সংসদ বিলুপ্তিসহ ১০ দাবি বিএনপি’র মিল রেখে জামায়াতেরও একই কর্মসূচি

Paris
Update : রবিবার, ১১ ডিসেম্বর, ২০২২
default

আরা ডেস্ক : রাজধানীর গোলাপবাগ মাঠে আয়োজিত ঢাকা বিভাগীয় গণসমাবেশ থেকে ১০ দফা দাবি জানিয়েছে বিএনপি। শনিবার(১০ ডিসেম্বর) বিকেলে এ দাবি জানান বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন। বিএনপির দাবিগুলো হলো, বর্তমান জাতীয় সংসদ বিলুপ্ত করে ক্ষমতাসীন সরকারের পদত্যাগ; ১৯৯৬ সালে সংবিধানে সংযোজিত ৫৮ অনুচ্ছেদের খ, গ ও ঘ-এর আলোকে একটি দল নিরপেক্ষ নির্বাচনকালীন সরকার বা অন্তর্র্বতীকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন; বর্তমান অবৈধ নির্বাচন কমিশন বাতিল করে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠন এবং অবাধ নির্বাচনের অনিবার্য পূর্বশর্ত হিসেবে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নিশ্চিত করতে আরপিও সংশোধন, ইভিএম পদ্ধতি বাতিল ও পেপার ব্যালটের মাধ্যমে ভোটের ব্যবস্থা করা এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক ব্যবহার বাতিল; খালেদা জিয়াসহ সব বিরোধীদলীয় নেতাকর্মী, সাংবাদিক এবং আলেমদের সাজা বাতিল, সব মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার ও রাজনৈতিক কারাবন্দিদের অনতিবিলম্বে মুক্তি, দেশে সভা-সমাবেশ ও মত প্রকাশে কোনো বাধা সৃষ্টি না করা, সব দলকে স্বাধীনভাবে গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালনে প্রশাসন ও সরকারি দলের কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ বা বাধা সৃষ্টি না করা, স্বৈরাচারী কায়দায় বিরোধী কণ্ঠস্বরকে স্তব্ধ করার লক্ষ্যে নতুন কোনো মামলা ও বিরোধীদলের নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার না করা। এছাড়া, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮ এবং বিশেষ ক্ষমতা আইনসহ (১৯৭৪) মৌলিক মানবাধিকার হরণকারী সব কালা-কানুন বাতিল; বিদ্যুৎ, জ্বালানি, গ্যাস ও পানিসহ জনসেবা খাতের মূল্যবৃদ্ধির গণবিরোধী সরকারি সিদ্ধান্ত বাতিল; নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে আনা, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারকে সিন্ডিকেটমুক্ত করা; গত ১৫ বছর ধরে বিদেশে অর্থপাচার, ব্যাংকিং ও আর্থিক খাত, বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাত ও শেয়ার বাজারসহ রাষ্ট্রীয় সব ক্ষেত্রে সংঘটিত দুর্নীতি চিহ্নিত করতে একটি কমিশন গঠন বা দুর্নীতি চিহ্নিত করে অতিদ্রুত যথাযথ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ; গত ১৫ বছরে গুমের শিকার সব নাগরিককে উদ্ধার এবং বিচারবহির্ভূত হত্যা ও রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের প্রতিটি ঘটনার দ্রুত বিচারের ব্যবস্থা করে যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বাড়ি-ঘর, উপাসনালয় ভাঙচুর এবং সম্পত্তি দখলের জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া; আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং প্রশাসন ও বিচার বিভাগকে সরকারি হস্তক্ষেপ পরিহার করে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দেওয়া। সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক আমানউল্লাহ আমান। সমাবেশ সঞ্চালনা করেন ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপির সদস্য সচিব আমিনুল হক ও রফিকুল আলম মজনু। শনিবার বেলা ১১টায় সমাবেশ শুরুর কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ের ৪৫ মিনিট আগেই গোলাপবাগ মাঠে সমাবেশ শুরু করে বিএনপি। অন্যান্য বিভাগীয় সমাবেশের মতোই ঢাকার গণসমাবেশেও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের সম্মানে দুটি চেয়ার ফাঁকা রাখা হয়।

জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্যদের জাতীয় সংসদ থেকে পদত্যাগের আহ্বান জানানো হয়েছে বিএনপির ঢাকা বিভাগীয় সমাবেশ থেকে। সমাবেশে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আহমেদ আজম খান বলেন, আমাদের সাত জন এমপি পদত্যাগ করেছেন। জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্যদের বলব আপনারাও পদত্যাগ করুন। পদত্যাগ করে জনগণের কাতারে চলে আসুন।
অ্যাডভোকেট আহমেদ আজম খান বলেন, আগামী নির্বাচনে ভোট হবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে। সরকারকে পদত্যাগ করতে হবে। শেখ হাসিনা ও তার সরকারের পদত্যাগের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হবে। সেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনের নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করবে। তিনি বলেন, মাঠে যে লোক দেখেছেন তার বাইরে আরও ১০ গুণ মানুষ রাস্তায় রয়েছে। আমাদের এমপিরা তাদের সামনে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছে। আমি বলতে চাই, এটি ১০ নম্বর সমাবেশ না, ১০ নম্বর সতর্কতা সংকেত। গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারকে পদত্যাগ করাতে বাধ্য করা হবে। সমাবেশে মহিলা দলের সভাপতি আফরোজা আব্বাস অভিযোগ করেন, প্রতিদিন আওয়ামী লীগের ৫-১০ জন নেতাকর্মী দুই-চারশ পুলিশ নিয়ে তার শাহজানপুরের বাড়ির সামনে ঘোরে। ছাত্রলীগ-যুবলীগের দুই-চারজন গুন্ডা আমাদের বাড়ির সামনে গিয়ে মিছিল করে, ‘মির্জা আব্বাসের চামড়া তুলে নেব আমরা, তারেক রহমানের চামড়া, তুলে নেব আমরা।’ তিনি বলেন, আমি বলতে চাই এত সাহস যদি থাকে, পুলিশ রেখে আসেন দেখাবে কে কার চামড়া তুলে নেয়। প্রতিটি ঘরে ঘরে মির্জা আব্বাস, জিয়াউর রহমান, তারেক রহমান রয়েছে।
এদিকে বিএনপির ঘোষিত ১০ দফা ও ২৪ ডিসেম্বর গণমিছিলের সঙ্গে মিল রেখে একই কর্মসূচি ঘোষণা করেছে জামায়াত। শনিবার (১০ ডিসেম্বর) বিকালে দলের প্রচার বিভাগ থেকে এ তথ্য জানানো হয়েছে। জামায়াত জানিয়েছে, রাজধানী ঢাকার একটি স্থানীয় মিলনায়তনে কেন্দ্রীয় নেতাদের উপস্থিতিতে দেশবাসীর উদ্দেশে বক্তব্য প্রদান ও কর্মসূচি ঘোষণা করেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। জামায়াতের আমির ১০ দফা দাবি উল্লেখ করে আগামী ২৪ ডিসেম্বর রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভাগীয় শহর ও জেলায় জেলায় গণমিছিলের কর্মসূচি ঘোষণা করেন। জামায়াতের আমির ১০ দফা দাবি হচ্ছে-
১. অবিলম্বে সরকারের পদত্যাগ এবং ১৯৯৬ সালে সংবিধানে সংযোজিত ধারা ৫৮-খ, গ ও ঘ এর আলোকে নির্বাচনকালীন দল নিরপেক্ষ একটি অন্তর্বর্তীকালীন কেয়ারটেকার সরকার গঠন করতে হবে।
২. গ্রহণযোগ্য একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠন করবে। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আরপিও সংশোধন, ইভিএম পদ্ধতি বাতিল ও পেপার ব্যালটের মাধ্যমে ভোটের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক ব্যবহার বাতিল করতে হবে।
৩. বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এবং জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীসহ সব বিরোধী দলীয় নেতা-কর্মীর মুক্তি।
৪. অবিলম্বে জামায়াতের অফিস খুলে দেওয়া, নিবন্ধন ও প্রতীক ফিরিয়ে দেওয়া এবং সভা-সমাবেশ ও মত প্রকাশের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
৫. ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮, সন্ত্রাস দমন আইন-২০০৯ এবং বিশেষ ক্ষমতা আইন-১৯৭৪ বাতিল।
৬. বিদ্যুৎ, জ¦ালানি, গ্যাস, সার ও পানিসহ সেবা খাতগুলোতে মূল্যবৃদ্ধির গণবিরোধী সরকারি সিদ্ধান্ত বাতিল করতে হবে।
৭. গত ১৫ বছরব্যাপী বিদেশে অর্থপাচার, ব্যাংকিং ও আর্থিক খাত, বিদ্যুৎ-জ¦ালানি খাত ও শেয়ার বাজারসহ রাষ্ট্রীয় সব ক্ষেত্রে সংঘটিত দুর্নীতি চিহ্নিত করার লক্ষ্যে একটি স্বাধীন শক্তিশালী কমিশন গঠন করতে হবে।
৮. গত ১৫ বছরে গুমের শিকার সব নাগরিককে উদ্ধার করতে হবে এবং বিচারবহির্ভূত হত্যা বন্ধ, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে নির্যাতন বন্ধ ও রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের প্রতিটি ঘটনার আইনানুগ বিচারের ব্যবস্থা করে বিচারিক প্রক্রিয়ায় শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
৯. আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রশাসন ও বিচার বিভাগকে প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালনের উপযোগী করার লক্ষ্যে সরকারি হস্তক্ষেপ পরিহার করে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে।
১০. সীমান্ত হত্যা বন্ধ ও দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং জাতিকে দ্বিধা-বিভক্ত করার ষড়যন্ত্র বন্ধ করে জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে হবে।
প্রসঙ্গত, বিএনপির ঘোষিত ১০ দফার সঙ্গে অনেকটাই হুবহু মিল রেখে দাবি দিয়েছে জামায়াত। সংবাদ সম্মেলনে জামায়াত আমির উল্লেখ করেন, দেশকে আজ ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে উদ্ধারের উপায় হলো জনগণের নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠা করা। আর সেই জন্যই প্রয়োজন দল নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে অবিলম্বে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ব্যবস্থা করা। এই পরিপ্রেক্ষিতে আমরা দেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও জনগণের ন্যায্য অধিকার ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে যুগপৎভাবে গণআন্দেলন গড়ে তুলতে হবে। কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া সেক্রেটারি এবং কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মতিউর রহমান আকন্দের সঞ্চালনায় নেতাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন- নায়েবে আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমান, নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের, ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এটিএম মা’ছুম, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমির ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য নূরুল ইসলাম বুলবুল এবং ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমির ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ জনাব সেলিম উদ্দিন।


আরোও অন্যান্য খবর
Paris