাঙ্গন মোহ আর বাস্তব পরস্পরবিরোধী সেটা এখন তিনি হাঁড়ে হাঁড়ে টের পাচ্ছেন। তৃণমূলের অভিমত, তার পরিকল্পনা ছিল নির্বাচনের মৌসুমে মনোনয়ন প্রত্যাশী দাবি করে কিছু টাকা-পয়সা ছড়িয়ে কিছু জনবিচ্ছিন্নদের মধ্যে নিজের জনপ্রিয়তার মোহ সৃষ্টি করে এমপি ফারুক চৌধূরীর ওপর অদৃশ্য চাপ সৃষ্টি করতে পারলেই তাকে দ্বিগুন মূল্য দিয়ে কাছে টানবে, এমপিকে জিম্মি করে রাজনীতি করাও হবে। তবে ফারুক চৌধুরী জিম্মি হবার মানুষ নয় তারা সর্বস্ব হারিয়ে সেটা উপলব্ধি করছে।
ওদিকে নির্বাচনের পর দীর্ঘদিন অতিবাহিত হলেও এমপি ফারুক চৌধূরী এখানো তাদের কাছে না টানায় তাঁদের সেই স্বপ্ন ও পরিকল্পনা উবে গেছে। একদিকে অর্থ সংকটে তারা না পারছেন মাঠে নামতে, অন্যদিকে এমপি তাদের না ডাকায় না পারছেন এমপির কাছে যেতে, অর্থাৎ সবকিছু হারিয়ে এখন তারা নিজ ঘরেই পরবাসি বা ‘বাঁবুই ভেঁজা’ হয়ে পড়েছে, রাজনীতির আকাশে রাব্বানী-মামুন নামে যে সুর্যাস্ত হয়েছে, তার আর উদয় হবে না বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। আবার আব্দুল্লাহ আল-মামুন উপজেলা চেয়ারম্যানের খোয়াব দেখলেও মনোনয়ন বঞ্চিত হয়ে নৌকার বিজয় ঠেকাতে নৌকাবিরোধীদের পক্ষে কাজ করেছে। কিন্তু তাদের বেঈমানী ও বিশ্বাসঘাতকতার পরেও নৌকার বিজয় ঘটেছে আর নৌকার বিজয়ের মধ্যে দিয়ে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে রাব্বানী-মামুন অধ্যায়ের সূর্যাস্ত হয়েছে।
তাদের রাজনৈতিক অদুরদর্শিতার কারণেই রাজনৈতিক অঙ্গনে তাদের ঝড়ের গতিতে উঙ্খান ও টর্নেডোর গতিতে পতন হয়েছে বলে অভিমত তৃণমূলের। রাজনীতিতে নেতৃত্বের প্রতিযোগীতা থাকবে সেটাই স্বাভাবিক। কিন্ত্ত এমপি ও উপজেলা চেয়ারম্যানের বিরোধীতার নামে বিদ্রোহী প্রার্থী দিয়ে সরাসরি প্রকাশ্যে নৌকার বিপক্ষে ভোট করার পর নৈতিকভাবে সেই নেতৃৃৃৃত্ব আর আওয়ামী লীগ থাকে না। কারণ নৌকার মালিক এমপি বা উপজেলা চেয়ারম্যান নয় নৌকার মালিক স্বয়ং দলের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাই যারা আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল পদে থেকেও প্রকাশ্যে নৌকার বিপক্ষে ভোট করেছে তারা সরাসরি দলের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রীর বিপক্ষে ভোট করেছে। এসব বিবেচনায় তাদের আওয়ামী লীগে থাকার কোনো যোগ্যতায় নাই। এক ক্ষুরে মাথা মোড়ানোদের (একই দলভুক্ত) দিন শেষ হতে চলেছে।
জানা গেছে, স্থানীয় সাংসদ ওমর ফারুক চৌধূরীর বিরোধীতা করে মাঠে নেমে তানোর আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে গোলাম রাব্বানী ও আব্দুল্লাহ আল-মামুন প্রায় একা হয়ে পড়েছে, দলের আদর্শিক সিনিয়র নেতারা অনেক আগেই তাদের ত্যাগ করেছে পাশাপাশি তৃণমূলের নেতাকর্মীরাও মূখ ফিরিয়ে নিয়েছে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের দায়িত্বশীল তেমন কোনো নেতাকর্মী তাদের সঙ্গে নাই এক সময় যারা ছিল তারাও সঙ্গ ত্যাগ করেছে। ফলে চরম ঝুঁকির মূখে পড়েছে তাদের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার আওয়ামী লীগে টিকে থাকায় তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।
এবিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি গোলাম রাব্বানী এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তৃণমুলের মতামতের ভিত্তিত্বে নেতৃত্ব নির্বাচিত করা হলে তারা আবারো সভাপতি-সম্পাদকের দায়িত্ব পাবেন বলে শতভাগ আশাবাদি। তিনি সকলের মতামতের ভিত্তিত্বে কমিটি গঠনে দলের নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। এবিষয়ে জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি শরিফ খাঁন বলেন, আগামি ১৬ জুন উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনে রাব্বানী-মামুনের আশার কোনো সুযোগ নাই। তিনি বলেন, উপজেলার নেতাকর্মীরা দেখতে চাই রাব্বানী-মামুন ব্যতিত আওয়ামী লীগ করা যায় কি না, দল বড় না এরা বড়, নৌকার শক্তি বেশী না তাদের শক্তি বেশী।
