নাগরিকদের ওপর কোন কর বৃদ্ধি করা ছাড়াই রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের ১ হাজার ৯ কোটি ৬৬ লক্ষ ৩০ হাজার ৬৬৫ টাকা ৮১ পয়সার প্রস্তাবিত বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে। মঙ্গলবার (৩০ জুন) বিকেলে নগর ভবনের সিটি হল রুমে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে আয় ও ব্যয় সমপরিমাণ ধরে এ বাজেট ঘোষণা করেন রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক মোঃ মাহফুজুর রহমান রিটন।
সংবাদ সম্মেলনে রাসিক প্রশাসক মোঃ মাহফুজুর রহমান রিটন বলেন, রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে নাগরিকদের ওপর কোন নতুন কর বা বিদ্যমান কর বৃদ্ধির প্রস্তাব রাখা হয়নি। নাগরিকদের স্বস্তি বজায় রেখে উন্নয়ন কার্যক্রম ও সেবার মান আরও উন্নত করার লক্ষ্যে এই বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। আগামী দিনে নাগরিক সুযোগ-সুবিধার প্রতি লক্ষ্য রেখে সম্পূর্ণ বাস্তবতার নিরিখে আয়ের সাথে ব্যয়ের সংগতি রেখে বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের বাজেটের এর লক্ষ্যমাত্রা ছিলো ৮০৬ কোটি ৬১ লক্ষ ২১ হাজার ২১১ টাকা ৩৬ পয়সা। সংশোধিত বাজেটে এর আকার ৯৩৪ কোটি ৫২ লক্ষ ৮০ হাজার ৪২৩ টাকা ৪৯ পয়সা দাঁড়িয়েছে। আয় ও ব্যয় সমপরিমাণ ধরে ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১ হাজার ৯ কোটি ৬৬ লক্ষ ৩০ হাজার ৬৬৫ টাকা ৮১ পয়সা।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্যে তিনি তাঁর সময়কালে রাসিকের ছয়টি বিভাগের কার্যক্রম এবং নগরীর উন্নয়ন ও নাগরিকসেবা, চলমান উন্নয়ন কাজ, স্বল্প, মধ্য ও দীর্ষমেয়াদের পরিকল্পনা তুলে ধরেন। সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে মহান স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং তিনবারের সাবেক সফল প্রধানমন্ত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়াকে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করেন রাসিক প্রশাসক। একই সঙ্গে তিনি ভাষা আন্দোলন, মহান মুক্তিযুদ্ধসহ গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সকল শহীদদের প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা এবং তাঁদের রুহের শান্তি কামনা করেন।
সংবাদ সম্মেলনে রাসিক প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটন বলেন, আমাকে নগরবাসীর সেবা করার সুযোগ প্রদান করায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ও অশেষ ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছি। প্রধানমন্ত্রীর আস্থা ও দিকনির্দেশনায় রাজশাহী মহানগরীর উন্নয়ন, নাগরিক সেবার মানোন্নয়ন এবং একটি পরিচ্ছন্ন, আধুনিক, সবুজ, স্বাস্থ্যকর, নিরাপদ, বাসযোগ্য ও শান্তির নগরী গড়ে তোলার লক্ষ্যে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি। ১৬ মার্চ ২০২৬ তারিখে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই নগরবাসীর প্রত্যাশা পূরণ, জনদুর্ভোগ লাঘব, পরিবেশ সংরক্ষণ, আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণ এবং নাগরিক সেবাকে আরও সহজ ও গতিশীল করতে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন অঙ্গীকারবদ্ধ। নাগরিকদের কল্যাণই আমাদের সকল কার্যক্রমের মূল লক্ষ্য ও প্রেরণা। রাজশাহীকে একটি পরিচ্ছন্ন, আধুনিক, সবুজ, স্বাস্থ্যকর, নিরাপদ বাসযোগ্য ও শান্তির মডেল নগরীতে রূপান্তরের লক্ষ্যে আমরা বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মসূচি গ্রহণ করে সড়ক, ড্রেনেজ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, আলোকসজ্জা, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা সহায়তা, নগর সৌন্দর্যবর্ধন এবং সবুজায়নে বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, সিটি কর্পোরেশন ও নাগরিকদের সম্মিলিত প্রয়াসে রাজশাহী মহানগরী উন্নয়ন ও নাগরিক সেবার ক্ষেত্রে দেশের অন্যতম মডেল নগরীতে পরিণত হবে। নগরবাসীর প্রত্যাশা পূরণ, জনদুর্ভোগ লাঘব, পরিবেশ সংরক্ষণ, আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণ এবং নাগরিক সেবাকে আরও সহজ ও গতিশীল করতে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন অঙ্গীকারবদ্ধ। নাগরিকদের কল্যাণই আমাদের সকল কার্যক্রমের মূল লক্ষ্য ও প্রেরণা।
স্বাস্থ্য বিভাগের কার্যক্রম সর্ম্পকে সংবাদ সম্মেলনে রাসিক প্রশাসক বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার স্বাস্থ্য খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব প্রদান করেছে। তারই ধারাবাহিকতায় রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে আমি নাগরিক স্বাস্থ্য সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়েছি। আমরা বিশ্বাস করি, একটি সুস্থ ও কর্মক্ষম জাতিই পারে একটি শক্তিশালী নগরী ও সমৃদ্ধ দেশ গড়তে। রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন কর্তৃক পরিচালিত সিটি হাসপাতালের আধুনিকায়ন, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নিয়োগ এবং শ্রমিক ও সিডিসি সদস্যবৃন্দসহ মহানগরীর দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে স্বল্পমূল্যে সেবা প্রদান করা হবে। জরুরি সেবার আওতায় নাগরিক সুবিধার্থে ৪টি অ্যাম্বুলেন্স সেবা চালু করা হবে। মরদেহ পরিবহনে দুইটি ফ্রিজিং অ্যাম্বুলেন্স ক্রয় করা হবে। স্বল্পমূল্যে নাগরিকেরা অ্যাম্বুলেন্স সেবা গ্রহণ করতে পারবেন। মৃত্যু পরবর্তী দাফন ও সৎকারের কার্য সহায়তার জন্য রাসিক কতৃক ইমাম ও পুরোহিত নিয়োগ করা হবে। বাস টার্মিনাল, রেল স্টেশনসহ জনবহুল স্থানে বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা, আধুনিক শৌচাগার ও নামাজ পড়ার স্থান তৈরি করা হবে। রাসিকের নিয়ন্ত্রনাধীণ পার্ক ও বিনোদেন কেন্দ্রে সিনিয়র সিটিজেনদের জন্য ৫০ শতাংশ ছাড়ে প্রবেশের সুযোগ প্রদান করা হবে।
রাজস্ব বিভাগের কার্যক্রম সর্ম্পকে সংবাদ সম্মেলনে রাসিক প্রশাসক বলেন, আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের নিজস্ব তহবিল ও অর্থনৈতিক ভিত্তি মজবুত করার লক্ষ্যে রাজস্ব বিভাগের সাথে বিভিন্ন সময় বৈঠক করেছি। বৈঠকে নাগরিক সেবা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকারি-বেসরকারি হাল ও বকেয়া কর আদায়ের পাশাপাশি আইন অনুযায়ী নতুন আয়ের খাত সৃষ্টি করে রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি প্রয়োজনীয় দিক-নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধাদের হোল্ডিং ট্যাক্স ৯০ শতাংশ মওকুফ করা হয়েছে, হাল ও বকেয়া হোল্ডিং ট্যাক্স, ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন, বকেয়া ও দোকান ভাড়া, অটোরিক্সা, চাজার রিক্সা এবং চালকদের লাইসেন্স ফি সারচার্জ ১লা জুলাই হতে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত উপর ১৫% মওকুফ করা হবে। ছাদবাগান উৎসাহিত করতে ছাদবাগান মালিকের হোল্ডিং ট্যাক্সে ১০% ছাড় প্রদান করা হবে।
পরিচ্ছন্ন বিভাগের বিভিন্ন কার্যক্রম তুলে ধরে ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা সর্ম্পকে রাসিক প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটন বলেন, প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসন ও দিকনির্দেশনা অনুযায়ী রাজশাহীকে একটি পরিচ্ছন্ন, সুন্দর, পরিবেশবান্ধব ও স্বাস্থ্যকর নগরী হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে আমি আমার কর্মপরিকল্পনায় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছি।
আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য ইতিমধ্যে প্রকৌশল বিভাগ হতে প্রকল্প তৈরী করা হয়েছে। যা সরকারের সবুজ পাতায় অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে। এ প্রকল্প চালু হলে বর্জ্য থেকে সার বায়োগ্যাস ও বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে। প্রকল্পের মেয়াদ ৫ বছর ধরা হয়েছে।
ড্রেন পরিস্কারের পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে আমরা দেখেছি, কিছু এলাকায় ১৫-২০ বছর পর্যন্ত ড্রেনের কাদা মাটি অপসারণ করা হয়নি। ফলে ঐ সমস্ত এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয় ও মশার উপদ্রব বাড়ে। সেজন্য নিয়মিত ওয়ার্ড পর্যায়ে ড্রেন পরিস্কার করার কাজ জোরদারকরণ, বড় বড় ড্রেনগুলো বিশেষ কর্মসূচির মাধ্যমে ড্রেনের কাদামাটি উত্তোলন করার উদ্যোগ নিয়েছি। উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে রাজশাহী মহানগরীর সকল প্রাইমারি, সেকেন্ডারি ও টার্শিয়ারি ড্রেনের কাদামাটি উত্তোলন করা হবে। যাতে নগরবাসীর জলাবদ্ধতা সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে পারেন। মশক নিধনে নতুন ফগিং মেশিন ক্রয় করা হবে এবং কীটনাশক ব্যবহার সুনিশ্চিত করা হবে।
সংবাদ সম্মেলনে প্রকৌশল বিভাগের বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রম তুলে ধরেন রাসিক প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটন বলেন, ৩০টি ওয়ার্ডে সড়কের খানাখন্দ মেরামত, গাছ রং, মিডিয়ান, রেলিং মেরামত ও রং করণ এবং পোল রং করাসহ সৌন্দর্য্যবৃদ্ধি, নাগরিক তথ্য সেবাকেন্দ্র চালু, যানজট নিরসনে পাইলটিং করে লক্ষ¥ীপুর-ঝাউতলা সড়কে ডিভাইডার রেলিং স্থাপন, পাবলিক টয়লেট নির্মাণ, বর্ণালীর মোড় হতে হেতেখাঁ বড় মসজিদ পর্যন্ত সড়কের ডব্লিউবিএম, ৬নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর কার্যালয় কাম কমিউনিটি সেন্টার নির্মাণ, নওদাপাড়া কাঁচা বাজার মার্কেট নির্মাণ, ওয়াড পর্যায়ে রাস্তা ড্রেন সহ অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে। রাজশাহী মহানগরীর সমন্বিত নগর অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় নির্মাণাধীন ৫টি ফ্লাইওভারের মধ্যে তিনটি যথাক্রমে হড়গ্রাম, বিলসিমলা ও বন্ধগেট রেলক্রসিং-এ ফ্লাইওভার নির্মাণ কাজ ডিসেম্বর-২০৬ এর মধ্যে সম্পন্ন হবে। অবশিষ্ট দুইটি ফ্লাইওভারের কাজও চলমান রয়েছে। ঐতিহ্য সংরক্ষণে নগর ভবন সংলগ্ন দড়িখরবোনা মোড়ে ঢোপকল স্থাপন হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, বর্তমানে রাসিকের রাজশাহী মহানগরীর সমন্বিত নগর অবকাঠামো উন্নয়ন (১ম সংশোধিত) শীর্ষক প্রকল্প, হযরত শাহ্ মখদুম রূপোশ (র.) দরগাহ শরীফের উন্নয়ন (১ম সংশোধিত) শীর্ষক প্রকল্প এবং লোকাল গর্ভামেন্ট কোভিড -১৯ রেসপন্স এ্যান্ড রিকভারী প্রজেক্ট চলমান রয়েছে। এছাড়া সরকারের সবুজপাতাভূক্ত অনুমোদিত প্রকল্পসমূহ হচ্ছে, রাজশাহী মহানগরীর কুমারপাড়া গুল গফুর পেট্রোল পাম্প হতে সাহেব বাজার বড় মসজিদ, বড়কুঠি, দরগাপাড়া মোড়, বরেন্দ্র যাদুঘর মোড় হয়ে ফায়ার বিগ্রেড মোড় পর্যন্ত সড়ক প্রশস্তকরণ ও উন্নয়ন প্রকল্প, রাজশাহী মহানগরীর প্রাকৃতিক জলাশয় সমূহের সংরক্ষণ ও উন্নয়ন প্রকল্প, রাজশাহী মহানগরীতে উৎপাদিত বর্জ্য নিস্কাশনে ও ব্যবস্থাপনায় নতুন আর্জনা আধারের ভূমি ক্রয় ও কাঠামো নির্মাণ এবং যন্ত্রপাতি ক্রয় প্রকল্প, রাজশাহী মহানগরীর বিভিন্ন ওয়ার্ডে ক্ষতিগ্রস্থ সড়ক ও নর্দমা সমূহের উন্নয়ন এবং “রাজশাহী-নওগাঁ মহাসড়কের আলিফ লাম মীম ভাটা হতে রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জ মহাসড়কের কাশিয়াডাঙ্গা রেলক্রসিং পর্যন্ত ০৪ লেন সংযোগ সড়ক নির্মাণ প্রকল্প। এছাড়া রিজিলিয়েন্ট আরবান এ্যান্ড টেরিটরিয়্যাল ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট অর্থ বরাদ্দ এবং সিটি রিজিওনাল ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট অণুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।-প্রেস বিজ্ঞপ্তি