বিএমডিএ-কে কার্যকর, লাভজনক টেকসই প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করতে যা করা দরকার
শফিকুল আলম সমাপ্ত : বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডিএ) সেচ ব্যবস্থা, প্রাতিষ্ঠানিক পরিচালনা, কারিগরি সক্ষমতা এবং রাজস্ব কাঠামোর সার্বিক চিত্র পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় যে, বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষি ও পরিবেশ রক্ষা এবং সংস্থাসংক্রান্ত সকল চ্যালেঞ্জ একে অপরের সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত। শুষ্ক মৌসুমে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর অস্বাভাবিক নিচে নেমে যাওয়া এবং বিএমডিএ-র নির্ধারিত সেচ সীমানার ভেতরে অননুমোদিতভাবে অগভীর নলকূপ স্থাপনই পুরো সংকটের মূল উৎস। বিএমডিএ বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করে গভীর নলকূপ, বিদ্যুতায়ন এবং পাকা নালা তৈরি করলেও কমান্ড এরিয়ার মধ্যে অপরিকল্পিত অগভীর নলকূপ গড়ে ওঠায় গভীর নলকূপগুলোর সেচ এলাকা ও সেচ ঘণ্টার পরিমাণ মারাত্মকভাবে কমে গেছে। এতে একদিকে যেমন দুই ধরনের পাম্পের মধ্যে পানির তীব্র প্রতিযোগিতা তৈরি হয়ে বিদ্যুৎ খরচ বহুগুণ বাড়ছে, অন্যদিকে বিএমডিএ-র প্রিপেইড কার্ড বিক্রির আয় আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পাচ্ছে। এর সাথে যোগ হয়েছে বিএমডিএ-র নির্মিত পাকা নালা ও ভূগর্ভস্থ পাইপলাইন অবৈধভাবে ব্যবহার করে বাইরের নলকূপ থেকে পানি সরবরাহের ঘটনা, যা থেকে সংস্থা কোনো ব্যবহারকারী ফি পাচ্ছে না, অথচ তাদের স্থায়ী পরিচালন ব্যয় এবং বিদ্যুৎ বিল ঠিকই অপরিবর্তিত থাকছে। এই প্রাতিষ্ঠানিক ও অর্থনৈতিক ঘাটতি আরও তীব্র রূপ নিচ্ছে মাঠপর্যায়ে প্রকৌশলী ও কর্মীদের নজরদারির শিথিলতার কারণে। প্রিপেইড মিটারের কারিগরি ত্রুটি সময়মতো সমাধান না করা, ড্রেনেজ লাইনের লিক মেরামত না করা এবং ঘন ঘন ভোল্টেজ ওঠা-নামার ফলে পাম্পের মোটর পুড়ে যাওয়া প্রতিরোধে আগাম ব্যবস্থা না নেওয়ায় বিপুল পরিমাণ রাজস্ব অপচয় হচ্ছে এবং কৃষকরা বিকল্প সেচের দিকে ঝুঁকছেন। প্রশাসনিক ক্ষেত্রে সংস্থার শীর্ষ নেতৃত্বে বারবার বহিরাগত কর্মকর্তা পদায়নের ফলে বরেন্দ্র অঞ্চলের জটিল ভৌগোলিক ও কারিগরি বাস্তবতা বুঝে উঠে সুদূরপ্রসারী কৌশল গ্রহণে বিলম্ব ঘটে। তবে অভ্যন্তরীণ কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে নেতৃত্ব নির্বাচন করা হলে ক্ষেত্রভিত্তিক অভিজ্ঞতার পূর্ণ ব্যবহার সম্ভব হলেও, দীর্ঘদিনের চেনা পরিবেশে সহকর্মীদের অনিয়ম দমন করা বা রাজনৈতিক চাপ সামলানো কিছুটা কঠিন হয়ে পড়ে। পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা নীতি নির্ধারণে ভূমিকা রাখলেও মাঠপর্যায়ে সাধারণ কৃষকদের ভোগান্তি নিরসন এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিতে গণশুনানি বা কঠোর মনিটরিংয়ের ঘাটতি স্পষ্ট।
এসব জটিল সংকট থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে বিএমডিএ-কে একটি কার্যকর, লাভজনক ও টেকসই প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করতে প্রথমত কমান্ড এরিয়ায় অগভীর নলকূপ স্থাপনে কঠোর দূরত্ব নীতি প্রয়োগ করতে হবে এবং বিএমডিএ-র অবকাঠামো ব্যবহারের জন্য বাধ্যবাধকতামূলক ফি আদায় নিশ্চিত করতে হবে। প্রযুক্তিগত আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে পাম্প হাউজগুলোতে ভোল্টেজ স্ট্যাবিলাইজার বা ভিএফডি সংযোজন, সাকশন হেডের চাপ কমাতে পাম্পের গভীরতা সমন্বয় এবং কৃষকদের জন্য প্রিপেইড কার্ড রিচার্জ সহজ করতে ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু করা জরুরি। সংস্থার শীর্ষ নেতৃত্বে বাস্তব অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কর্মকর্তাদের অগ্রাধিকার দেওয়ার পাশাপাশি সুনির্দিষ্ট পারফরম্যান্স নির্দেশকের মাধ্যমে মাঠপর্যায়ের প্রকৌশলী ও কর্মীদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশ বাঁচিয়ে সেচ সুবিধা টিকিয়ে রাখতে অতিরিক্ত পানি নির্ভর বোরো ধানের বদলে কৃষকদের গম, ভুট্টা, সরিষা ও ডালের মতো কম পানির ফসলে উদ্বুদ্ধ করা এবং নদী, খাল ও পুকুর পুনঃখনন করে ভূ-উপরিস্থ পানির সেচ ব্যবহার বৃদ্ধির সাথে সাথে কৃত্রিম উপায়ে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পূর্ণ করার বাস্তবভিত্তিক প্রকল্প বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। লেখক : সমাজসেবক ও রাজনীতিক
