২৬ অক্টোবর ২০২৬
বিজ্ঞাপন
Amader Rajshahi

দেশে ধারাবাহিকভাবে বেড়েই চলেছে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা

প্রকাশিত: ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১০:২৪ অপরাহ্ণ | বিভাগ: জাতীয়
দেশে ধারাবাহিকভাবে বেড়েই চলেছে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা
বিজ্ঞাপন

দেশে ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা। মূলত উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে প্রকৃত আয় কমে যাওয়া এবং কর্মসংস্থানে ভাটাসহ নানা কারণে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। গত চার বছরে দেশে নতুন করে দরিদ্র হয়েছে ৮০ লাখ মানুষ। বর্তমানে প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার কিছুটা ওপরে থাকলেও প্রাকৃতিক দুর্যোগ, জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়াসহ যেকোনো অর্থনৈতিক ধাক্কায় তারাও দরিদ্র হয়ে যেতে পারে। বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট প্রতিবেদনে বাংলাদেশের দারিদ্র্য পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য পাওয়া যায়। বিশ্বব্যাংকের মতে, টানা চার বছর ধরে এদেশে দারিদ্র্য হার বাড়ছে। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন, বিবিএস এবং বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, মূলত খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থানের মতো মৌলিক চাহিদা পূরণের ব্যয় ধরে বিবিএস দারিদ্র্য পরিমাপ করে। একজন মানুষের দৈনিক গড়ে ২ হাজার ১২২ ক্যালরি খাদ্যগুণসম্পন্ন খাবার কিনতে এবং খাদ্যবহির্ভূত খরচ মেটাতে যত টাকা প্রয়োজন হয়, ওই টাকা আয় করতে না পারলেই ওই ব্যক্তিকে দরিদ্র হিসেবে ধরা হয়। তবে খাবারের দাম এলাকাভেদে ভিন্ন হয়।
সূত্র মতে, বাংলাদেশে বিগত ২০০১ সালে প্রায় অর্ধেক মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করতো। তখন ৪৮ দশমিক ৯ শতাংশ ছিলো দারিদ্র্যের হার। তবে পরের দুই দশকে বাংলাদেশ দারিদ্র্য বিমোচনে বেশ সফল হয়। ফলে ২০২২ সালে দারিদ্র্য হার ১৮ শতাংশে নেমে আসে। কিন্তু গত দুই দশকে যে ধারাবাহিকভাবে দারিদ্র্য কমেছে, ২০২২ সালের পর ওই পরিস্থিতি পাল্টে যেতে শুরু করে। তখন দারিদ্র্র্য হার কমার পরিবর্তে বাড়তে থাকে। বিবিএসের জনশুমারি অনুসারে বিগত ২০২২ সালে দেশের জনসংখ্যা ছিল ১৬ কোটি ৯৮ লাখ। তখন পরিবারের সংখ্যা ছিল ৪ কোটি ১০ লাখ। জনসংখ্যার ওই হিসাব বিবেচনায় দেশে এখন কমপক্ষে পৌনে ৫ কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে। কারণ তিন বছরে জনসংখ্যাও বেড়েছে। আর বিশ্বব্যাংকের হিসাব বিবেচনায় নিলে দেশে এখন দরিদ্র মানুষের সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৫ কোটি।
সূত্র আরো জানায়, বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুসারে বিগত ২০২২ সালে দেশের দারিদ্র্য হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। ২০২৩ সালে তা বেড়ে ১৮ দশমিক ৯ শতাংশে দাঁড়ায়। ওই বছর নতুন করে ৮ লাখ মানুষ দরিদ্র হয়েছে। ২০২৪ সালে দারিদ্র্য হার সাড়ে ২০ শতাংশ হয়। ওই বছর নতুন করে মোট ৩৭ লাখ মানুষ দরিদ্র হয়। আর ২০২৫ সালে দারিদ্র্য হার আরো বেড়ে ২১ শতাংশ ছাড়ায়। ওই বছর নতুন দরিদ্রের সংখ্যা ১৪ লাখ। আর চলতি ইতিমধ্যে বছর ২১ লাখ নতুন করে গরিব হয়েছে। ফলে দেশে দারিদ্র্য হার সাড়ে ২২ শতাংশে পৌঁছেছে। তবে চলতি অর্থবছর শেষে দারিদ্র্য হার আরো বেড়ে ২২ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে। তখন আরও কয়েক লাখ মানুষ দরিদ্র হবে। বিগত চার বছর ধরেই এদেশে আয়বৈষম্য বাড়ছে। যদিও আগামী অর্থবছরে প্রায় ৬ লাখ ৩০ হাজার নিট কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে। কিন্তু ওই কর্মসংস্থান দ্রুত দারিদ্র্য কমানোর জন্য যথেষ্ট হবে না। তাছাড়া প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ এখন দারিদ্র্যসীমার একটু ওপরে বসবাস করলেও যেকোনো অর্থনৈতিক ধাক্কায় তারা দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যেতে পারে। মূলত বন্যাসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ, কাজের সুযোগ সীমিত হলে, চালসহ নিত্যপণ্যের দাম হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় অনেকেই দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাচ্ছে। কারণ আয়ের সুযোগ কমে যাওয়ায় বিপুলসংখ্যক মানুষ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
এদিকে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা সংশ্লিষ্টদের মতে, এদেশে সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা এখনো মূলত দরিদ্র হয়ে যাওয়ার পর সীমিত সহায়তা দেয়ার মধ্যে আটকে রয়েছে। কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারকে আগেই সুরক্ষা দেয়া, সামাজিক বিমা ও আয়-ঝুঁকি মোকাবিলার ব্যবস্থা দুর্বল। ফলে দারিদ্র্যের বৃদ্ধি শুধু সাময়িক সংকট নয়, বরং প্রবৃদ্ধির গুণগত দুর্বলতা ও শ্রমবাজারের গভীর সমস্যার প্রকাশ। সেক্ষেত্রে শুধু জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার নয়, বরং ওই প্রবৃদ্ধি কতটা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে, প্রকৃত আয় বাড়াচ্ছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ মানুষকে সুরক্ষা দিচ্ছে তা-ই এখন নীতির প্রধান বিবেচনা হওয়া জরুরি।
অন্যদিকে এ প্রসঙ্গে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান জানান, বাংলাদেশের দারিদ্র্য পরিস্থিতির একটি উদ্বেগজনক চিত্র বিশ্বব্যাংক তুলে ধরেছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিশেষ করে খাদ্যপণ্যের দামের চাপ, প্রকৃত মজুরির ক্ষয়, দুর্বল বেসরকারি বিনিয়োগ এবং পর্যাপ্ত উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান না হওয়ায় নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ভেঙে পড়ছে। অধিকাংশ কর্মসংস্থান অনানুষ্ঠানিক হওয়ায় চাকরি হারানো, অসুস্থতা বা নতুন মূল্যবৃদ্ধির মতো একটি ধাক্কাই অনেক পরিবারকে দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিতে পারে।-এফএনএস

 

পাঠকদের ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন