স্টাফ রিপোর্টার
অপকর্ম, অনিয়ম-দুর্নীতি আর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কোনটিই যেন পিছু ছাড়ছে না রাজশাহী-০১ (তানোর-গোদাগাড়ী) আসনের সরকার দলীয় সংসদ সদস্য ওমর ফারুক চৌধুরীর। বিভিন্ন সময় নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে খবরের শিরোনাম হওয়া এই এমপির ইশারাতে এবার মুক্তিযুদ্ধ, অসাম্প্রদায়িক ও স্মার্ট বাংলাদেশের ওপর নির্মিত একটি নাটকের প্রদর্শন ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পণ্ড করে দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। গত বৃহস্পতিবার (১৫ জুন) বিকালে গোদাগাড়ীর পিরিজপুর ফুটবল মাঠ প্রাঙ্গনে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানটি এমপি ফারুকের নির্দেশে স্থানীয় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা এটি পণ্ড করে দেয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার রাজশাহী জেলা কৃষকলীগের আয়োজনে পিরিজপুর ফুটবল মাঠে মুক্তিযুদ্ধ, অসাম্প্রদায়িক ও স্মার্ট বাংলাদেশের ওপর নির্মিত একটি নাটক ও সাংস্কৃতিক সন্ধ্যার আয়োজন করা হয়। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে অনুষ্ঠানটি সফল করার লক্ষ্যে মঞ্চ তৈরী ও ফুটবল মাঠটি সাজানোর কাজ চলছিল। এমপি ওপর ফারুকের নির্দেশে বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে উপজেলার মাটিকাটা ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রলীগ সভাপতি হাফিজুর রহমানের নেতৃত্বে মেহেদী, প্রিন্স, শাহীনসহ ১০-১৫ জনের একটি গ্রুপ সেখানে গিয়ে হুমকি-ধামকি আর অকথ্য ভাষায় গালাগাল করে নাটক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের জন্য মঞ্চ তৈরীর কাজ বন্ধ করে দেয়। এসময় মঞ্চ তৈরীর দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা জেলা কৃষক লীগের প্রচার সম্পাদক মো. এনামুল হক রিপন ও মাটিকাটা ইউনিয়ন কৃষক লীগের সভাপতি মো. জহিরের মোবাইল ফোন কেড়ে নেয় স্থানীয় ছাত্রলীগের ‘সন্ত্রাসীরা’। ধ্বস্তাধস্তির এক পর্যায়ে জহিরের মোবাইল ফোনটি তার জোরে চাপ দিয়ে অকার্যকর করে ফেলে। এরপর ঘটনাস্থলে উপস্থিত মাটিকাটা ইউনিয়নের কৃষক লীগের সাধারণ সম্পাদক মাসুদ রানা ও ইউনিয়নের ৪ নং ওয়ার্ড কৃষকলীগের সভাপতি আব্দুস সোবহানকে তারা লাঞ্ছিত করে। জেলা কৃষক লীগ সূত্র জানায়, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর নাটক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানটি হওয়ার কথা ছিল। জেলা কৃষক লীগ সভাপতি অধ্যক্ষ মো. তাজবুল ইসলামের পৃষ্ঠপোষকতা ও সভাপতিত্বে সেখানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা ছিল- জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোহা. আসাদুজ্জামান আসাদের। এছাড়া জেলা কৃষক লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক মো. এনামুল হক রিপনের সঞ্চালানায় অনুষ্ঠানটিতে জেলা কৃষক লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. ওয়াজেদ আলী খান ও মাটিকাটা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. সোহেল রানার বিশেষ অতিথি হিসেবে থাকার কথা ছিল। জানা গেছে, নাটকটিতে মুক্তিযুদ্ধের সময় বর্তমান হাইব্রীড নেতা ও তাদের পরিবারের ভূমিকার বিষয়টিই সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ওই সব নেতা যাদের পরিবার রাজাকার, আলবদর ও নিজেদের ভূমিকাও বিতর্কিত ছিলো তারাই এখন চেয়ারম্যান, এমপি ও মন্ত্রী হওয়ার জন্য দলীয় মনোনয়ন পেতে মরিয়া হওয়ার বিষয়টি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এছাড়া অসাম্প্রদায়িক ও স্মার্ট বাংলাদেশের ধারনা নাটকটিতে পরিস্ফূটিত হয়েছে। জানা গেছে, রাজশাহী জেলা কৃষক লীগের সভাপতি অধ্যক্ষ মো. তাজবুল ইসলাম ২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজশাহী-০১ (তানোর-গোদাগাড়ী) আসন থেকে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন। অধ্যক্ষ তাজবুল আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এবার নৌকার মনোনয়ন পেতে তানোর-গোদাগাড়ীতে দীর্ঘদিন থেকে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মসূচি পালন করে আসছেন। এরই ধারাবাহিকতায় গত বৃহস্পতিবার জেলা কৃষক লীগ আয়োজিত এই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল, যা এমপি ফারুকের ইন্ধনে পণ্ড হয়ে যায়।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিতর্কিত নানা কর্মকাণ্ডে এমপি ওমর ফারুক বিভিন্ন সময় আলোচনা-সমালোচনার খোরাক হয়েছেন। জেলা কৃষক লীগ ও কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দকে তোয়াক্কা না করে পেশিশক্তির বলে গত বছরের ১ ডিসেম্বর গোদাগাড়ী উপজেলা কৃষক লীগের সম্মেলনে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীক ১ নং গোদাগাড়ী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান নির্বাচিত রুহুল আমিনকে উপজেলা কৃষক লীগের সভাপতি বানিয়েছেন। পরের দিন ২ ডিসেম্বর তানোর উপজেলা কৃষক লীগের সম্মেলনে ওয়ার্কার্স পার্টির হাতুড়ি মার্কা প্রতীক নিয়ে উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত মো. আবু বাক্কারকে তানোর কৃষক লীগের সাধারণ সম্পাদকের পদ বাগিয়ে দিয়েছেন। শুধু তাই নয়; দুদক ২০২০ সালে অর্থ আত্মসাৎ, খাসজমি দখল, খাসজমি ইজারায় দুর্নীতি, সার ডিলার নিয়োগ, স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসায় শিক্ষক নিয়োগসহ জামায়াত-বিএনপির মদতপুষ্ঠ ব্যক্তিদের নিয়োগ প্রদান করাসহ প্রায় ২০ ধরনের অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করে। এছাড়াও রাজাবাড়ী হাট ডিগ্রী কলেজের অধ্যক্ষকে নির্যাতন, ২০২১ সালে সেপ্টেম্বরে তানোর উপজেলা এলজিইডি’র ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল্লা আল মামুন, ২০১৩ সালে তানোর আব্দুল করিম সরকার ডিগ্রী কলেজের অধ্যক্ষ হাবিবুর রহমানকে তার বাড়ীতে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ পুরনো। ২০১৫ সালে প্রেমতলি ডিগ্রী কলেজে প্রভাষক পদে নিয়োগ পেতে রাজাকার পুত্র সাজেদুর রহমান সুজন এবং পিয়ারুল ইসলাম এএমপি ফারুক চৌধুরীর হাতে ফুলের তোড়া দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগে যোগদান করেছিল। এমপি ফারুকের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ৭০ শতাংশ জামায়াত বিএনপির নেতাকর্মীদের চাকুরি দিয়েছেন তিনি। ওমর ফারুক চৌধুরী তার নির্বাচনী এলাকায় নিজে ২০১৮ সালে ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবসে বিএনপির গোদাগাড়ী উপজেলা পরিষদের তৎকালীন চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির সভাপতি ইসহাক আলীকে আওয়ামী লীগে যোগদান করিয়ে মিষ্টি বিতরণ উৎসব করে। এমপি ফারুক চৌধুরীর বিরুদ্ধে অভিযোগ গোদাগাড়ীর মাদক ব্যবসায়ীদের আশ্রয় প্রশ্রয় ও পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ রয়েছে। এর আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক অধিশাখা-২ তৎকালীন উপসচিব মো. নায়েব আলীর স্বাক্ষরিত এক প্রতিবেদন তাকে ‘মাদকের পৃষ্ঠপোষক’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়া এমপি ফারুকের বিরুদ্ধে ২০১৩ সালে তানোর উপজেলা পি.আই.ও জিয়াকে লাঞ্ছিত, ২০১৮ সালে তানোর উপজেলা ছাত্রলীগের তৎকালীন সভাপতি রবিন সরকারকে জুতা পেটা, ১২ আগস্ট ২০১৮ সালে জেলা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি কাজী রুবেল রানাকে জুতা পেটা করে পুলিশের কাছে তুলে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন। ফারুক চৌধুরী রাজনৈতিক জীবন ত্রিদলের মাধ্যমে শুরু করার অভিযোগ রয়েছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯৮০ সালের ছাত্র সংসদ (রাকসু) নির্বাচনে ছাত্রদলের মর্তুজা-জুয়েল প্যানেল থেকে ক্রীড়া সম্পাদক পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ছাত্রলীগের শাহ আলমের কাছে পরাজিত হয়েছিলেন ফারুক। ১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার আমিনুল ইসলামের পক্ষে সরাসরি ভোট করেন তিনি। এসব বিষয়ে জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোহা. আসাদুজ্জামান আসাদ বলেন, ‘ফারুক চৌধুরীর নিজ বাড়ী রাজশাহী শহরের সাগরপাড়ায়। সে সেখানকার বাড়ীর ঠিকানায় ভোটার। ফারুক চৌধুরী ৩ বারের এমপি অথচ একবারও সে নৌকায় ভোট দেননি। সে চেতনায় আওয়ামী লীগ বিরোধী ও পাকিপন্থী ধারার মানুষ। তার বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই। বৃহস্পতিবার গোদাগাড়ীতে জেলা কৃষক লীগের আয়োজনে একটি নাটকের আয়োজন করা হয়েছিল। কিন্তু এমপি ফারুক তার ছেলে-পেলে দিয়ে পণ্ড করে দেয়। ওই নাটকে গানে আর ছন্দের তালে তালে প্রধানমন্ত্রীর উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ও স্মার্ট বাংলাদেশের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। এই নাটকের অনুষ্ঠানটি বন্ধ করার মধ্য দিয়ে এমপি ফারুক আবারো প্রমাণ করবো সে রাজাকারের সন্তান। এই ধরনের মানুষ আওয়ামী লীগে থাকলে দলের কোনো উন্নয়ন হবে না।’ রাজশাহী জেলা কৃষক লীগের সভাপতি অধ্যক্ষ মো. তাজবুল ইসলাম বলেন, ‘এমপি ফারুক আওয়ামী লীগের ভাবধারার লোক না পেয়ে তানোর ও গোদাগাড়ীতে অন্য দলের পদধারী নেতাদের কৃষক লীগের গুরুত্বপূর্ণ পদে জোরপূর্বক বসিয়েছেন। এর একটাই কারণ, আমি জেলা কৃষক লীগের দায়িত্বে আছি। আমার নেতৃত্বে যাতে তানোর-গোদাগাড়ীতে কৃষক লীগ শক্তিশালী হতে না পারে। তাছাড়া আমি আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে এই আসন থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী। সঙ্গত কারণেই তিনি আমাকে তার শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বি মনে করেন। এজন্য জেলা কৃষক লীগের একের পর এক কর্মসূচিতে তিনি বাধা প্রদান করে আসছেন।’ এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে এমপি ওমর ফারুক চৌধুরীর মুঠোফোনে গত দুই দিনে (গত বৃস্পতিবার ও শুক্রবার) অসংখ্যবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে তার মুঠোফোনে ক্ষুদে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি কোনো রেসপন্স করেননি।