বিগত সরকারের আমলে একাধিকবার অনুমোদনের জন্য তোলা হলেও শেষ পর্যন্ত বিএনপি সরকারের আমলে এসে অনুমোদন পেল পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প। এই প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রথম পর্যায়ে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৪ হাজার ৩৪৭ কোটি টাকা। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি, পরিবেশ ও অর্থনীতি রক্ষায় এবং শুষ্ক মৌসুমে পানিসঙ্কট দূর করতে বড় অংকের অর্থ ব্যয় করে পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়ছে বলে জানা গেছে। বুধবার (১৩ মে) বাংলাদেশ সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী ও একনেকের চেয়ারপার্সন তারেক রহমানের সভাপতিত্বে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় এ প্রকল্প অনুমোদন করা হয়। বিএনপি সরকার গঠনের পর তৃতীয় একনেক সভায় প্রথম কোনো মেগা প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হল। প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, ২০৩৩ সালের জুনের মধ্যে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করেব বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড। ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি ২৫ লাখ টাকার এ প্রকল্পের পুরো অর্থায়ন হবে সরকারি অর্থে। পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি গত ৬ মে পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পের কারিগরি সমীক্ষা ও সম্ভ্যবতা জরিপের কাজ শেষ হয়ে আসার কথা জানিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, শিগগিরই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। জানা গেছে, ভারতের ফারাক্কা বাঁধের কারণে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশে যে পানির অভাব দেখা দেয় এবং এর ফলে যে শুষ্ক ও লবণাক্ততার সৃষ্টি হয়, তা রোধ করাই এ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য। প্রকল্প প্রস্তাব অনুযায়ী, রাজবাড়ী জেলার পাংশা পয়েন্টে পদ্মা নদীর ওপর একটি ব্যারেজ নির্মাণ করে পানি সংরক্ষণ করা হবে, যা থেকে খাল বা ক্যানেলের মাধ্যমে কৃষিজমিতে পানি সরবরাহ করা যাবে। নদীর নাব্য রক্ষা, লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণ এবং মৎস্যসম্পদ উন্নয়নেও এ প্রকল্প ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে। খুলনা, ঢাকা, রাজশাহী ও বরিশাল বিভাগের ১৯টি জেলা এ প্রকল্পের আওতায় আসবে। হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতী, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতী নদী ব্যবস্থাপনাকে পুনরুজ্জীবিত করার আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে প্রকল্প নথিতে। সুন্দরবনে স্বাদু পানির প্রবাহ নিশ্চিত করা, যশোরের ভবদহসহ জলাবদ্ধতাপ্রবণ এলাকায় পানি নিষ্কাশনের উন্নয়ন এবং ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে। এ প্রকল্পের মূল অংশ পদ্মা ব্যারেজ, যা ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ হবে। সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো হিসেবে ৭৮টি স্পিলওয়ে গেট, ১৮টি আন্ডার স্লুইস, দুটি ফিশ পাস ও নেভিগেশন লক রয়েছে। এ ছাড়া গড়াই অফ-টেক, চন্দনা অফ-টেক ও হিসনা অফ-টেক অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে এই মেগা প্রকল্পে। একই সঙ্গে ১১৩ মেগাওয়াটের জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনাও দেখানো হয়েছে। এর মধ্যে মূল ব্যারাজ থেকে ৭৬ দশমিক ৪ মেগাওয়াট এবং গড়াই অফ-টেক থেকে ৩৬ দশমিক ৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে হাইড্রো পাওয়ার প্ল্যান্ট নির্মাণের কথা রয়েছে। প্রকল্পের আওতায় গড়াই-মধুমতী নদীতে ১৩৫ দশমিক ৬০ কিলোমিটার ড্রেজিং এবং হিসনা নদী ব্যবস্থাপনায় ২৪৬ দশমিক ৪৬ কিলোমিটার পুনঃখনন কাজ করা হবে। এ ছাড়া ১৮০ কিলোমিটার এফ্লাক্স বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে। এ প্রকল্পের পরিবেশগত প্রভাব, আন্তঃদেশীয় নদী ব্যবস্থাপনা, বিশেষ করে ভারতের সঙ্গে পানি বণ্টন নিয়ে বিভিন্ন ইস্যু রয়েছে। এর আগে প্রকল্পটি কয়েক দফা একনেক সভায় উপস্থাপন করা হয়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় প্রকল্পটি একনেক সভায় উপস্থাপন করা হলেও অনুমোদিত হয়নি।
এদিকে একনেক ৩৬ হাজার ৬৯৫ কোটি ৭২ লাখ টাকা ব্যয়ে ৯টি প্রকল্প অনুমোদন করেছে। এর মধ্যে ৩৬ হাজার ৪৯০ কোটি ৯৩ লাখ টাকা সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে এবং বাকি ২০৪ কোটি ৭৯ লাখ টাকা সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন। বুধবার প্রধানমন্ত্রী এবং একনেক চেয়ারপারসন তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত একনেক সভায় এ প্রকল্পগুলো অনুমোদন দেওয়া হয়। অনুমোদন পাওয়া প্রকল্পগুলোর মধ্যে নতুন ৩টি ও সংশোধিত প্রকল্প ৫টি। এ ছাড়া একটি প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়েছে। একনেক সভায় অর্থ এবং পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ, কৃষি ও মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ, শিল্প, বস্ত্র ও পাট এবং বাণিজ্য মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মোঃ সাখাওয়াত হোসেন, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকিসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তারা অংশগ্রহণ করেন। সভায় অনুমোদিত ৯ প্রকল্পের মধ্যে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দুইটি, চট্টগ্রাম মুসলিম ইনস্টিটিউট সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স স্থাপন (২য় সংশোধন) প্রকল্প ও গণগ্রন্থাগার অধিদফতরের বহুতল ভবন নির্মাণ (২য় সংশোধন) প্রকল্প। স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জেলা শহরে বিদ্যমান মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রকে ৩০ শয্যা বিশিষ্ট মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রে উন্নীতকরণ-পুনর্র্নিমাণ (প্রথম ফেইজ) প্রকল্প, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের হাই-টেক সিটি-২ এর সহায়ক অবকাঠামো নির্মাণ (৩য় সংশোধন) প্রকল্প, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সরকারি শিশু পরিবার এবং ছোটমনি নিবাস নির্মাণ বা পুনঃনির্মাণ (২য় সংশোধন) প্রকল্প, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাভার সেনানিবাসে সৈনিকদের আবাসন সমস্যা নিরসনে ৪ ী এসএম ব্যারাক কমপ্লেক্স নির্মাণ প্রকল্প, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের চট্টগ্রাম সিটি আউটার রিং রোড (পতেঙ্গা হতে সাগরিকা) (৫ম সংশোধিত) প্রকল্প, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প (১) পদ্মা ব্যারেজ (১ম পর্যায়) প্রকল্প, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের ময়মনসিংহ কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎ কেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহের জন্য ধনুয়া হতে ময়মনসিংহ পর্যন্ত গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণ প্রকল্প (১ম সংশোধন) অনুমোদন করা হয়েছে। সভায় পরিকল্পনা মন্ত্রী কর্তৃক ইতোমধ্যে অনুমোদিত ৫০ কোটি টাকার কম ব্যয় সম্বলিত দুই প্রকল্প সর্ম্পকে একনেক সভায় অবহিত করা হয়। সেগুলো হলো- ময়মনসিংহ জিলা স্কুল, ময়মনসিংহয়ের অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প ও বিমান বাহিনী ঘাঁটি কুর্মিটোলায় বিমানসেনা ব্যারাক কমপ্লেক্স নির্মাণ প্রকল্প।-এফএনএস