শাহানুর রহমান রানা
রাজশাহী আদালতে সংকট দেয়া দিয়েছে স্ট্যাম্প, কার্টিজ পেপার, কোর্ট ফি ও ফলিও। সরবরাহ নেই বহুদিন ধরে। আদালত সংশ্লিষ্টরা জানান, এতে করে একদিকে ব্যাহত হচ্ছে নিয়মিত কার্যক্রম। আর অন্যদিকে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন বিচার প্রার্থীরা। আদালতে মামলা থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের আবেদন, আদেশ এবং রায়ের অনুলিপি সংগ্রহের জন্য সরকারকে নির্ধারিত ফি দিতে হয়। আদালতে এটি ‘কোর্ট ফি’ নামে পরিচিত। অন্যদিকে জমি কেনাবেচা বা হস্তান্তর করতে রেজিস্ট্রেশনের জন্য প্রয়োজন হয় বিভিন্ন দামের রেভিনিউ-জুডিসিয়াল স্ট্যাম্প। তাই রাজশাহীর আদালতগুলোতে মামলার পাশাপাশি জমি রেজিস্ট্রিসহ নানান ক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছে। সংকটের কারণে বিচারপ্রার্থীদের বাধ্য হয়ে কয়েকগুণ বেশি দামে ভেন্ডারদের কাছ থেকে এসব কিনতে হচ্ছে। ফলে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। ভেন্ডারদের অভিযোগ, ট্রেজারিতে স্ট্যাম্প, কার্টিজ পেপার, কোর্ট ফি ও ফলিও’র চরম সংকট থাকায় ট্রেজারি শাখা থেকে চাহিদা মতো স্ট্যাম্প, কার্টিজ পেপার, কোর্ট ফি ও ফলিওর সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে না। এই সংকটের কারণে নকল স্ট্যাম্প ও কোর্ট ফি বিক্রেতারা অসুদপায় অবলম্বনে নিজেদের পকেট ভারি করার সুযোগও পাচ্ছেন বলে মন্তব্য সংশ্লিষ্টদের। যদিওবা নকল স্ট্যাম্প ও কোর্ট ফি সনাক্তকরণের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সভায় সুপ্রিম কোর্ট, ডাক বিভাগ, সিকিউরিটি প্রিন্টিং কর্পোরেশন বাংলাদেশ লিমিটেড (এসপিসিবিএল), ডিপার্টমেন্ট অব কারেন্সি ম্যানেজমেন্ট ও পেমেন্ট সিস্টেম ডিপার্টমেন্ট ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সমন্বয়ে কিছু স্বল্প মেয়াদী ও কিছু দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছিল। তারই ধারাবাহিকতায় ডিভাইস ব্যবহার করে নকল স্ট্যাম্প ও কোর্ট ফি সনাক্তকরণের জন্য সুপ্রিম কোর্ট অধস্তন আদালতের বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা এবং জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও সম্পাদকদেরকে প্রশিক্ষণ দেয় এবং অধস্তন আদালতে ডিভাইস বিতরণ করে।
আদলত সংশ্লিষ্টরা জানান, অধস্তন আদালতে প্রতি কার্যদিবসে বিচারপ্রার্থী জনগণের পক্ষে মামলা দায়েরসহ অন্যান্য দরখাস্ত দাখিলের সময় জুডিশিয়াল ও নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প ও কোর্ট ফি সংযুক্ত করতে হয়। আদালতে দাখিলকৃত স্ট্যাম্প ও কোর্ট ফি’র মাধ্যমে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব পেয়ে থাকে। জুডিসিয়াল ও নন-জুডিসিয়াল স্ট্যাম্প জালিয়াতির কারণে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হতে বঞ্চিত হচ্ছিল।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাজশাহী এডভোকেট বার এসোসিয়েশনের সভাপতি সিনিয়র আইনজীবি ইব্রাহিম হোসেন সংকটের কথাটি স্বীকার করে বলেন, সংকট নিরসনের জন্য আমরা সংশ্লিষ্ট উর্দ্ধতন কর্মকর্তাদেরকে অবগত করেছি। এদিকে, রাজশাহী আদালতের সিনিয়র আইনজীবি মোশারফ হোসেন বুলবুল বলেন, বিগত প্রায় ছয়মাস ধরে রাজশাহীর আদলাতজুড়ে স্ট্যাম্প ও কোর্ট ফি’র চরম সংকট বিরাজ করছে। এগুলো নাটোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে অতিরিক্ত মূল্য দিয়ে সংগ্রহ করতে হচ্ছে। এই সংকটের কারণে রাজশাহী আদালত এলাকায় আইনি ও বিচারকার্যে সংশ্লিষ্টরা সহ বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি বেড়েছে। তিনি আরো বলেন একশ টাকার একটি নন-জুডিসিয়াল স্ট্যাম্প বাইরে থেকে সংগ্রহ করতে হচ্ছে ১৩০ থেকে ১৫০ টাকায়। বিশ টাকার ‘কোর্ট ফি’ সংগ্রহ করতে হচ্ছে ২৫ থেকে ২৮ টাকায়। এতে করে বিড়ম্বনা বৃদ্ধির পাশাপাশি খরচ হচ্ছে অতিরিক্ত অর্থ।
এদিকে, সিনিয়র আইনজীবি মনিরুজ্জামান মনিরসহ আরো বেশ কয়েকজন সংকটের বিষয়ে বলেন, শুনেছি দেশের অনেক আদালতেই কোর্ট ফি, স্ট্যাম্পের সংকট দেখা দিয়েছে। আগের মতো সরবরাহ আসছে না। অনেকদিন ধরে বিভিন্নমূল্যে ‘কোর্ট ফি’ সংকট নেমে এসেছে রাজশাহীর আদলত প্রাঙ্গনেও। আইনজীবিদের সাথে থাকা মোহরীরা হিমশিম খাচ্ছে এগুলো সংগ্রহ করতে। ভেন্ডারদের কাছ থেকে বেশিমূল্যে এগুলো কিনতে হচ্ছে বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তির কথা চিন্তা করে। নামপ্রকাশ না করার শর্তে বেশ কয়েকজন আইনজীবি মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, সংকটের এই সুযোগকে কাজ লাগিয়ে নকল কোর্ট ফি, স্ট্যাম্প বিক্রির অপচেষ্টা করতে পারে অসাধু ব্যবসায়িরা। তাই সংশ্লিষ্ট প্রশাসন কর্তাদের এই বিষয়ে একটু অতিরিক্ত শতর্কতা অবলম্ব করাসহ যথাসম্ভব জরুরী ভিত্তিতে এই সংকট থেকে বেড়িয়ে আসার উপায় বের করটা এখন সময়ের দাবি।
সূত্র থেকে জানা গেছে, সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের রেজিস্ট্রার (বিচার) এসকে.এম তোফায়েল হাসান বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার বরাবর এ চিঠি দেন। সুপ্রিম কোর্টসহ অধস্তন সকল আদালত ও ট্রাইব্যুনালে স্ট্যাম্প, কার্টিজ পেপার, কোর্ট ফি ও ফলিও’র স্বাভাবিক সরবরাহ নিশ্চিত করণার্থে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের কথা বলা হয়েছে সেই চিঠিতে।