মোটরযান আইন-সড়ক বিধিমালা মান্যতা নেই
শাহানুর রহমান রানা : চলতি বছরের ২০ অক্টোবর নাটোর বড়াইগ্রাম উপজেলার বনপাড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের সামনে নাটোর-পাবনা মহাসড়কে ঘটে ভয়ঙ্কর সড়ক দুর্ঘটনা। বাস-ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে ১৪ জন নিহত ও অন্তত ৩০ জন আহত হয় সেই দুর্ঘটনায়। অসতর্কতা আর আইন মেনে না চলার কারণে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনা বেশ হতাশাজনক। প্রতিদিন খবরের কাগজের পাতায় মানুষগুলো কেবল একটি সংখ্যা হয়ে বাঁচে, অথচ সেই একেকটি সংখ্যার পেছনে চুরমার হয়ে যায় কত শত পরিবারের বুকভরা আশা।
রাজশাহী থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চলাচলকারি দূরপাল্লার অধিকাংশ বাসগুলোই অমান্য করছে মোটরযান আইন ও সড়ক পরিবহন বিধিমালা। সড়ক নিরাপত্তার নিশ্চয়তাকল্পে নিয়মানুযায়ী দূরপাল্লার বাসের সামনে “সর্বোচ্চ গতি ৮০ কি.মি./ঘণ্টা” লেখা স্মারক স্টিকার থাকার নিয়ম থাকলেও; সেই আইনি বাধ্যবাধকতার মান্যতা নেই রাজশাহী থেকে ছেড়ে যাওয়া ঢাকা-চট্রগ্রামসহ দূরদুরান্তে চলাচলকারি বাসগুলোর। বিগত কয়েকমাস সরেজমিন বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করে এমনই চিত্র ফুঁটে উঠেছে। দু-একটা বাসের সামনে স্মারক স্টিকার থাকলেও; অধিকাংশ বাসে সেটা অনুপস্থিত। বিগত একযুগের সড়ক দূর্ঘটনার চিত্র ও মৃত্যুর দীর্ঘ পরিসংখ্যানই বলে দেয় আইন অমান্য করে বেপোরোয়া গতিতে গাড়ি চালানোর সত্যতার বিষয়টি। সংক্ষেপে বলতে গেলে, এটি কেবল একটি লেখা বা স্মারক স্টিকার নয়, বরং আইনসম্মতভাবে জীবন বাঁচানোর একটি সতর্কবার্তা ও নিয়ম। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, দূরপাল্লার বাসগুলোতে এই স্মারক স্টিকার ও ‘স্পিড গভর্নর সিল’ বা গতি নিয়ন্ত্রক ডিভাইস লাগানোর কথা থাকলেও; অধিকাংশ বাসেই সেটি নেই। নিয়ন্ত্রক ডিভাইস নামের যন্ত্রটি দ্বারা বাসের সর্বোচ্চ গতি ঘন্টায় ৮০ কি.মি. পর্যন্ত লক করে দেয়া হয়। কিন্তু, শুরুতেই যেখানে গলদ; সেখানে চলমানবস্থায় পথিমধ্যে মান্যতার বিষয়টি অনেকক্ষেত্রেই হাস্যকর বলে মন্তব্য নিয়মিত ঢাকাগামী যাত্রী ও সচেতন ব্যক্তিদের। এছাড়াও, বাস মালিক ও শ্রমিকদের চাতুর্য্যপূর্ণ অপকৌশল আর বিআরটিএ কর্তৃপক্ষের অবহেলার কারনে ‘স্পিড গভর্নর সিল’ বা গতি নিয়ন্ত্রক ডিভাইস এর কার্যকারিতা ছিলো প্রায় শূণ্যের কোঠায় বলে মন্তব্য অনেকের।
সংশ্লিষ্টরা জানান, বাংলাদেশের মোটরযান আইন এবং সড়ক পরিবহন বিধিমালা অনুযায়ী, মহাসড়কে বাস, কোচ এবং ট্রাকের জন্য সর্বোচ্চ গতিসীমা ঘণ্টায় ৮০ কিলোমিটার নির্ধারণ করা আছে।
বিআরটিএ রাজশাহী কার্যালয়ে কর্মরতরা জানান, দূরপাল্লার বাসগুলো আকারে অনেক বড় এবং ওজনে ভারী হয়। উচ্চ গতিতে চললে এই বিশাল যানগুলোর নিয়ন্ত্রণ রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। সর্বোচ্চ গতি প্রতিঘন্টায় ৮০ কি.মি’র মধ্যে থাকলে চালকের পক্ষে যেকোনো জরুরি পরিস্থিতিতে ব্রেক চেপে গাড়ি থামানো বা নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হয়। বেশকয়েকজন জৈষ্ঠ্য চালকের সাথে কথা বলে জানা গেছে, গাড়ির গতি যত বেশি হয়, ব্রেক চাপার পর গাড়িটি সম্পূর্ণ থামতে তত বেশি দূরত্বের প্রয়োজন হয়। বাসের গতি ৮০ কিলোমিটারের ওপরে গেলে হঠাৎ ব্রেক করলে গাড়ি উল্টে যাওয়ার বা পেছনের চাকা পিছলে যাওয়ার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
জানতে চাইলে, বিআরটিএ রাজশাহী বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক কামরুল হাসান বলেন, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ ২০২৬ সালের ১ আগস্ট থেকে দূরপাল্লার বাসসহ দেশের সকল গণপরিবহনে ‘জিপিএস ট্র্যাকার বা ট্র্যাকিং ডিভাইস’ ব্যবহার বাধ্যতামূলক করেছে। পূর্বে ব্যবহৃত সনাতন পদ্ধতির ‘স্পিড গভর্নর সিল’ পরিবর্তন কিংবা অকার্যকর করার যে সুযোগ ছিল, আধুনিক এই ডিজিটাল ট্র্যাকিং পদ্ধতির মাধ্যমে সেই ফাঁকি বন্ধ করা সম্ভব হবে। সড়ক নিরাপত্তা বৃদ্ধি এবং গতি ও রুট সেন্ট্রাল সার্ভারের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণের লক্ষ্যেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। গাড়ি পূর্বনির্ধারিত গতিসীমা অতিক্রম করলে সেন্ট্রাল সার্ভারে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অ্যালার্ট বা নোটিফিকেশন চলে যাবে। এর ফলে বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো চালকদের শনাক্ত করা এবং পরবর্তীতে স্বয়ংক্রিয় বা প্রশাসনিক উপায়ে জরিমানা ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কাজটিও পূর্বের চাইতে সহজ হবে। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের সড়কে ৭ হাজার ৯৬৩ শিশু প্রাণ হারিয়েছে। এরমধ্যে পথচারী হিসেবে বাসের চাপায় ২ হাজার ৮১২ শিশু এবং যানবাহনের ভেতরে যাত্রী হিসেবে ২ হাজার ১৯৩ শিশু মারা গেছে।
