২৭ জুলাই ২০২৬
বিজ্ঞাপন
Amader Rajshahi

চেয়ারম্যানরাই কোটেশন কাজের বড় ঠিকাদার!

প্রকাশিত: ২৭ জুলাই ২০২৬, ১০:৪৯ অপরাহ্ণ | বিভাগ: রাজশাহী
চেয়ারম্যানরাই কোটেশন কাজের বড় ঠিকাদার!
বিজ্ঞাপন

তানোর থেকে প্রতিনিধি : রাজশাহীর তানোরে ইউনিয়ন পরিষদ ইউপির চেয়ারম্যানরাই উন্নয়ন সহায়তা তহবিল বরাদ্দের কোটেশন কাজের বড় ঠিকাদার বলে অভিযোগ উঠেছে। উন্নয়ন সহায়তা তহবিল বরাদ্দের সিংহভাগ টাকা কোটেশনের নামে চেয়ারম্যান ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তছরুপ করছেন বলে একাধিক সুত্র নিশ্চিত করেন। তারা নানা কায়দা কৌশলে ও সচিবদের মাধ্যমে লাইসেন্স সংগ্রহ করে কাগজে কলমে কোটেশন দেখিয়ে নিম্নমানের কাজ করে থাকেন।
জানা গেছে, গত অর্থ বছরে উপজেলার সাতটি ইউনিয়নে উন্নয়ন সহায়তা তহবিল বরাদ্দ দেয়া হয় দুই কিস্তিতে। এসব বরাদ্দের কাজ করতে হয় কোটেশনে বা টেন্ডারে। কিন্তু চেয়ারম্যান ও তাদের একান্ত মেম্বারেরা এসব বরাদ্দের কথা জানতে পারেন। তাছাড়া চেয়ারম্যানরা কোনভাবেই বরাদ্দের বিষয়াদি বুঝতে দেয় না। চেয়ারম্যানরা নিজেদের পছন্দের কিছু লাইসেন সংগ্রহ করে কাগজে কলমে কোটেশন দেখিয়ে ইচ্ছেমত কাজ করে থাকে। তিন লাখ টাকার কাজ এক লাখ থেকে দেড় লাখে করে বরাদ্দের টাকা তছরুপ করে।
সুত্র জানায়, স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে উন্নয়ন সহায়তা তহবিল বরাদ্দ দেয়া হয়। বরাদ্দ দেয়ার পর কাজ শুরুর আগে কাজের বিবরণ তুলে ধরে সাইনবোর্ড মারতে হবে। যাতে করে জনসাধারণ কাজের বিষয়ে অবগত হতে পারে। আবার কাজের তদারকি করে থাকেন স্থানীয় সরকার বিভাগ এলজিইডি ও ডিডিএলজি। কিন্তু এসব শুধু কাগজে কলমের নিয়ম মাত্র। চেয়ারম্যানরা যা করবেন সেটাই সঠিক। এসব বরাদ্দ অর্থ বছরের শুরু তে দেয়া হয়না। শুকনো মৌসুম পার হলে বর্ষা মৌসুমে দেয়া হয় বরাদ্দ। যার কারনে কাজও হয় নিম্নমানের। এক প্রকল্প একাধিক বার দেখানোরও অভিযোগ রয়েছে।
জানা গেছে, উপজেলায় সাত ইউনিয়নে দুই দফায় বরাদ্দ দেয়া হয়। প্রথম কিস্তির বরাদ্দ পাওয়ার পর কাজ শেষ হলে বা কাজের মাঝে দ্বিতীয় কিস্তির বরাদ্দ দেয়া হয়। গত অর্থ বছরের বরাদ্দ ছাড় হয়েছে চলতি অর্থ বছরে। বিভিন্ন ইউনিয়নে জুন ও তার পরেও কাজ হয়েছে। উপজেলায় সাত ইউনিয়নে ছয় জন আ”লীগ নেতারা চেয়ারম্যান ও একটিতে বিএনপি নেতা চেয়ারম্যান। কলমা ইউনিয়ন ইউপিতে জেলা আ”লীগের সহসভাপতি খাদেমুন নবী বাবু চৌধুরী, বাঁধাইড় ইউনিয়ন পরিষদ ইউপিতে ইউপি আ”লীগ সভাপতি আতাউর রহমান। তিনি বিগত ২০১৬ সাল থেকে চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, পাঁচন্দর ইউনিয়ন পরিষদ ইউপিতে ইউপি আ”লীগ সভাপতি আব্দুল মতিন বিগত ২০১১ সাল থেকে চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তালন্দ ইউনিয়ন পরিষদ ইউপিতে নাজিমুদ্দিন বাবু, তিনি ইউপি আ”লীগের সাবেক সভাপতি, সে ২০২১ সাল থেকে চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। কামারগাঁ ইউনিয়ন পরিষদ ইউপিতে সুফি কামাল মিন্টু, তিনি বিগত ২০২৪ সালের আগে বিনা ভোটে চেয়ারম্যান হন। পরে কর্তৃপক্ষের যোগসাজশে ২০২৪ সালের ৫আগষ্টের পর শপথ নেয়। সরনজাই ইউনিয়ন পরিষদ ইউপিতে আলহাজ্ব মোজাম্মেল হক খান। তিনি ২০২১ সালের নির্বাচনে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। চান্দুড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদ ইউপিতে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মিজানুর রহমান মেজর, সেও ইউনিয়ন আ”লীগ নেতা। বিগত ৫ আগষ্টের গণঅভ্যুত্থানের পর তারা সবাই আত্মগোপনে ছিলেন এবং মামলার আসামীও আছেন কয়েকজন।
বিশেষ করে পাঁচন্দর ও বাধাইড় ইউপি চেয়ারম্যান আতাউর এবং মতিন একচেটিয়া দাপটে ছিলেন। ইচ্ছেমত প্রকল্প লুট করেছেন। এমনকি বিভিন্ন কায়দায় তারা এখনো লুটপাটে ব্যস্ত।
ইউপি সদস্যরা জানান, ইউনিয়ন পরিষদে উন্নয়ন সহায়তা তহবিল বরাদ্দের কোনকিছুই বুঝতে দেয়না চেয়ারম্যান ও সচিব। তারা ইচ্ছেমত প্রকল্প গ্রহণ করেন। দু একজন সদস্যরা জানতে পারলে তাদেরকে কিছু সুবিধা দিয়ে মুখ বন্ধ করে দেয়া হয়। সাত ইউনিয়নের মধ্যে চারটি বড় ইউনিয়ন পরিষদ। চার ইউনিয়নে বরাদ্দের পরিমানও বেশি। সেগুলো হল কলমা, কামারগাঁ, বাঁধাইড় ও পাঁচন্দর। তিনটি ছোট ইউনিয়ন পরিষদ। সেগুলো হল তালন্দ, সরনজাই ও চান্দুড়িয়া।
তালন্দ ইউপির এক সদস্য জানান, এইউপির চেয়ারম্যান লুটপাট ছাড়া কিছুই বুঝেনা। প্রায় দিন পরিষদে চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের মাঝে এসব নিয়ে হট্টগোল লেগেই থাকে। তাকে এসব প্রকল্প নিয়ে বাজারে প্রকাশ্যে পিটিয়েছে। কিন্তু কোন লজ্জা নাই তার। সে মহিলা সদস্যদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখে। কারন মহিলা সদস্যরা কোন প্রতিবাদ করেনা। তাদের কে নামমাত্র সুযোগ সুবিধা দিয়ে থাকে। ইউপির কালনা আদিবাসী পাড়া জেঠা টুডুর বাড়ির সামনের পুকুরে উন্নয়ন সহায়তা তহবিলের বরাদ্দ থেকে তিন লাখ টাকার প্রটেকশন ওয়াল নির্মান করে চেয়ারম্যান নাজিমুদ্দিন বাবু। প্রকল্পের নাম জেঠার বাড়ি থেকে নরেশের বাড়ি পর্যন্ত প্রটেকশন ওয়াল নির্মান। বরাদ্দ ৩ লাখ ৬১ হাজার টাকা, অর্থ বছর ২০২৫-২৬, অর্থের উৎস উন্নয়ন সহায়তা তহবিল, দৈর্ঘ্য ৫০ মিটার প্রস্থ ০.৬৫০ মিটার, সার্বিক সহযোগিতায় চেয়ারম্যান নাজিমুদ্দিন বাবু, বাস্তবায়নে, মেসার্স এ আর কনস্ট্রাকশন বোয়ালিয়া রাজশাহী। স্থানীয়রা জানান, এপ্রটেকশন ওয়াল তিন নম্বর ইটের পরিমান বেশি ছিল। একেবারে দায়সারা কাজ করা হয়েছে। চেয়ারম্যান নিজস্ব মিস্ত্রি দিয়ে কাজ করিয়ে নিয়েছেন। ওয়াল নির্মানে খুব বেশি হলে ১ লাখ টাকা খরচ হবে। প্রতিটি ইউনিয়নে এভাবেই কাজ হয়েছে। কাজ ধরে সরেজমিনে তদন্ত করলেই ভয়াবহ অনিয়ম ধরা পড়বে। চেয়ারম্যান জানান, কাজ শেষ করার পর কাজে ছবি পাঠাতে হয় ডিডিএলজিসহ স্থানীয় সরকার বিভাগের দপ্তরে। ফাঁকি দেয়ার কোন উপায় নাই। কাজ করেছেন আপনি তাহলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নাম কেন জানতে চাইলে তিনি জানান এভাবে কাজ হয়ে থাকে। উপজেলা প্রকৌশলী নুর নাহারের কাছে এসব বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, এসব আমাদের দেখার বিষয় না। বরাদ্দ হয় নির্বাহী দপ্তর থেকে। নির্বাহী অফিসার নাঈমা খানের সাথে কথা বলা হলে তিনি জানান, বিষয় টি সম্পর্কে অবহিত না। গুরুত্বসহকারে দেখা হবে।

পাঠকদের ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন