আফজাল হোসেন
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের বিভিন্ন স্থানে বৃদ্ধি পেয়েছে দুর্বৃত্তদের হামলা-অগ্নিসংযোগ। সড়ক পথের পর এবার দুর্ধর্ষ প্রকৃতির নাশকতা ছড়িয়ে পড়েছে ‘নিরপদ ভ্রমণ’ নামে পরিচিত রেলপথেও। রাজনৈতিক সহিংসতার কারণে দুর্বৃত্তরা গ্যাসকাটার দিয়ে লাইন কেটে, রেললাইনের ফিসপ্লেট ক্লিপ খুলে ফেলে, লাইন উপড়ে ফেলে, ট্রেনের বগিতে আগুণ লাগিয়ে দুর্ধর্ষ মাত্রার ভয়ঙ্কর নাশকতা চালাচ্ছে। নির্বাচন বিরোধীদের ডাকা হরতাল-অবরোধে দেশের বিভিন্ন স্থানে রেলপথে নাশকতার ফলে বেশ কয়েকটি বড় দুর্ঘটনার পাশাপাশি প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। এতে অনেক যাত্রী হতাহত হওয়ার পাশাপাশি নষ্ট হয়েছে যাত্রীদের মালামাল ও রেলের সম্পদ। এর প্রেক্ষিতে নাশকতা এড়াতে পশ্চিমাঞ্চল রেলের নিরাপত্তা কঠোরভাবে জোরদার করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
যাত্রীদের নিরাপত্তা বৃদ্ধিসহ দেশের রেলসম্পদ রক্ষার্থে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়েতে কী ধরণের নিরাপত্তামূলক কর্মকান্ড হাতে নিয়েছে সে বিষয়ে জানতে চাইলে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের প্রধান প্রকৌশলী আসাদুল হক, দৈনিক আমাদের রাজশাহীকে জানান, সম্প্রতি বিভিন্ন এলাকায় রেললাইন কেটে নাশকতা ও ট্রেনের বগিতে আগুণ সন্ত্রাসের কারণে বিষয়টি নিয়ে আমরা খুব উদ্বিগ্ন। রাতের ট্রেনগুলো নিয়ে শঙ্কা একটু বেশি। তিনি বলেন, নিরাপদ ট্রেন পরিচালনা ও নাশকতা এড়াতে নতুন পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। তারই ধারাবাহিকতায় পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। এরমধ্যে অন্যতম হলো, রেললাইনে ‘ট্রলি রান বা অ্যাডভান্স পাইলট (ট্রেনের আগে আরো একটি ইঞ্জিন পাঠানো) ব্যবস্থা চালুকরণ, রেললাইন রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা ওয়েম্যান কর্তৃক ট্র্যাক পেট্রোলিংয়ের ব্যবস্থা, প্রতি কোচে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একজন করে সদস্য রাখার ব্যবস্থা করাসহ রেলওয়ে স্টেশন ও বিভিন্ন স্থাপনার সিসি ক্যামেরাগুলো নিরাপত্তার অংশ হিসেবে কাজ করছে। প্রধান প্রকৌশলী আসাদুল হক আরো জানান, সারাদেশে ২৯০০ কিলোমিটারের মতো রেললাইন আছে। এরমধ্যে পশ্চিমাঞ্চলে রয়েছে প্রায় ১৪২৭ কিলোমিটার। প্রত্যন্ত অঞ্চল এবং নদী, খাল, বিলের পাশ ও উপর দিয়ে রেললাইন গেছে। পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে পুরো রেলপথ এলাকায় পাহারাদার বসানোর পাশাপাশি সামর্থ্য অনুযায়ী ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় সার্বক্ষণিক পাহারা এবং ‘অ্যান্ডভান্স পাইলট সিস্টেম’ চালু করা হয়েছে। রেল লাইন পাহারা দিচ্ছে নিজস্ব নিরাপত্তাবাহিনী, আনসার বাহিনীসহ রেলেন প্রকৌশল বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীগণ। রেললাইন ঠিক আছে কী না তা যাচাইয়ের জন্য সংকেত দিয়ে টহল ট্রলি ব্যবহার করা হচ্ছে। এছাড়া তিনি নিজেও তদারকির পাশপাশি বিভন্নি এলাকায় বিশেষ ব্যবস্থায় এবং ট্রেনযোগে পৌঁছে যাচ্ছেন। তিনি বলেন পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়েতে কঠোরভাবে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।
জানতে চাইলে, পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক অসীম কুমার তালুকদার বলেন, রেললাইন নিরাপদ রাখতে ওয়েম্যানদের পাশাপাশি প্রয়োজন সাপেক্ষে তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশের সহায়তার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এছাড়া সিসি ক্যামেরা দিয়ে নজরদারি করা হচ্ছে। রেলের নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করতে সরকার ২৭০০ আনসার দিয়েছে। যাত্রীদের জানমালের নিরাপত্তায় প্রতিটি কোচে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একজন করে সদস্য রাখার ব্যবস্থাও নেয়া হয়েছে। নতুন নিয়মানুযায়ী রাত ১১টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত চলাচলরত ট্রেনগুলো নিয়ন্ত্রিত গতিতে (ঘণ্টায় ৪০-৫০ কিলোমিটার) চালানোর কোন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি জানান, এটা প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।
এ বিষয়ে প্রকৌশল শাখার উর্দ্ধতন উপ-সহকারী প্রকৌশলী(পথ) ভবেশ চন্দ্র রাজবংশী জানান, রেললাইন কেটে বা ফিসপ্লেট খুলে ফেলে নাশকতাকারিরা যেনো ট্রেনকে দূর্ঘটনাকবলিত করতে না পারে যেন জন্য নিয়মিতভাবে পুশ ট্রলি দিয়ে আমরা রেললাইনগুলো পর্যবেক্ষণ করছি। এই ট্রলি নিয়ে আমি পরিদর্শণে বের হই। রাজশাহীতে ফেরত আসি সন্ধ্যা নাগাদ। শীতের মধ্যে এই পুশ ট্রলি নিয়ে রেললাইন পরিদর্শণ করাটা খুব কষ্টের, চ্যালেঞ্জিংতো বটেই। তবুও যাত্রীদের নিরাপত্তা বৃদ্ধি কল্পে এটা রেলওয়ের দায়িত্ব আর আমাদের কর্তব্য।
উল্লেখ্য, সর্বশেষ মঙ্গলবার (১৯ ডিসেম্বর) ভোরে মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেস ট্রেনে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে আগুন দেওয়ার ঘটনায় ট্রেনের একটি বগি থেকে ৪ জনের লাশ উদ্ধার করে ফায়ার সার্ভিস। তেজগাঁওয়ে ট্রেনে আগুনের ঘটনাকে নাশকতামূলক কাজ বলে প্রাথমিকভাবে জানিয়েছে পিবিআই। পিবিআই পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘প্রাথমিক তদন্ত প্রমাণ করে যে এটি একটি নাশকতামূলক কাজ।’ এদিকে গত ১৩ ডিসেম্বর রাতে ভাওয়াল গাজীপুর ও রাজেন্দ্রপুর রেলওয়ে স্টেশনের মধ্যবর্তী বনখড়িয়া এলাকায় রেললাইন কেটে ফেলে দুর্বৃত্তরা। যার কারণে মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেসের ইঞ্জিনসহ সাতটি বগি লাইনচ্যুত হয়। মৃত্যুবরণসহ আহত হন ১৪-১৫ জন যাত্রী। একইরাতে নীলফামারীর ডোমারে রেললাইনের ফিসপ্লেট ক্লিপ খুলে ফেলে দুর্বৃত্তরা। গত ১৫ ডিসেম্বর রাতে জয়পুরহাটে রাজশাহী থেকে ছেড়ে যাওয়া পার্বতীপুরগামী উত্তরা এক্সপ্রেস মেইল ট্রেনের একটি বগিতে আগুনের ঘটনা ঘটে। এছাড়াও ঈশ্বরদীতে সিরাজগঞ্জ এক্সপ্রেসের তিনটি বগি পুড়িয়ে দেওয়া হয়। রাজনৈতিক সহিংসতার কারণে ময়মনসিংহের গৌরিপুরে রেললাইন উপড়ে ফেলায় হাওর এক্সপ্রেসের সাতটি বগি লাইনচ্যুত হয়ে অন্তত ৫০ যাত্রী আহত হয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায় তিনটি স্থানে ২ কিলোমিটার রেললাইন উপড়ে ফেলার মতো ঘটনাও ঘটে।