আলুর কেজিতে লোকসান ১২-১৫ টাকা, উভয় সংকটে রাজশাহীর চাষি-ব্যবসায়ীরা
মাসুদ রানা : আর মাত্র কয়েক মাস পরেই নতুন আলু বাজারে আসবে। অথচ রাজশাহীর হিমাগারগুলোতে অবিক্রীত পড়ে রয়েছে গত মৌসুমের অর্ধেকেরও বেশি আলু। উৎপাদন ও সংরক্ষণ খরচের তুলনায় বাজারে দাম অর্ধেকেরও কম থাকায় প্রতি কেজিতে ১২ থেকে ১৫ টাকা পর্যন্ত লোকসান গুনছেন চাষি ও ব্যবসায়ীরা। নতুন আলু ওঠার সময় ঘনিয়ে আসা এবং হিমাগার থেকে আলু সরিয়ে নেওয়ার তাগিদে বড় ধরনের মূলধন হারানোর শংকায় এখন পথে বসার উপক্রম হয়েছে তাদের। খুচরা বাজার ঘুরে ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে বাজারে পাইকারি লাল আলু বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ৮ থেকে ১২ টাকায় এবং সাদা আলু বিক্রি হচ্ছে ১১ থেকে ১২ টাকায়। অথচ উৎপাদন খরচ এবং হিমাগারের সংরক্ষণ ব্যয় মিলিয়ে প্রতি কেজি আলুর পেছনে খরচ পড়েছে ২৫ থেকে ২৭ টাকা। অর্থাৎ বিক্রির মাধ্যমে বিনিয়োগকৃত অর্থের অর্ধেকও তুলতে পারছেন না তারা।
হিমাগারগুলোতে চাপ : রাজশাহী জেলায় বর্তমানে মোট ৩৬টি হিমাগার বা কোল্ড স্টোরেজ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, এসব হিমাগারে এখনো ৫০ শতাংশের বেশি আলু অবিক্রীত অবস্থায় পড়ে আছে। সাধারণত নভেম্বরের ৩০ তারিখ পর্যন্ত হিমাগারে আলু সংরক্ষণের নির্ধারিত সময়সীমা থাকে। তবে চাষি ও ব্যবসায়ীদের চরম দুর্ভোগের কথা বিবেচনা করে অনেক হিমাগার কর্তৃপক্ষ তা বাড়িয়ে ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্ধারণ করেছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আলু না সরালে সেগুলোর ব্যাপারে নিলামে বিক্রি অথবা ফেলে দেওয়ার মতো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন হিমাগার কর্তৃপক্ষ। এতে করে একদিকে যেমন বাজারমূল্য না পাওয়ার শঙ্কা রয়েছে, অন্যদিকে সংরক্ষিত আলু হারানোরও ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। পবা উপজেলার তকিপুর এলাকার ‘আসমা কোল্ড স্টোরেজ’-এর ম্যানেজার আশরাফ আলী জানান, তাদের হিমাগারের ১ লাখ ৪০ হাজার বস্তা ধারণক্ষমতার বিপরীতে বর্তমানে প্রায় ৫৬ হাজার বস্তা আলু মজুত রয়েছে। ব্যবসায়ীদের কথা চিন্তা করেই সময়সীমা বাড়িয়ে ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়েছে এবং দ্রুত আলু খালাস করতে নোটিশ দেওয়া হচ্ছে। ‘রহমান স্পেশাল কোল্ড স্টোরেজ’-এর ম্যানেজার আব্দুল খালেক জানান, তাদের ৫ লাখ ৭৫ হাজার বস্তা ধারণক্ষমতার বিপরীতে বর্তমানে ২ লাখ ৪৫ হাজার বস্তা আলু সংরক্ষিত রয়েছে। নির্দিষ্ট সময়ের আগেই ব্যবসায়ীরা তাদের পণ্য সরিয়ে নেবেন বলে তারা আশা করছেন।
চাষি ও ব্যবসায়ীরা বিপদে : পবা উপজেলার বায়া এলাকার আলু ব্যবসায়ী হেলাল আলী আক্ষেপ করে বলেন, “হিমাগার কর্তৃপক্ষ ডিসেম্বরের মধ্যে আলু নিয়ে যেতে বলেছে। কিন্তু বাজারে আলুর কোনো দাম নেই।স্টোরেজে এখনো আমাদের ৬০ শতাংশ আলু পড়ে আছে। বর্তমান দামে বিক্রি করলে খরচ উঠবে না, আবার না বের করলে হিমাগার থেকে জোরপূর্বক সরানোর চাপ। আমরা দুই দিক থেকেই সর্বস্বান্ত হওয়ার পথে। তানোর উপজেলার আলুচাষি রহিম আলী বলেন, “২০০ বস্তা আলুর মধ্যে স্টোরে এখনো ১২০ বস্তা পড়ে আছে। হাতে সময় মাত্র এক মাস। এই স্বল্প সময়ে এত আলু কোথায় বিক্রি করব? লাভের আশায় কষ্টের জমানো টাকা খরচ করেছিলাম, এখন আসল টাকাই উঠছে না। এভাবে চলতে থাকলে আগামী মৌসুমে কীভাবে চাষাবাদ করব, সেই চিন্তায় ঘুম আসছে না।”
ভবিষ্যতের শঙ্কা : রাজশাহী জেলা আলু ও কাঁচামাল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ইফতেখারুল ইসলাম ডনি জানান, বিগত দুই বছর ধরে আলু চাষিরা ধারাবাহিকভাবে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। বর্তমান বাজারে আলুর পাইকারি ও খুচরা দাম ১০ থেকে ১৪ টাকার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। এর ওপর হিমাগার থেকে আলু বের করার সময় পচনের কারণে আরও অনেক আলু বাদ দিতে হয়, যা প্রকৃত আয়কে আরও কমিয়ে দেয়। আলু বিদেশে রপ্তানির মাধ্যমে সংকট কাটানোর সুযোগ আছে কি না—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, “আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং রপ্তানিযোগ্য মানের আলুর ঘাটতির কারণে এই স্বল্প সময়ে তা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।” তিনি আরও বলেন, টানা লোকসানের মুখে পড়ে এবার মূলধন হারিয়েছেন অনেক ব্যবসায়ী ও চাষি। যার ফলে আসন্ন মৌসুমে রাজশাহী অঞ্চলে আলুর আবাদ উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
