স্টাফ রিপোর্টার : নানা জল্পনা কল্পনা, কথাচালাচালি আর স্থানীয় রাজনীতির প্লাটফর্ম ঘিরে আশা-আকাঙ্খার সমাপ্তি ঘটে গত ১৪ মার্চ। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের জারি করা প্রজ্ঞাপনের মধ্য দিয়ে ঐদিন রাজশাহী সিটি করপোরেশন’র (রাসিক) প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হয় রাজশাহী মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুর রহমান রিটনকে। এরই মধ্যে শহরজুড়ে বলতে বা মন্তব্য করতে শোনা যাচ্ছে রাসিক প্রশাসকের সামনে অপেক্ষা করছে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। তিনি কী এতোসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে তাঁর যোগ্যতা প্রমান করতে পারবেন?
পাহাড়সম বকেয়া বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ, সিটি হাটের প্রশ্নবিদ্ধ টেন্ডার, শহীদ জিয়া শিশু পার্কের পরিচালনা নিয়ে উত্থাপিত অভিযোগ, টেন্ডার প্রক্রিয়া নিয়ে নানা অনিয়ম, ঠিকাদারদের বকেয়া বিল, রাজস্ব আদায়ে ধীরগতি, বছর ধরে মুখথুবড়ে পড়ে থাকা ফ্লাইওভার, বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা নিরসন ব্যবস্থার উন্নয়ন, মশক নিধন, বৃক্ষরোপন, পুকুর ও জলাশয় নিধন রোধ, নানামূখী অনিয়ম ও দুর্নীতি রোধসহ নাগরিক পরিষেবা নিশ্চিতকরনের মতো অসংখ্য চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে নতুন রাসিক প্রশাসকের সামনে।
নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই পিএলসি’র (নেসকো) কাছে প্রায় ৪২ কোটি টাকার বকেয়া বিদ্যুৎ বিলের দায়ভার মাথায় রয়েছে রাসিক কর্তৃপক্ষের। ২০২৪ সালের অক্টোবর-নভেম্বর মাস থেকে অল্প অল্প করে বকেয়া বিল পরিশোধের উদ্যোগ নিয়েছিলেন তৎকালিন রাসিক প্রশাসক। গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ের প্রথম প্রশাসক ড. দেওয়ান মুহাম্মদ হুমায়ূন কবীর দায়িত্ব নেয়ার পর এবিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, আগস্ট’২০২৪ পূর্ববর্তী রাসিক কর্তৃপক্ষের অনিহা আর উদাসীনতার কারণে নেসকোর কাছে রাসিকের বিদ্যুৎ বিল বকেয়া ছিল প্রায় ৪২ কোটি টাকার মতো। ২০২৪ সালের অক্টোবর-নভেম্বর মাস থেকে অল্প অল্প করে বকেয়া বিল পরিশোধের উদ্যোগ নিয়েছিল রাসিক কর্তৃপক্ষ। রাসিকের তৎকালিন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. এ.বি.এম শরীফ উদ্দিন গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, ‘প্রতিমাসের বকেয়া ক্রমে পুঞ্জিভূত হতে হতে একটা বিরাট অঙ্কে এসে দাঁড়িয়েছে। এক সাথে এতোগুলো টাকা দেয়ার সামর্থ্য করপোরেশনের নেই। সে কারণে বকেয়া বিদ্যুৎ বিল থেকে প্রতি মাসে ৫০ লাখ টাকা করে দিতে থাকবো।’ জানতে চাইলে রাসিকের নির্বাহী প্রকৌশলী (বিদ্যুৎ) এ.বি.এম আসাদুজ্জামান সুইট পত্রিকার প্রতিনিধিকে বলেন, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার অনুমতি ব্যতীত আমি কিছু বলতে পারবোনা। সিইও রেজাউল করিম বিষয়টি নিয়ে আপনার সাথেই কথা বলতে বলেছেন বলে অবগত করলে তিনি নানাবিধ যুক্তি ও টালবাহানা করে কিছুটা অস্পষ্টভাবে জানান, প্রতিমাসের বিদ্যুৎ বিলের সাথে কিছু কিছু করে বকেয়া বিল পরিশোধ করছে রাসিক কর্তৃপক্ষ। ৪২ কোটির মধ্যে এপর্যন্ত নেসকোর অনুকূলে মোট কত টাকার বকেয়া বিল পরিশোধ করা হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রকৃত বকেয়া হলো ২৮ কোটি টাকা। বছরের পর বছর ধরে বিদ্যুৎবিল বকেয়া পরে থাকার কারনে বিলম্ব মাশুল, জরিমানাসহ অন্যান্য আর্থিক কর্তনের বিষয়াবলী চক্রবৃদ্ধি হারে বেড়ে গিয়ে ৪২ কোটিতে দাড়িয়েছে। এই কাজটিতো কয়েক বছরে হয়নি। বিগত প্রায় ত্রিশবছরের মতো লম্বা সময় ধরে বকেয়ার এই দীর্ঘ মার্জিন সৃষ্টি হয়েছে। সর্বোচ্চ ৫০ লাখকে মার্জিন লেভেল ধরে প্রতিমাসের রানিং (চলমান) বিল পরিশোধ করার পর যে কয়েক লাখ টাকা বেচে যায়, সেটা দিয়েই ধীরে ধীরে বকেয়া পরিশোধ করা হচ্ছে। প্রতিমাসে গড়ে বিল আসে ৪২ থেকে ৪৫ লাখের মতো। সেহিসেবে, কোন মাসে তিন লাখ, কোন মাসে চার-পাঁচ, আবার কখনোবা সাত লাখ করেও নেসকোর বকেয়া পরিশোধ করা হয়েছে। এপর্যন্ত মোট কত টাকা বকেয়া পরিশোধ করা হয়েছে এবং একসাথে এই বকেয়া বিল পরিশোধের কোন উদ্যোগ কর্তৃপক্ষ নেবে কিনা জানতে চাইলে, তিনি কিছুটা বিব্রতবোধ কন্ঠে বলেন, সেটা আমি বলতে পারবোনা। অফ দ্যা রেকর্ডে জানতে চাইলেও তিনি সদুত্তোর না দিয়ে বলেন, রাসিক যদি কোন বড় অংকের “থোক বরাদ্দ” পান তাহলে হয়তো সেখান থেকে সেটা পরিশোধ করা সম্ভব। বকেয়া বিল পরিশোধের উদ্যোগ নেয়ার প্রায় ১৬ মাস পরে কত টাকা পরিশোধ হয়েছে জানতে চাইলে রাসিকের বাজেট কাম হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম খান যথাযথ কোন উত্তর না দিয়ে বলেন, এবিষয়ে ঊর্দ্ধতন কর্মকর্তারা ভাল বলতে পারবেন। তবে প্রতিমাসের রানিং বিদ্যুৎ বিল নিয়মিতভাবেই পরিশোধ করা হচ্ছে বলে জানান মি.খান।
সমন্বিত নগর অবকাঠামো উন্নয়নের আওতায় চলমান বিভিন্ন কাজের বিপরীতে ঠিকাদারদের আছে বকেয় বিলের হিসেব-নিকেশ। শহরে নির্মাণাধীন ফ্লাইওভারগুলো প্রায় বছর ধরে পরে আছে অসমাপ্ত অবকাঠামো নিয়ে। যেগুলোর কারণে নগরবাসির ভোগান্তি এখন চরমে। চলমান মেগা প্রকল্প ও অন্যান্য অবকাঠামোগত উন্নয়নমূলক কাজের বিপরীতে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানগুলো বিল না পাবার কারনে কাজ বন্ধ রেখে নেমেছিলেন রাস্তায়। বিল প্রাপ্তির দাবিতে হয়েছে একাধিক মানববন্ধন ও হট্টগোল। হয়েছে সংবাদ সম্মেলনও। কেউ পেয়েছেন; কেউ পাননি। আবার কেউ পেয়েছেন যতসামান্য। রাসিকের কিছু কিছু প্রকল্পে আগে কাজ দেয়া হয়েছে, পরে হয়েছে টেন্ডার পক্রিায়ার কাজ; এমনও অভিযোগ ছিল সাবেক এক প্রশাসকের পক্ষ থেকে। সদ্য আরো একটি অনিয়মের সাথে নাম জুড়ে যায় রাসিকের। প্রায় ১৪ কোটি (ভ্যাট-ট্যাক্স ও অন্যান্য আনুসঙ্গিক চার্জসহ) টাকার হাট মাত্র সাত কোটি টাকায় ইজারা দেবার কারণে রাজস্বে খেয়েছে রড় একটি থাক্কা। বিষয়টি নিয়েও বিস্তৃত পরিসরে নানামূখী সমালোচনার মুখে পড়েছে রাসিক কর্তৃপক্ষ। নতুন প্রশাসক যোগদানের মাত্র কয়েকদিন আগে উত্থাপিত হয়েছে আরো একটি গুরুত্বর অভিযোগ। প্রায় দুই কোটি টাকার বিনিময়ে টেন্ডার দেয়া শহীদ জিয়া শিশু পার্ক পরিচালনার বিষয়টি নিয়েও উঠেছে অভিযোগ। চলবে…