মাহবুবুজ্জামান সেতু, নওগাঁ : নওগাঁর মান্দা উপজেলায় আম পাড়াকে কেন্দ্র করে এক বৃদ্ধকে পিটিয়ে হত্যার জেরে আসামিপক্ষের বাড়িঘরে ভয়াবহ হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। শুক্রবার (১২ জুন) জুমার নামাজের পর উপজেলার পরানপুর ইউনিয়নের হাটোইর গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। হামলায় আসামিপক্ষের ৯টি পরিবারের অন্তত ১২টি বসতবাড়ি পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। ঘটনার পর থেকে পুরো এলাকায় চরম উত্তেজনা ও থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। নতুন করে অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে এলাকায় পুলিশি নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ৮ জুন (সোমবার) পরানপুর ইউনিয়নের হাটোইর গ্রামে আম পাড়াকে কেন্দ্র করে দুপক্ষের সংঘর্ষে তৈয়বুর রহমান মোল্লা (৬৫) নামের এক বৃদ্ধ নিহত হন। ওই ঘটনায় দায়ের করা মামলায় পুলিশ মূল অভিযুক্ত সৈয়ব আলী (৬২), তার ছেলে স্বাধীন (২২), কামরান এবং মাজেদুলের স্ত্রী সুরভীকে গ্রেপ্তার করে জেলহাজতে পাঠায়।
ভুক্তভোগী পরিবারের লোকজনের অভিযোগ, হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটির পর থেকেই বাদীপক্ষের লোকজন তাদের কাছে ১ লক্ষ টাকা চাঁদা দাবি করে আসছিল। সকাল থেকেই এলাকায় “সৈয়বের পরিবার রাখবো না, এরা খুনি পরিবার” বলে হুমকি দেওয়া হচ্ছিল। দাবি করা চাঁদার টাকা না দেওয়ায় এবং পূর্ব শত্রুতার জেরে এই অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটানো হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, শুক্রবার জুমার নামাজ শেষে মামলার বাদীপক্ষ ও স্থানীয় গ্রামবাসীর একটি অংশ মসজিদে বৈঠক করে আসামিপক্ষের বাড়িঘরে হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়। এরপরই তারা লাঠিসোঁটা ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ঘরবাড়িতে চড়াও হয়। ভুক্তভোগীদের দাবি, জুমার নামাজ শেষে মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে সরাসরি উস্কানি ছড়ানো হয়। এরপরই উন্মত্ত জনতা সব মুসল্লিদের সঙ্গে করে এনে আসামিপক্ষের সৈয়ব আলী, কামরান, স্বাধীন, সুজাদ, আমিনুল, হামিদুর ইসলাম ও ইমরানসহ অন্যদের বাড়িঘরে ভাঙচুর ও লুটপাট শুরু করে।
সৈয়বের ভাগ্নি শারমিন বলেন,“মসজিদে দাঁড়িয়ে প্রথমে হাশেম নামের একজন মসজিদের মাইকে আগুন লাগানোর জন্য উস্কানিমূলক বক্তব্য দেন। এরপর মামুন শাহ, আজিজার রহমান, মোসলেম ও আজিজার রহমান ওদ পর্যায়ক্রমে সবাইকে উস্কানিমূলক বক্তব্য দিয়ে উত্তেজিত করে তোলে। পরে হাশেম, মেহেদী, মোমিন, তহমিনা, রিপা এবং তাদের বাড়ির অন্য নারীরা রফিকুল রহমান পচার বাড়ি থেকে পেট্রোল এনে ঘরবাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়।”
শারমিন আরও অভিযোগ করেন, “তারা প্রভাবশালী হওয়ায় ভয়ে কেউ মুখ খুলছে না। ৯৯৯-এ ফোন দেওয়ার পর যখন পুলিশ আসে, তখন হুমকি দেওয়া হয় যে খবর দিয়েছে তাকে পুড়িয়ে ফেলা হবে এবং মামলার অজ্ঞাতনামা আসামি করা হবে। কেউ প্রতিবাদ করলেই তাকে মামলায় ফাঁসানোর হুমকি দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে আমরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি।”

আগুনে কামরান, সৈয়ব, সুমন, স্বাধীন, সুজাদ, মাজেদুল, সাজেদুর রহমান সাজু, এমরান, সজিব, হামিদুর এবং আমিনুরসহ ১১-১২ জনের বাড়িঘর পুড়ে এমনভাবে ধ্বংস হয়েছে যে, সেখানে বর্তমানে বসবাস করার কোনো পরিবেশ নেই। পুরুষরা আগেই এলাকা ছেড়ে পালানোয় ঘরে থাকা নারী, শিশু এবং বৃদ্ধরা বড় অসহায়ত্বের মধ্যে পড়েছেন।
মাজেদুলের স্ত্রী সেলিনা জানান, ঘরবাড়িতে আগুন দেওয়ার সময় তিনি ও তার ছেলে বাড়িতে ছিলেন। তারা কোনোমতে এক কাপড়ে প্রাণ বাঁচিয়ে ঘর থেকে বের হতে পেরেছেন। অপরদিকে সবারই একই অবস্থা। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর দাবি যে, নগদ টাকা-পয়সা, ধান-চাল, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, আইডি কার্ড, জমির দলিলপত্র, ঘরের আসবাবপত্র (খাট, শোকেস, চেয়ার-টেবিল, ড্রেসিং টেবিল, আলনা, মিটসেফ), ফ্রিজ, টিভি, মোটর পাম্প এবং গোয়ালের গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগিসহ স্বর্ণালঙ্কারসহ সব মিলিয়ে প্রায় ২০ থেকে ৩০ লক্ষাধিক টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
খবর পেয়ে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর মাধ্যমে মান্দা থানা পুলিশ এবং ফায়ার সার্ভিসের একটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। বেশ কয়েকটি বাড়িতে একসঙ্গে আগুন ছড়িয়ে পড়ায় ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে বেশ বেগ পেতে হয়।
মান্দা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা খোরশেদ আলম বলেন, “হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এ পর্যন্ত মোট চারজনকে আটক করা হয়েছে। অন্যান্য আসামিদের আটকের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। অন্যায় করলে বিচার হবে এটাই স্বাভাবিক, কিন্তু আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগের ঘটনাটি অত্যন্ত অমানবিক। এই সহিংসতার সঙ্গে জড়িত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।”
নওগাঁর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম জানান, ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। ভুক্তভোগীদের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।