এফএনএস : সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ পুরোপুরি বাস্তবায়ন না হতেই তাতে বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে। সেখানে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের পরিমাণ কমানো হচ্ছে। শিক্ষাগত যোগ্যতায়ও আনা হচ্ছে পরিবর্তন। একই সাথে অজামিনযোগ্য অপরাধকে জামিনের আওতায় আনা হচ্ছে। ফলে সড়ক দুর্ঘটনায় কাউকে নিহত করাসহ সব ধরনের অপরাধ জামিনযোগ্য হবে। বর্তমান আইনের ১০৫ নম্বর ধারায় দুর্ঘটনায় কোনো ব্যক্তি গুরুতর আহত বা নিহত হলে দায়ী ব্যক্তির সর্বোচ্চ ৫ বছরের কারাদণ্ড ও ৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। কিন্তু প্রস্তাবিত সংশোধনীতে আর্থিক ক্ষতিপূরণ পাওয়া থেকে আহতদের বাদ দেয়া হচ্ছে।
আর নিহত ব্যক্তির পরিবারকে ৫ লাখের পরিবর্তে ৩ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতিপূরণের প্রস্তাব করা হচ্ছে। তবে ভুক্তভোগীকে জরিমানার টাকা সম্পূর্ণ বা আংশিক পরিশোধের জন্য আদালত আদেশ দিতে পারবেন। তাছাড়া চালকের সহযোগীও সংশোধনীর খসড়া প্রস্তাবে শিথিল যোগ্যতায় চালক হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। সব মিলিয়ে আইনের ১২৬টি ধারার মধ্যে ২৯টি সংশোধনের প্রস্তাব করা হয়েছে, যার মধ্যে ১৫টি ধারায় বিদ্যমান কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড কমানো হচ্ছে। আর ভারী ও মাঝারি মোটরযানের সংজ্ঞাসহ ৮টি বিষয়ের সংজ্ঞায় পরিবর্তন আনা হচ্ছে। নতুন কয়েকটি ধারাও যুক্ত করা হয়েছে।
প্রস্তাবগুলো গৃহীত হলে নিয়ন্ত্রণহীন গাড়ি বা চালকের অবহেলার কারণে দুর্ঘটনায় শুধু আহত হওয়ার ঘটনা ঘটলে চালককে দায়ী করে বিচার করা যাবে না। আইন মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়। সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, সড়ক আইন সংশোধনের খসড়া অনুযায়ী ওভারলোডিং (গাড়ি মাত্রাতিরিক্ত বোঝাই) এবং মোটরযানের আকার পরিবর্তনের অপরাধকে জামিনযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হবে, যা বর্তমানে অজামিনযোগ্য। আর অষ্টম শ্রেণির পরিবর্তে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকলেই একজন চালক নিবন্ধিত তিন চাকার গাড়ি চালাতে পারবে।
আবার একজন সহকারী বা সুপারভাইজার ১০ বছর কাজ করে যদি দক্ষ হয়ে ওঠে এবং ড্রাইভিং সক্ষমতা বোর্ডে পাস করে, তার ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতাসহ কয়েকটি শর্ত মানা প্রয়োজন হবে না। আর এতোদিন যেখানে নকল ভুয়া বা জাল ড্রাইভিং লাইসেন্স ব্যবহার করলে সর্বনিম্ন ৬ মাস এবং সর্বোচ্চ ২ বছরের কারাদণ্ড ছিল, সেখানে সংশোধনীতে সর্বোচ্চ এক বছরের কারাদণ্ড এবং ২৫ হাজার টাকা অর্থদণ্ডের প্রস্তাব করা হয়েছে। আর কোনো ব্যক্তির ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রত্যাহার করার পরও সে গাড়ি চালালে ২৫ হাজারের পরিবর্তে ১৫ হাজার টাকা জরিমানার বিধান করা হচ্ছে।
তাছাড়া সরকারের নির্ধারিত অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করলে শাস্তিস্বরূপ জরিমানা ও কারাদণ্ড অর্ধেক করা হচ্ছে। চলমান আইন অনুযায়ী অনির্ধারিত জায়গায় গাড়ি পার্ক করলে বা যাত্রী ওঠানামা করলে ৫ হাজার টাকা জরিমানা দিতে হয়। সেখানে প্রস্তাব অনুযায়ী ওই অপরাধের জন্য মাত্র এক হাজার টাকা জরিমানা করা হবে।
সূত্র জানায়, আইনের ৫৭ ধারায় ভুক্তভোগী বা তার পরিবারের সদস্যদের ক্ষতিপূরণ দিতে আর্থিক সহায়তা তহবিল গঠনের বিষয়ে বলা হয়েছে। ওই তহবিলের উৎস হিসেবে নিয়ন্ত্রণহীন চালক ও মোটরযান মালিকের কাছ থেকে আদায় করা জরিমানার কথা উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু সংশোধনের প্রস্তাবে বিষয়টি বাদ দেয়া হয়েছে। সেক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষকে সরকারি তহবিল বা পরিবহন সংগঠনগুলোর দেয়া চাঁদার ওপরই নির্ভর করতে হবে। ২৫(২) ধারা অনুযায়ী ফিটনেসের অনুপযোগী কোনো মোটরযানের ফিটনেস সনদ দেয়ার সঙ্গে কোনো কর্মচারীর সংশ্লিষ্টতা থাকলে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।
প্রস্তাবে সেটি বাদ দিতে বলা হয়েছে। বর্তমানে আইনের ৮৪, ৯৮ ও ১০৫ ধারা অজামিনযোগ্য অপরাধ। কিন্তু আইনটি সংশোধন করা হলে ৮৪ ও ৯৮ ধারার অপরাধ জামিনযোগ্য বলে বিবেচিত হবে। ৮৪ নম্বর ধারায় অবৈধভাবে মোটরযানের আকৃতি পরিবর্তনে শাস্তি কথা বলা হয়েছে। ৯৮ নম্বর ধারায় ওভারলোডিং বা নিয়ন্ত্রণহীনভাবে গাড়ি চালানোর শাস্তি সম্পর্কে বলা হয়েছে। কিন্তু খসড়া অনুযায়ী ৯৮ ধারাকে আপসযোগ্য বলা হয়েছে। আগে ১৪ আসন পর্যন্ত গাড়ি ছিল মাইক্রোবাস শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত, এখন তা ১৬ আসন পর্যন্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
এদিকে সড়ক পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বের বহু দেশেই সড়ক আইনে জরিমানা আরো বেশি আছে। আইনের সব ধরনের দণ্ড কমানো হলো। যদি দণ্ড কমালে দুর্ঘটনা কমে তাহলে কোনো সমস্যা নেই। যদিও সড়ক আইনটি এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। অথচ সংশোধনের জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে। মূলত পরিবহন নেতাদের মন রাখতেই এমনটি করা হচ্ছে। গাড়ির আকার পরিবর্তন দুর্ঘটনার অন্যতম একটি কারণ। আগে ওই অপরাধ অজামিনযোগ্য থাকলেও এখন তাতে জামিন দেয়া হবে। একটি মানুষ জেনেশুনে দোষ করবে অথচ তার শাস্তি কমিয়ে দেয়া হবে তা কেমন যুক্তিসঙ্গত।
অন্যদিকে এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক হোসেন মো. মজুমদার জানা, সড়ক দুর্ঘটনায় দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর পর যে জনরোষের সৃষ্টি হয়েছিল তা সামাল দিতেই সরকার তড়িঘড়ি করে এই আইন পাস করেছিল। যেখানে পুরোপুরি যাচাই-বাছাই করা হয়নি। ফলে কিছু অসংগতি থেকে গিয়েছিল। সেই অসংগতিগুলো এখন দূর করা হচ্ছে।
সড়ক আইনের সংশোধন প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক জানান, অন্ততপক্ষে পার্শ্ববর্তী দেশসহ ৫টি দেশের আইন পর্যালোচনা করে এই সিদ্ধান্তে এসেছি এবং আমাদের যে পেনাল কোড, সেটির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ করার জন্য আমরা এটি করেছি। আপনারা বলছেন অনেক পরিবর্তন, কিন্তু এখানে অনেক পরিবর্তন আনা হয়নি। যেখানে অসংগতি ছিল, যেখানে অস্পষ্টতা ছিল, সেগুলোকে পরিষ্কার করে দেয়া হয়েছে। যাতে এই আইনের অধীনে কেউ অপরাধ করলে আদালতের সাজা দিতে খুব সহজ হয়।