ইরান কোনো অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি মেনে নেবে না বলে জানিয়েছেন দেশটির উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাঈদ খাতিবজাদেহ। তিনি বলেছেন, ইরান চায় মধ্যপ্রাচ্যের সব সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে একযোগে যুদ্ধের স্থায়ী অবসান ঘটুক। খবর আলজাজিরার। গতকাল শুক্রবার তুরস্কের আন্তালিয়ায় অনুষ্ঠিত ‘আন্তালিয়া ডিপ্লোমেসি ফোরাম’-এর সাইডলাইনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ কথা জানান। খাতিবজাদেহ বলেন, আমরা কোনো অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি গ্রহণ করছি না। তার মতে, লেবানন থেকে লোহিত সাগর পর্যন্ত সব সংঘাতকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি পূর্ণাঙ্গ সমাধানই ইরানের রেড লাইন। তিনি আরও বলেন, চলমান সংঘাতের এই চক্র এখনই শেষ হওয়া উচিত এবং স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করা দরকার। হরমুজ প্রণালি প্রসঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, এটি ঐতিহাসিকভাবে সব সময় উন্মুক্ত রয়েছে। যদিও এটি ইরানের আঞ্চলিক জলসীমার মধ্যে পড়ে, তবুও দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক নৌযান চলাচলের জন্য এটি ব্যবহৃত হয়ে আসছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অঞ্চলজুড়ে অস্থিতিশীলতা তৈরির অভিযোগ তোলেন তিনি। তার দাবি, তাদের পদক্ষেপ বৈশ্বিক বাণিজ্য ও অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
এদিকে, লেবানন ও ইসরাইলের মধ্যে হওয়া ১০ দিনের যুদ্ধবিরতি গতকাল শুক্রবার থেকে কার্যকর হয়েছে। ফলে বাস্তুচ্যুত মানুষজন বাড়িতে ফিরতে শুরু করেছেন। তবে ইতোমধ্যে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ করেছে লেবাননের সেনাবাহিনী। স্থানীয় সময় মধ্যরাতে (গ্রিনিচ মান সময় ২১০০) টা থেকে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরপরই সেনাবাহিনী দক্ষিণ লেবাননের বাসিন্দাদের সতর্ক করে জানায়, তারা যেন এখনই ঘরে না ফেরেন। কারণ হিসেবে তারা ‘ইসরাইলের একাধিক আগ্রাসী কর্মকাণ্ডের’ কথা উল্লেখ করেছে। খবর বার্তা সংস্থা এএফপি’র। তবে বাস্তবে অনেক মানুষ সেই সতর্কতা উপেক্ষা করে দক্ষিণের দিকে রওনা হয়েছে। এএফপি প্রকাশিত ছবিতে দেখা যায়, ভোর হওয়ার আগেই উপকূলীয় সড়কে যাবাহনের দীর্ঘ সারি এবং সূর্য ওঠার সময় মানুষজন যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি সেতু পার হয়ে বাড়ি ফিরছেন। বাস্তুচ্যুত এক নারী আলা দামাশ বলেন, ‘আমাদের কিছুটা অপেক্ষা করতে বলা হয়েছে। কিন্তু নিজের জমি-ঘরের প্রতি ভালোবাসা এবং টান আমাদের ঝুঁকি নিয়েও ফিরে যেতে বাধ্য করেছে।’ ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতের অবসান করতে এই যুদ্ধবিরতি যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর কূটনৈতিক প্রচেষ্টারই অংশ। তেহরান জানিয়েছে, যেকোনো সমঝোতার অংশ হিসেবে লেবাননের যুদ্ধবিরতি অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে। মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ইসলামাবাদ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি আলোচনা পুনরায় শুরু করার আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টায় নেতৃত্ব দিচ্ছে। কোনো চুক্তি হলে সেটি স্বাক্ষর করতে পাকিস্তানে যেতে পারেন বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন এদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি আরও জানান, উভয় পক্ষই সমঝোতায় পৌঁছানোর খুব কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে। যুদ্ধের প্রথমদিকেই মার্কিন-ইসরাইলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি প্রাণ হারান। প্রতিশোধ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ শুরুর মাত্র কয়েকদিনের মাথায় গত ২ মার্চ তেহরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ ইসরাইলে রকেট নিক্ষেপ করে। এতে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে লেবানন। হিজবুল্লাহ নিয়ন্ত্রিত যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপশহরগুলোতে রাতভর গুলির শব্দ শোনা যায়। তবে আপাতদৃষ্টিতে বিষয়টিকে স্বতঃস্ফূর্ত উদযাপনের ঘটনা বলে ধারণা করা হচ্ছে। যদিও বিষয়টি নিশ্চিত করা যায়নি। এদিকে লেবাননের লিতানি নদীর দক্ষিণের উপকূলীয় অঞ্চলের সঙ্গে সংযোগকারী একমাত্র সেতুর কাছে দীর্ঘ যানজট দেখা গেছে। মানুষজন ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে বাড়ি ফেরার চেষ্টা করছে। যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার ঠিক আগে ইসরাইলি বাহিনী জানায়, তারা দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহর ৩৮০টির বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে এবং প্রয়োজনে আবার হামলা শুরু করতে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানান, যুদ্ধবিরতির আগে তিনি ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউনের সঙ্গে কথা বলেছেন। তিনি বলেন, ‘দুই দেশই শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এই যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে।’ট্রাম্প আরও জানান, আগামী চার থেকে পাঁচ দিনের মধ্যে নেতানিয়াহু ও আউন হোয়াইট হাউস সফর করতে পারেন।
ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু বলেন, এই যুদ্ধবিরতি একটি ‘ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তির’ সুযোগ তৈরি করেছে। তবে তিনি শর্ত দেন, হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করতে হবে। লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নওয়াফ সালাম যুদ্ধবিরতিকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, ‘যুদ্ধের শুরু থেকেই এটি ছিল আমাদের প্রধান দাবি’। তবে একটি সূত্র জানায়, ট্রাম্প প্রস্তাবিত নেতানিয়াহুর সঙ্গে সরাসরি ফোনালাপের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছেন লেবাননের প্রেসিডেন্ট। বৈরুতের বাসিন্দা ৬১ বছর বয়সী গৃহিণী জামাল শেহাব বলেন, ‘আমরা খুবই খুশি। আমরা যুদ্ধে ক্লান্ত; এখন নিরাপত্তা ও শান্তি চাই।’ অন্যদিকে, হিজবুল্লাহর এক আইনপ্রণেতা জানান, ইসরাইল হামলা বন্ধ করলে তারা সতর্কভাবে এই যুদ্ধবিরতি মেনে চলবে। যদিও ইসরাইল জানিয়েছে, তারা দক্ষিণ লেবাননে সীমান্তের কাছে ১০ কিলোমিটার বিস্তৃত একটি ‘নিরাপত্তা অঞ্চল’ বজায় রাখবে। যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার ঠিক আগমুহূর্ত পর্যন্ত সহিংসতা চলেছে। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার গাজিয়া শহরে ইসরাইলি হামলায় অন্তত সাতজন নিহত এবং ৩০ জনেরও বেশি আহত হয়েছে। যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার গাজিয়েহ শহরে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত সাতজন নিহত ও ৩০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। ইসরাইলের হাসপাতালের এক মুখপাত্র আরও জানান, বৃহস্পতিবার তিনজন আহত হয়েছেন।-এফএনএস