এফএনএস : নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে সজীব গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান হাসেম ফুড অ্যান্ড বেভারেজের সেজান জুস কারাখানার আগুন দীর্ঘ ৪৫ ঘন্টা পর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনতে পেরেছেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। গত বৃহস্পতিবার বিকাল থেকে গতকাল শনিবার বিকেল পর্যন্ত ফায়ার সার্ভির কর্মীরা টানা চেষ্টা চালিয়ে এ আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। গতকাল শনিবার বিকেল ৫টা ২০ মিনিটে আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসার পর সাংবাদিকদের এ তথ্য নিশ্চিত করেন ফায়ার সার্ভিসের উপ-পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) দেবাশীষ বর্ধন।
আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে ৪৫ ঘণ্টা সময় লাগার কারণ কী -এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কারখানার আগুনটি ছিল হার্ড ফায়ার। এ ভবনে একাধিক সমস্যা রয়েছে। ভবনের প্রত্যেক ফ্লোরে নেট দিয়ে ব্যারিকেড ছিল। আবার কিছুকিছু জায়গায় তালাবদ্ধ ছিল। এরমধ্যেও আমরা কাজ করেছি। কারখানাটিতে একাধিক খাদ্য তৈরি হত। এগুলো প্যাকিং করার জন্য ফয়েল পেপার, প্লাস্টিকের বোতল, নিচতলায় ছিল টন টন প্যাকিং কাগজের রোল। এসব দাহ্য বস্তু থেকে আগুন ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে।
আমরা একদিকে পানি দিলে অন্যদিকে আগুন ছড়িয়ে যায়। বিভিন্ন দাহ্য বস্তু ও ক্যামিকেল থাকায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে বেশি সময় লাগে’ যোগ করেন তিনি। অগুনের সূত্রপাতের বিষয়ে ফায়ার সার্ভিসের এ উপ-পরিচালক বলেন, একাধিক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। লেফটেন্যান্ট কর্নেল জিল্লুর রহমানের নেতৃত্বে ফায়ার সার্ভিসও তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। আগুনের সূত্রপাত, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ, ভবনের দুর্বলতা ও কারখানায় আগুন নির্বাপণের যথেষ্ট সরঞ্জাম ছিল কি-না, সবকিছু তদন্তের পর বলা যাবে।
তিনি বলেন, পাঁচতলার ফ্লোর ধ্বসে পড়েছে। ভবনটি অত্যন্ত ঝুকিপূর্ণ। বুয়েট থেকে বিশেষজ্ঞ এসে তারা পরীক্ষা-নিরিক্ষা করার পর পরিত্যক্ত ঘোষণা করবে। কারখানার ভবনটিতে ফায়ার সার্ভিসের অনুমোদন ছিল না জানিয়ে দেবাশীষ বর্ধন বলেন, ফায়ার সার্ভিস থেকে প্রতিটি কারখানার ভবনের জন্য ফায়ার সেফটি প্ল্যানের একটি অনুমোদন দেয়া হয়। কিন্তু ভবনটির নকশা ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের অনুমোদন ছিল না। রাজউকের ছাড়পত্র, কারখানা অনুমোদনের ছাড়পত্র, পরিবেশের ছাড়পত্র নিয়েছিল কি-না, তা আমাদের জানা নেই।
ফায়ার সার্ভিসের এ কর্মকর্তা বলেন, প্রতিটি শিফটে ৩০০-৪০০ ফায়ার ফাইটার কাজ করেছে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অতিরিক্ত তাপ সহ্য করেও ফায়ার ফাইটাররা প্রথম রাত থেকেই ভেতরে ঢুকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে কাজ করে। কারখানায় অনেক দাহ্য বস্তু ছিল। কিছুক্ষণ আগেও এক টন কাগজের রোল থেকে মাঝে মাঝে ধোঁয়া দেখা যাচ্ছিল। আমাদের টিম কাজ করে ধোঁয়া বন্ধ করে দেয়। তিনি আরও বলেন, গত শুক্রবার চারতলা থেকে ৪৯ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়। আর হাসপাতালে তিনজনের লাশ পাওয়া গিয়েছিল। মোট ৫২ জনের লাশ ছাড়া আর কোনো লাশ আমরা পাইনি।
ভেতরেও আর কোনো লাশ নেই। এছাড়াও ঘটনার দিন ৫২ জনকে টিটিএল দিয়ে জীবিত উদ্ধার করা হয়। গতকাল শনিবার সকালে আগুনের সূত্রপাত প্রসঙ্গে ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন) ও তদন্ত কমিটির প্রধান লে. কর্নেল জিল্লুর রহমান বলেছিলেন, সেজান জুস কারখানার ভেতরে মেশিন ও কেমিক্যাল একসঙ্গে রাখার কারণে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে। কারণ কারখানার প্রতিটি ফ্লোরে কেমিক্যাল স্তূপ করে রাখা হয়েছিল। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের এ কারণেই আগুন নেভাতে বেগ পেতে হয়েছে।
এ ছাড়া কেমিক্যালসহ দাহ্য পদার্থ ও প্লাস্টিক, ফয়েল কাগজ, কার্টুনসহ বিভিন্ন মালামাল থাকার কারণেই আগুন ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। এজন্য অনেক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। ভবনটি নির্মাণে ত্রুটি ছিল। এ বিষয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কমিটি প্রতিবেদনে আগুন লাগার কারণ চিহ্নিতকরণসহ সবকিছু চিহ্নিত করে সুপারিশ করা হবে। জিল্লুর রহমান আরও বলেন, ছয়তলায় গোডাউনের মতো ছিল। সেখানে আমরা তল্লাশি চালিয়েছি। কিন্তু কোনও লাশ পাইনি।