শাহানুর রহমান রানা
গেলো বিশ্বকাপ ফুটবলের জমজমাট আসর শেষ হয়েছে প্রায় একমাস আগে। কিন্তু নিজেদের প্রিয় দলের প্রতি সমর্থন জানাতে বাসাবাড়ি, রাস্তাঘাট, ব্যক্তিগত চেম্বার ও বিভিন্ন ভবনের ছাদে উড়ানো সেই ভিনদেশি পতাকা এখনো উড়ছে রাতদিন সার্বক্ষণিক। যেটি আইনের দৃষ্টিকোণ থেকে অনেকটাই নিয়মনীতি বর্হিভুক্ত ও অবৈধ। অন্যদিকে, ফুটবল বিশ্বকাপের উম্মাদনায় মাতোয়ারা হয়ে ভিনদেশি পতাকার পাশাপাশি নিজেদের স্বাধীন ও সার্বভৌম্যের প্রতীক জাতীয় পতাকার অবমাননাও হচ্ছে সেই তখন থেকে এখন অবদি। বাংলাদেশ পতাকা রুলস, ১৯৭২-এর ৪ ধারাও ভঙ্গ হচ্ছে প্রায় প্রতিনিয়তই। বিদেশি পতাকাগুলোর পাশাপাশি নিজ দেশের পতাকাগুলো রাতদিন সার্বক্ষণিক উড্ডয়নের প্রেক্ষিতে প্রতিনিয়তই নষ্ট হচ্ছে পতাকাগুলোর সৌন্দর্য। এক কথায়, দেশি ও ভিনদেশি পতাকাগুলোকে একসাথেই করা হচ্ছে অবমাননা। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আজ অবদি এই বিষয়ে কোন প্রকার উপযুক্ত ব্যবস্থা নেয়া তো দূরের কথা নেই কোন ভ্রুক্ষেপও বলে মন্তব্য সচেতন ব্যক্তিদের।
১৯৭২ সালের পতাকা আইন লঙ্ঘণ করে যত্রতত্র বিদেশি পতাকা উত্তোলন বন্ধে প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তাকে কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে ইতিমধ্যেই রুল জারি করেছিল মহামান্য হাইকোর্ট। এছাড়া পতাকা আইন ও রুলস অনুযায়ী জাতীয় পতাকা ও বিদেশি পতাকা উত্তোলনের নিয়মাবলী জনস্বার্থে প্রচার করার জন্য কেন নির্দেশনা দেয়া হবে না, রুলে তাও জানতে চাওয়া হয়েছিল। ফুটবল বিশ্বকাপ ২০১৮ চলাকালে দেশে বিদেশি পতাকার অননুমোদিত ব্যবহার বন্ধে রিটটি দায়ের করা হয়েছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. মনজুরুল হকসহ ১৩ জন এই রিট আবেদনটি দায়ের করেন। আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার গাজী ফরহাদ রেজা।
কিন্তু নিয়মনীতিকে তুচ্ছ করে খামখেয়ালিপনা. অসচেতনতা আর কৌতুহলবশত রাজশাহী মহানগরীর প্রায় প্রতিটি এলাকায় দেদারসে উড়ছে ভিনদেশি পতাকার পাশাপাশি জাতীয় পতাকাও। কোন কোন স্থানে মাসের পর মাস ধরে রাতদিন সার্বক্ষণিক পতাকা উড্ডয়নের ফলে ইতিমধ্যেই সেগুলোর প্রকৃত রং আর সৌন্দর্য্যও বিলীনের পথে। কোথাওবা খুটি কিংবা বাঁশের সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে পতাকাগুলো। ভিনদেশি পতাকা উড়াতে গিয়ে প্রতিনিয়তই অবমাননার বেড়াজালে পড়ছে আমাদের লাল সবুজের জাতীয় পতাকাটিও। সূর্যাস্তের আগেই আবার পতাকা নামিয়ে ফেলার নিয়ম থাকলেও রাতের আধারেও ভিনদেশি পতাকার সাথে উড়ছে জাতীয় পতাকা। যেটি নির্দ্ধিধায় অবমাননার সামিল বলে মন্তব্য সচেতন ব্যক্তিদের।
দেশিয় পতাকার পাশাপাশি ভিনদেশি কোন পতাকা উড়ানোর ক্ষেত্রেও রয়েছে সুনির্দিষ্ট নিয়মনীতি। কিন্তু, বিশ্বকাপের শুরু থেকে এখন অবদি সেই নিয়মনীতিকেও অবহেলা করে এখনো নগরীর অধিকাংশ স্থানেই উড়ছে পতাকাগুলো।
অন্যদিকে, ২০১০ সালে বিশ্বকাপ ফুটবল চলাকালে বাংলাদেশে বিদেশি পতাকা ব্যবহার বন্ধে হাইকোর্টে একটি রিট করা হয়েছিলো। ওই রিট আবেদনে বলা হয়, ফুটবল বিশ্বকাপ চলাকালে অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন দলের বাংলাদেশি সমর্থকরা দেশের বিভিন্ন স্থানে বিদেশি পতাকা উত্তোলন করেন। অথচ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের পতাকা বিধিমালা ১৯৭২-এর বিধান অনুযায়ী, বাংলাদেশে অবস্থিত বিদেশি কূটনৈতিক মিশনগুলো ছাড়া অন্য কোনো স্থানে অন্য রাষ্ট্রের পতাকা উত্তোলন করতে হলে বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ অনুমোদন গ্রহণ করতে হবে। বিশ্বকাপ চলাকালীন সময়ে পতাকা উড়ানোর যে নিয়ম অনুসরণ করা হয় তাতে প্রথমত, বাংলাদেশের জাতীয় পতাকাকে অবমাননা করা হয়। দ্বিতীয়ত, অনুমোদন ছাড়াই বিদেশি পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে পতাকাবিধিমালাকে লঙ্ঘন করা হয়।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ পতাকা রুলস, ১৯৭২-এর ৪ ধারায় কোন কোন দিন জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা যাবে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত বলা হয়েছে। বিভিন্ন জাতীয় দিবস যেমন-মহানবী হজরত মুহাম্মদের (স.) জন্মদিনে (ঈদে মিলাদুন্নবী), স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস ও সরকার ঘোষিত অন্য যে কোনো দিবসে বাংলাদেশের সরকারি, বেসরকারি ভবন ও বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশন এবং কনস্যুলার অফিসে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা বাধ্যতামূলক। তাছাড়া শহীদ দিবস ও জাতীয় শোক দিবসে বা সরকার ঘোষিত অন্যান্য দিবসে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখার বিধান করা হয়েছে। নিয়মানুযায়ী শুধু সূর্যোদয়-সূর্যাস্ত পর্যন্ত পতাকা উত্তোলিত রাখতে হবে। এটাই নিয়ম। কিন্তু, বিশ্বকাপের উম্মাদনাই বিদেশি পতাকার পাশাপাশি নগরীর অনেক স্থানে রাতের বেলাতেও বিদেশি পতাকার পাশাপাশি নিয়মনীতি ভঙ্গ করে ওড়ানো হয়েছে (্এখনো হচ্ছে) বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা (প্রতিবেদকের কাছে সেই ভিডিও ভুটেজ সংরক্ষিত আছে)। কিন্তু নিয়মানুযায়ী, রাতের বেলাতেও বিশেষ বিশেষ স্থানের ভবনসমূহে পতাকা উত্তোলিত রাখা যেতে পারে। যেমন- সংসদের রাতের অধিবেশন, রাষ্ট্রপতি বা মন্ত্রীগণের শপথ অনুষ্ঠান চলাকালীন। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর গাড়িতে, নৌযানে ও বিমানে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা যাবে। এছাড়া স্পিকার, প্রধান বিচারপতি, মন্ত্রী, চিফ হুইপ, ডেপুটি স্পিকার, জাতীয় সংসদের বিরোধী দলের নেতা, মন্ত্রী সমমর্যাদার ব্যক্তি, বিদেশে অবস্থিত কূটনৈতিক মিশনের অফিস ও কনস্যুলার পোস্টসমূহে। বিদেশে বাংলাদেশি মিশনের প্রধানের গাড়িতে ও তাদের নৌযানে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করতে পারবেন। প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদাপ্রাপ্ত ব্যক্তি, উপমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীর মর্যাদাপ্রাপ্ত ব্যক্তি রাজধানীর বাইরে ভ্রমণকালে গাড়িতে ও নৌযানে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করতে পারবেন।