কাগজে ১০ হাজার দিনমজুর, পাড়ে শুধুই ‘ভেকু’
মাহবুবুজ্জামান সেতু, নওগাঁ : দরিদ্র মানুষের জন্য ৪০ দিনের রুটি-রুজির সংস্থান আর স্থানীয় কৃষকের সেচ সুবিধা বাড়াতে নেওয়া হয়েছিল ১ কোটি ৮ লাখ টাকার সরকারি প্রকল্প। সরকারি নির্দেশিকা অনুযায়ী কোদাল-ঝুড়ি হাতে মাঠে নামার কথা ছিল অন্তত ২৫০ জন অতিদরিদ্র দিনমজুরের। অথচ বাস্তবে খালের পাড়ে পড়েনি কোনো শ্রমিকের হাতের আঁচড়। এক্সকাভেটর (ভেকু) দিয়ে মাটি কেটে দায়সারাভাবে খাল চেঁছে ফেলা হলেও কাগজের খাতায় ভূতুড়ে ১০ হাজার শ্রমিকের ‘ঘাম ঝরানো উপস্থিতি’ দেখিয়ে তুলে নেওয়া হয়েছে শ্রমিক মজুরির প্রায় ৫০ লাখ টাকা।
নওগাঁর মান্দায় ১.৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের হারকিশোর মৌজার বিল উথরাইল ব্রিজ হতে বাদলঘাটা ব্রিজ পর্যন্ত খাল পুনঃখননের জন্য ৫৪ লাখ ১১ হাজার ৪৮০ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়; যেখানে ৫৪ লাখ ১ হাজার ১৫৩ টাকা ব্যয় দেখিয়ে ফেরত দেওয়া হয়েছে মাত্র ১০ হাজার ৩২৭ টাকা। অন্যদিকে, ২.১ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের বাঁকাপুর মৌজার বাঁকাপুর দফাদার মোড় মেইন রোড হতে বিল উথরাইল খাল পুনঃখননে ৫৪ লাখ ৬২ হাজার ৯৭৭ টাকা বরাদ্দের বিপরীতে ৫৪ লাখ ৪২ হাজার ৭৭৩ টাকা ব্যয় দেখিয়ে ফেরত দেওয়া হয় মাত্র ৩০ হাজার ৫৩১ টাকা। সরকারি খাতায় সব নিখুঁত দেখানো হলেও বাস্তবে দুটি খাল খননেই দায়সারা কাজ ও ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন ক্ষুব্ধ স্থানীয়রা। সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হলো এমনিতে স্থানীয় রাজনীতিতে দা-কুমড়া সম্পর্ক হলেও ইজিপিপির এই ৫০ লাখ টাকার মালাই কাটতে এক ছাতার নিচে এসে হাত মিলিয়েছেন স্থানীয় বিএনপি ও সদ্য ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী জনপ্রতিনিধিরা।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) কার্যালয় সূত্রের তথ্যমতে, কুসুম্বা ইউনিয়নের বিল উথরাইল ব্রিজ থেকে বাদলঘাটা ব্রিজ এবং ভারশো ইউনিয়নের বাকাপুর দফাদার মোড় থেকে বিল উথরাইল পর্যন্ত মোট ৩.৬ কিলোমিটার খাল পুনঃখননে ৪০ দিন মেয়াদি এই প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হয়। ১ কোটি ৮ লাখ টাকা মোট বরাদ্দের মধ্যে শুধু ২৫০ জন শ্রমিকের দৈনিক ৫০০ টাকা মজুরি বাবদ ধরা ছিল ৫০ লাখ টাকা। বাকি অর্থ বরাদ্দ ছিল ভেকু পরিচালনা, গাছ লাগানো ও সৌন্দর্যবর্ধনে।
তবে অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে জালিয়াতির নগ্ন চিত্র। অতিদরিদ্রের তালিকায় ঠাঁই পেয়েছেন এলাকার সচ্ছল কৃষক, মুদি দোকানদার, প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী এবং দুই রাজনৈতিক দলের ক্যাডাররা।
প্রকল্প এলাকা ঘুরে কথা হয় বাঁকাপুর গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা মোখলেসুর রহমান দেওয়ানের সঙ্গে। খালের পাড় দেখিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “এই পথ দিয়েই তো প্রতিদিন যাতায়াত করি। প্রকল্পের কাজের এক মাসের বেশি সময়ে এক দিনের জন্যও কোনো দিনমজুরকে কোদাল হাতে কাজ করতে দেখিনি। ভেকু দিয়ে তড়িঘড়ি মাটি ছেঁটে পুরো টাকা পকেটে ভরেছে তারা।”
প্রকল্পের তোয়াক্কা না করে এবং কোনো প্রকার জমি অধিগ্রহণ না করেই জোরপূর্বক কৃষকদের ব্যক্তিমালিকানাধীন জমির ওপর দিয়ে চালানো হয়েছে এক্সকাভেটর। ভূক্তভোগী প্রীতি রানী জানান, তার শেষ সম্বল ৫৩ শতক জমি জোর করে খালের পেটে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ করেও প্রশাসনের কাছে পাননি কোনো প্রতিকার। অন্যদিকে, সরকারি নকশা অনুযায়ী খালের গভীরতা ১০ ফুট, তলদেশ ১২ ফুট এবং প্রস্থ ৩০ ফুট করার কথা থাকলেও বাস্তবে অনেক স্থানে খালের তলদেশ আর ফসলি জমির উচ্চতা এক সমান রয়ে গেছে। স্থানীয় কৃষক আনোয়ার হোসেনের আশঙ্কা—কোনো বাঁধ বা কার্যকর পানি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা না থাকায় সামনের বর্ষায় হাজার হাজার বিঘা জমিতে স্থায়ী জলাবদ্ধতা দেখা দেবে, যা এলাকার কৃষি উৎপাদনকে চরম বিপর্যয়ের মুখে ফেলবে।
“রাজনীতিতে যত বিভক্তিই থাকুক না কেন, সরকারি প্রকল্পের টাকা লুটে নেওয়ার বেলায় বিএনপি আর আওয়ামী লীগের নেতাদের মধ্যে কোনো বিভেদ নেই। তারা মিলেমিশে সব গিলে খেয়েছে।”
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক বাসিন্দা। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন অফিস সূত্রে জানা গেছে, নওগাঁ জেলার ১০টি উপজেলায় (সাপাহার উপজেলা বাদে) ১৩টি খাল পুনঃখনন বাবদ মোট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল ৮ কোটি ৭০ লাখ ৩৯ হাজার ৩৯৭ টাকা, যার মধ্যে প্রকৃত ব্যয় হয়েছে ৭ কোটি ৩০ লাখ ৮৪ হাজার ৪১৫ টাকা।
নওগাঁ জেলার ১০টি উপজেলার ১৩টি খাল পুনঃখননে বরাদ্দকৃত ৮ কোটি ৭০ লাখ ৩৯ হাজার ৩৯৭ টাকার মধ্যে প্রকৃত ৭ কোটি ৩০ লাখ ৮৪ হাজার ৪১৫ টাকা ব্যয়ের পর নওগাঁ সদর সর্বোচ্চ ৪১ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং মান্দা সর্বনিম্ন মাত্র ৩০ হাজার ৫০০ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দিয়েছে। নওগাঁর অন্য সব উপজেলা পিআইও যেখানে প্রকৃত উপস্থিতির হিসাব রেখে অবশিষ্ট লাখ লাখ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দিয়েছেন, সেখানে মান্দা উপজেলা পিআইও মো. আরিফুল ইসলাম ৪০ দিনে ১০ হাজার শ্রমিকের মধ্যে ৯ হাজার ৯৩৯ জনকেই ‘উপস্থিত’ দেখিয়ে পুরো টাকা তুলে নিয়েছেন! জালিয়াতি ঢাকতে তিনি মাত্র ৬১ জন শ্রমিক অনুপস্থিত দেখিয়ে সরকারের কোষাগারে ফেরত দিয়েছেন নামকাওয়াস্তে ৩০ হাজার ৫০০ টাকা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ইজিপিপি বাস্তবায়নে গঠিত প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি) সভাপতি কুসুম্বা ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা নওফেল আলী মন্ডল। আর তাঁর প্রধান সহযোগী হিসেবে কাজ করেছেন পাশ্ববর্তী ভারশোঁ ইউনিয়নের আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও আ’লীগ মনোনীত চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান সুমন। পিআইও মো. আরিফুল ইসলামের পরোক্ষ সহায়তায় দুই মেরুর এই দুই রাজনৈতিক প্রতিনিধি আঁতাত করে পুরো ৫০ লাখ টাকা পকেটে পুরেছেন।
অভিযোগ অস্বীকার করে পিআইসি সভাপতি ও ইউপি চেয়ারম্যান নওফেল আলী মন্ডল বলেন, “২৫০ জন শ্রমিকের তালিকা সম্পূর্ণ সঠিক। প্রতিদিন দুই-একজন ছাড়া সবাই উপস্থিত থেকে কাজ করেছেন। সচ্ছল ব্যক্তির নাম হয়তো ভুলবশত এসেছে। আমরা পিআইওর নির্দেশনা অনুসারেই কাজ শেষ করেছি।”
প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. আরিফুল ইসলাম বলেন, “অন্যান্য উপজেলা হয়তো সঠিক ভাবে কাজ করাতে পারেনি বা শ্রমিক উপস্থিত করতে পারেনি, তাই তাদের বেশি টাকা বেঁচে গেছে এবং তারা ফেরত দিয়েছে। কিন্তু মান্দায় আমরা শতভাগ কাজের মান ও শতভাগ হতদরিদ্র শ্রমিকের উপস্থিতি নিশ্চিত করেছি, তাই টাকা কম ফেরত গেছে।”
বিষয়টি নিয়ে মান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বলেন, “খাল পুনঃখনন প্রকল্পে কোনো ধরনের অনিয়ম বা ভুয়া শ্রমিক দেখিয়ে অর্থ আত্মসাতের সুযোগ নেই। যদি লিখিত বা সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়, তবে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।” তবে মাঠে কোনো শ্রমিক না খাটিয়েও কাগজের খাতায় ভূতুড়ে শ্রমিকের ‘শতভাগ উপস্থিতি’ দেখানোর এমন আজব যুক্তিতে হতবাক খোদ জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারাও। স্থানীয় সচেতন সমাজ ও ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা অবিলম্বে সরকারি এই অর্থ আত্মসাতের ঘটনার নিরপেক্ষ বিভাগীয় তদন্ত ও জড়িতদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।
