শাহানুর রহমান রানা
রাজশাহী মহানগরীর একটি মিষ্টির দোকান থেকে এক কেজি মিষ্টি কিনলেন সুমন চৌধুরী। দাম দিয়েছেন দুইশ আশি টাকা। তাকে মিষ্টির সঙ্গে যে বাক্সটি দেওয়া হয়েছে এর ওজন একটু বেশি মনে হওয়ায় অন্য একটি দোকানে গিয়ে প্যাকেটটি বাদ দিয়ে শুধু মিষ্টি মাপালেন। দেখলেন এক কেজিতে প্রায় ১০০ গ্রাম কম! সে হিসেবে মিষ্টির বাক্সটির দাম পড়েছে ২৮ টাকা। বিষয়টি নিয়ে দোকানের কর্মচারির সঙ্গে ক্রেতার কিছুটা তর্ক হলো, তবে কোনো সমাধান এলো না। অসাধু ব্যবসায়ীদের মিষ্টির দোকানে প্রতিনিয়ত এভাবেই মোড়কে ঠকছেন অনেক ক্রেতা।
মিষ্টি বিক্রেতারা বিভিন্ন পণ্য দিতে গিয়ে যে প্যাকেট সরবরাহ করছেন সেটাও সেই পণ্যের দামেই বিক্রি করছেন। অভিযোগ আছে অসাধু ব্যবসায়িরা নিজেরা অর্ডার দিয়ে একটু বেশি ওজনের প্যাকেট বানিয়ে নিচ্ছেন। একটি প্যাকেটে যেখানে খরচ হচ্ছে পাঁচ থেকে ছয় টাকা সেখানে তারা মিষ্টির সাথে ক্রেতার কাছে ঐ প্যাকেটটি বিক্রি করছেন ২০ থেকে ৩০ টাকায়। অর্থাৎ প্রতি কেজি মিষ্টিতে ক্রেতারা প্রথমেই ঠকছেন প্রায় ত্রিশ টাকা। এছাড়াও একই সাইজ ও সমমানের মিষ্টি ওজনের সময় সংখ্যার তারতম্যও লক্ষ্যনীয়। কোথাও কেজিতে ধরে ১৭-১৮টি, আবার কোথাওবা ১৪-১৫ টি। ওজনের ম্যারপ্যাঁচে সেখানেও ঠকছেন ক্রেতারা। দোকান ও শোরুম ভেদে প্রত্যেকটা প্যাকেটের ওজন গড়ে প্রায় ৮০ থেকে ১০০ গ্রামের মতো। ভোক্তা ঠকাতে বিক্রেতারা যত ফাঁদ তৈরি করেছেন, তার মধ্যে একটি এই মোড়কের অতিরিক্ত ওজন। নগরীর সুনামধন্য ও বিভিন্ন মোড়ের মিষ্টির দোকানগুলোকে এই ধরণের অসাধু প্রবণতা বেশি লক্ষনীয়। কোন কোন মিষ্টির শোরুমে সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে অভিযোগ করতে গেলে রাজনৈতিক পরিচয়কে ঢাল করে পরোক্ষ ভয়ভীতি দেখানোর প্রবণতাও কম নয়। এছাড়াও রয়েছে মিষ্টির শোরুমের সামনের ফুটপাত দখল করে রাখার অভিযোগও।
মান নিয়ন্ত্রণে সরকারি সংস্থা ‘বিএসটিআই’ এর মেট্রোলজি শাখা নানা সময় ওজনে কম দেওয়ায় ব্যবসায়ীদের সাজা দিলেও এই মোড়ক প্রতারণার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নজির খুব কম বলেই মন্তব্য ক্রেতাদের। মিষ্টির প্যাকেটের এই জোচ্চুরি যেন মরার উপর খাঁড়ার ঘা। তবুও কিছুই করার নেই, এই উচ্চ মূল্যের বাজারে দুটো পয়সারও মূল্য অনেক বলে মন্তব্য ক্রেতাদের। আত্মসম্মানের ভয়ে অধিকাংশ ক্রেতাই এই বিষয়টি জেনে শুনেও তর্কে জাননা।
মিষ্টির দোকানে মিষ্টি ওজনে কম দিয়ে মুনাফা বেশি করতে ভারী প্যাকেট ব্যবহার করা হয় বলে জানান নগরীর একটি মিষ্টির দোকানে কর্মরত কর্মচারী। প্যাকেটের ওজন বৃদ্ধি করতে প্যাকেটের নিচের অংশ মোটা কাগজের সিট তৈরি করা হয়। ক্রেতারা চাইলেও দোকানীরা এই প্যাকেট ছাড়া মিষ্টি বিক্রি করে না। শুধু মিষ্টি প্যকেটই নয়, মিষ্টির উপরের কাভারসহ মিষ্টি ওজন করার প্রবণতা সর্বত্রই লক্ষনীয়। মিষ্টির দোকানে প্রতিটি প্যাকেটের ওজন গড়ে ৮০ থেকে ১০০ গ্রাম। কোন কোন দোকানে একশ গ্রামের অতিরিক্ত ওজনেরও প্যাকেট চোখে পরে। সেহিসেবে, এক কেজি মিষ্টির দাম যদি ৩০০ টাকা হয়, তবে প্যাকেটের দামও রাখা হয় ঐ ৩০০ টাকা হারে। তাহলে একটা এক কেজি ধারণক্ষমতার ৮০ গ্রামের প্যাকেটের দাম পড়ে ২৪ টাকা আর ১০০ গ্রাম ওজনের প্যাকেটের দাম হয় ৩০ টাকা! মিষ্টির দাম ভেদে প্যাকেটের গড় দামও বৃদ্ধি পায়।
শুধু মিষ্টিই নয়, দই কিনলেও অনেক ক্ষেত্রে ঠকছে ক্রেতারা। দই এর হাড়িতে কি পরিমাণ দই থাকে সেটি ওজন করে দেখার নেই কোন সুযোগ। একেক দোকানে একেকরকম হাড়ি বা সরাইয়ের আকৃতি ও গঠণ একেকরকম। কোথাও মোটা আবার কোথাওবা ভুব বেশি মোটা আর ভারি। বিক্রেতারা দই এর হাড়িতে যে পরিমাণ ওজনের বর্ণনা লিখে রাখেন ক্রেতারা সেই পরিমাণের বিপরীতেই দাম দিয়ে কিনেন দই। কিন্তু হারিতে কি পরিমাণ দই আছে সেটি অন্যকোথাও পরিমাপ করেও লাভ নেই। দইসহ হাড়িতে এককেজি লিখা থাকলেও সেখানে প্রকৃতভাবে দই থাকে সর্বোচ্চ ৮০০ গ্রাম। এখানেও ঠকছেন ক্রেতারা। এছাড়াও রয়েছে দই মিষ্টিসহ মিষ্টিজাতীয় পণ্যের মান ও স্বাদ নিয়ে ভিন্নতা। কোন কোন শোরুম বা বিক্রয়কেন্দ্রগুলো ক্রেতার দৃষ্টি আকর্ষণে গর্জিয়াস করে সাজালেও মিষ্টির মানে রয়েছে অনেক ভিন্নতা। কিন্তু দাম; সেটি কিন্তু আকাশ ছোঁয়া। আবার এমনও অভিযোগ পাওয়া গেছে, রাজশাহীর বাইরে থেকে আসা কিংবা রাজশাহী থেকে অন্যকোন স্থানে বেড়াতে যাওয়া চলমান ক্রেতাদেরকে সুযোগ বুঝে অনেক সময় গছিয়ে দেয়া হয় নষ্ট ও দীর্ঘদিন ধরে ডিসপ্লেতে সাজিয়ে রাখা মিষ্টির একাংশ। এভাবেই ক্রেতারা নিয়মিত ঠকছে নগরীর অসাধু ব্যবসায়ির মিষ্টির দোকানগুলোতে।
এদিকে, সরেজমিন রাজশাহী নগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, নিয়মনীতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে অধিকাংশ মিষ্টির শোরুম ও বিক্রয়কেন্দ্রগুলোতে ইসিআর (ইলেকট্রনিক ক্যাশ রিডার) ব্যবহার করা হয় না। ইসিআর মেশিনের মাধ্যমে ক্রেতার কাছ থেকে বিল নেওয়ার নিয়মনীতি থাকলেও ভ্যাট ফাঁকি দিতেই ইসিআর ব্যবহারে অনুৎসাহী ব্যবসায়ীরা। প্রসঙ্গত, ২০০৯ থেকে নির্দিষ্ট ১১টি ব্যবসায় ‘ইসিআর’ মেশিনের মাধ্যমে চালান প্রদান বাধ্যতামূলক করেছিল সরকার। এরমধ্যে অন্যতম হলো মিষ্টির দোকান। কিন্তু অসাধু ব্যবসায়ীরা সেই নিয়মনীতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে দেদাড়ছে করে যাচ্ছেন প্রাত্যহিক ব্যবসা। তবে কোন কোন দোকানে ইসিআর ও ইলেক্ট্রনিক বিল মেশিনের মতো ডিভাইসের উপস্থিতি থাকলেও নেই সেটির নিয়মিত ব্যবহার। বিশেষ করে রাজশাহী নগরীর রেলগেট, সাহেব বাজারের কয়েকটি অভিযাত মিষ্টির দোকানে এবং সিএন্ডবি মোড় এলাকার একটি দোকানে ক্রেতা ঠকানোর প্রবনতা বেশী বলে অনেকে অভিযোগ বরেন।
বিএসটিআই(বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস এন্ড টেস্টিং ইন্সটিটিউশন)রাজশাহী বিভাগীয় কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক (মেট্রোলজী) জুলফিকার আলীর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্যাকেটের ওজন ব্যতীত ক্রয়কৃত পণ্যের ওজনই হচ্ছে নেট ওয়েট। গত ৫-৭-২৩ ইং তারিখে নগরীর সাহেব বাজার এলাকার শামীম সুইট নামের মিষ্টির দোকানকে পণ্যের ‘নেট ওয়েট (শুদ্ধ ওজন)’ কম দেওয়াতে ১০ হাজার টাকা ও মিঠাই বাজারকেও জরিমানা করা হয়েছে। এছাড়া, গত ২৬-৭-২৩ ইং তারিখে চারঘাট এলাকায় ভাই ভাই মিষ্টি ভান্ডার ও শ্রী কৃষ্ণ নামের দুটো মিষ্টির দোকানেও ঐ একই কারণে জরিমানা করা হয়েছে। এই অভিযান অব্যাহত থাকবে। এছাড়াও কোন দোকানের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ থাকলে আমরা তাৎক্ষণিক আইনানুগ ব্যবস্থা নেই।