রাজশাহীতে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তৈরি হচ্ছে নিম্নমানের সেমাই, কর্তৃপক্ষের নজর ঢিলেঢালা

Paris
Update : রবিবার, ১৫ মার্চ, ২০২৬

শাহানুর রহমান রানা : ঈদকে সামনে রেখে নগরীর বিসিক এলাকাসহ নগরীর বিভিন্ন স্থানে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে নিম্নমানের সেমাই তৈরির কর্মযজ্ঞ। বেশকিছু কারখানা ঘুরে দেখাগেছে, তাদের প্রত্যেকেরই রয়েছে ’বিএসটিআই’ (বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস এন্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন) থেকে অনুমোদনপত্র। রয়েছে ট্রেডলাইসেন্স নবায়নও। তবে কিছু কিছু প্রতিষ্ঠানের নেই লাইলেন্স নবায়নের কাগজপত্র। প্রত্যেকেই তাদের উৎপাদিত সেমাই মোড়কজাত করছেন বিএসটিআই’র নিয়মানুযায়ী। প্যাকেটের গায়ে থাকছে উৎপাদন ও মেয়াদ উর্ত্তীণের তারিখ, রয়েছে নেট ওজন-দাম ও ঠিকানা। আছে বিএসটিআই’র সীল (মানসনদ)। কাগজে কলমের হিসেবানুযায়ী বেশকিছু বিষয় ঠিক থাকলেও উৎপাদিত ও প্যাকেটজাতকৃত পণ্যের মান ও স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে আছে নগরবাসির অনেক প্রশ্ন। এছাড়াও আছে কারখানার ভেতরে ও উৎপাদন স্থানসহ শ্রমিকদের অপরিচ্ছন্নতার বিষয়গুলো নিয়ে নানা প্রশ্ন। সরেজমিন ঘুরে সেই বিষয়টির সত্যতাও মেলে একাধিক কারখানায়।
রাজশাহী মহানগরীর বিসিক এলাকায় ভেজালবিরোধী অভিযান তুলনামূলক কম হবার কারণে অধিক মুনাফার আশায় অসাধু বেকারী মালিকরা নিম্নমানের ময়দা, পামতেল ও পোড়া তেল ব্যবহার করে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তৈরি করছে সেমাই। ঈদকে সামনে রেখে সেই উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে কয়েকগুণ। নাম প্রকাশ না করার শর্তে সৈয়দপুর থেকে আসা কয়েকজন বিহারী শ্রমিক জানান, ঈদের মার্কেট ধরার জন্য কারখানা মালিকরা তাদেরকে চুক্তিভিত্তিক এখানে এনেছেন। রাজশাহীর বিসিক এলাকার বিভিন্ন বেকারী কারখানায় প্রায় প্রতি ঈদেই অন্যত্র জেলা থেকে এভাবে চুক্তিভিত্তিক শ্রমিক আনা হয় সেমাই তৈরির জন্য।
নিয়মানুযায়ী সেমাই তৈরির কারখানায় পর্যাপ্ত আলো-বাতাস, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, মানসম্মত কাঁচামাল এবং শ্রমিকদের অ্যাপ্রোন, হেডকভার ও গ্লাভস ব্যবহার বাধ্যতামূলক। অথচ অধিকাংশ কারখানায় এসবের বালাই নেই। ঘামভেজা আর নোংড়া ও অপরিচ্ছন্ন শরীরেই শ্রমিকদের কাজ করতে দেখা যায়। বিসিকের বিভিন্ন কারখানায় গিয়ে দেখাগেছে অপরিচ্ছন্ন ও উন্মুক্ত হাতে ছয়-সাতজন শ্রমিক বিভিন্ন সেক্টরে ভাগ হয়ে সেমাই তৈরির কাজে রয়েছেন ব্যস্ত। কোথাও চলছে ময়দা ও পানির মিশ্রণে খামির তৈরির কাজ; কেউবা তৈরিকৃত খামিরগুলো গোলাকৃতি করে রেখেছেন একটি নোংড়া ট্রেতে। অন্যএকজন সেই খামিরগুলোতে লাগানো হচ্ছে ডালডা। কোন কোন কারখানায় মেশিনের সাহায্যে; আবার কোথাওবা হাত দিয়ে টেনে টেনে খামিরগুলোকে দেয়া হচ্ছে সরু সুতার আকৃতি। এরপর নির্দিষ্ট ফ্লেভার মিশিয়ে তেল-ডালডায় লালচে করে ভেজে শুকাতে দিচ্ছেন। অপরিস্কার ও ময়লাযুক্ত তেলে দেদাড়ছে ভাজা হচ্ছে সেমাইগুলো। ছোট ও মাঝারি আকৃতির উন্মুক্ত ‘টিন ক্যান’ (তেলের টিন বা অয়েল টিন)-এ রাখা তেলের ওপর ভাসছে ময়লা। সেমাই ভাজার পর পোড়া তেলগুলো পাশ্ববর্তী কোন একটি তেলের টিনে ও জারকিনে সংরক্ষিত করে রাখা হয়েছে পরবর্তীতে সেমাই ভাজার জন্য। ময়দার খামির রাখার মাঝারি আকৃতির ট্রেগুলো ময়লায় পরিপূর্ণ। কোন কোন খামিরে সেই ময়লা লেগে থাকলেও অধিকশ্রম ও ব্যয় কমাতে সেগুলো পরিস্কার করা বা ফেঁলে দেয়া হচ্ছেনা। ময়লাযুক্ত খামির দিয়েই পরবর্তী ধাপ অতিক্রম করছে সরু সুতা আকৃতির মধ্য দিয়ে। সেমাই তৈরির কারখানার অপরিচ্ছন্নতা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে সেমাই তৈরির ছবি তুলতে গেলে কয়েকজন শ্রমিক বলে উঠেন, ‘ভাই এগুলো কি ফেসবুকে ভাইরাল করবেন’; তাহলে আমাদের ছবি নিয়েন না। গণমাধ্যমকর্মী পরিচয় দেয়া মাত্রই দুজন কর্মচারি বলে ওঠেন। পাশের কারখানায় আমাদের মালিক আছেন। ওনার সাথে গিয়ে দেখা করেন। অন্যদের মতো আপনি পাবেন! কি পাবো, সেটা জানতে চাইলে আর কিছু না বলে কাজে মনোনিবেশ দেন তারা। এভাবেই চলছে রাজশাহী নগরীতে সেমাই তৈরির মহোৎসব।
জানতে চাইলে ‘বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস এন্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই)’র বিভাগীয় কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক (মেট) আজিজুল হাকিম বলেন, রাজশাহীতে মোট ১৬ টি প্রতিষ্টানকে সেমাই তৈরির অনুমতি দেয়া হয়েছে। প্রথম রোজা থেকে ২২ রমজান পর্যন্ত মোট ৯ টি প্রতিষ্ঠানকে (ফুড আইটেম) ভ্রাম্যমান আদালত কর্তৃক জরিমানা করা হয়েছে ১ লাখ ৩৫ হাজার টাকা। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতের সার্থে এই অভিযান অব্যাহত থাকবে।
সংশ্লিষ্ট র্কর্তৃপক্ষের নজর ও ঢিলেঢালা অভিযানের কারনেই এই ধরনের মানহীন ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে সেমাই উৎপাদন করার সুযোগ পাচ্ছে অসাধু ব্যবসায়ীরা বলে মন্তব্য সচেতন ব্যক্তিদের।


আরোও অন্যান্য খবর
Paris