সোনালী আঁশে লাভবান রাজশাহীর কৃষক
ফারুক আহমেদ : রাজশাহীর বাগমারা, মোহনপুর, দুর্গাপুর, পুঠিয়া, তানোর, গোদাগাড়ী, পবা, বাঘা, চারঘাট উপজেলার বিভিন্ন হাটবাজারে ও পাটের আড়ত গুলোয় জমজমাট হয়ে উঠছে সোনালী আঁশ পাট কেনাবেচা। পাট চাষী কৃষকেরা তাদের সোনালী আঁশ পাট বাজারে ক্রয় – বিক্রয় করার জন্য হাটে নিয়ে আসছেন এবং ভালো দাম পাচ্ছেন। বেশ কয়েক বছর পর সোনালী আঁশ পাটের দাম ভালো পেয়ে কৃষকরা খুশি এবং স্বস্তিতে আছেন। গত কয়েক বছর ধরে পাটের ভালো দাম না থাকায় কৃষকরা ব্যাপক হারে লোকসানের মুখে পড়েছিলেন পাট চাষাবাদ করে। এখন কৃষকরা সোনালী আঁশ পাট চাষ করে লাভবান হচ্ছেন। বাগমারার ভবানীগঞ্জ, তাহেরপুর, মচমইল, হাট গাঙ্গোপাড়া, দামনাশ,দুর্গাপুর সদর, পবার বিখ্যাত পাটেরহাট নওহাটা সহ বিভিন্ন হাট-বাজার ও পাটের আড়তে সপ্তাহ দুয়েক ধরে হাট বাজারগুলোতে নতুন পাট উঠতে শুরু করেছে। গত বছরের তুলনায় এবার মণপ্রতি প্রায় এক হাজার টাকা বেশি দামে পাট বিক্রি করছেন কৃষকরা। এতে পাটচাষিদের মুখে হাসি ফুটেছে।গত বছরের শুরুতে নতুন পাট বিক্রি হয়েছে ২ হাজার ৭০০ থেকে ২ হাজার ৯০০ টাকা মণ দরে। এবার কৃষকরা নতুন পাট বিক্রি করছেন মণপ্রতি ৪ হাজার ২০০ থেকে ৪ হাজার ৬০০ টাকায়। এবার প্রতি মণে বাড়তি পাওয়া যাচ্ছে ১২শত থেকে ১৬শত টাকা। সামছুল নামে একজন বলেন, ‘এবার পাটের ফলনও ভালো হইছে, আবার দামও ভালো। এবার নতুন পাট বেইচ্যা মণে ১২/১৬শত টাকা লাভ পাইতাছি। তয় এমন ভালো দাম কয়দিন থাকে কিডা জানে।’উপজেলা কৃষি কার্যালয় ও স্থানীয় কয়েকজন কৃষকের সূত্রে জানা যায়, তাহেরপুর মচমইল, হাটগাঙ্গোপাড়া হাটে ও নওহাটা এবং পাটের আড়ত গুলোয় ও উপজেলায় এবার কয়েক হাজার হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। অনুকূল আবহাওয়ায় এবার প্রতি বিঘায় গড়ে ৯ মণ ফলন পাওয়া গেছে। এ ছাড়া গত বছর পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হওয়ায় পাট জাগ দেওয়া নিয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েন কৃষকরা। কিন্তু এবার পর্যাপ্ত বৃষ্টি হওয়ায় তেমন পরিস্থিতি হয়নি।তবে কৃষকদের অভিযোগ, গত বছরের তুলনায় এবার পাটের উৎপাদন খরচ বেড়েছে। বিশেষ করে এবার শ্রমিকপ্রতি খরচ বেশি পড়েছে। গত বছর দৈনিক ৭০০ টাকা মজুরিতে শ্রমিক পাওয়া গেছে; কিন্তু এবার পাট কাটা, জাগ দেওয়া ও ছাড়ানো বাবদ শ্রমিকপ্রতি দৈনিক ৮০০-৯০০ টাকা মজুরি দিতে হচ্ছে। এতে গত বছরের তুলনায় এবার পাট চাষের খরচ প্রতি মণে দেড় থেকে তিনশ টাকা বেড়েছে। গত বছর যেখানে প্রতি মণ পাটের উৎপাদন খরচ আড়াই হাজার টাকার কাছাকাছি ছিল, এবার তা বেড়ে ২ হাজার ৮০০ থেকে ৩ হাজার টাকা হয়েছে।শুক্রবার ও সোমবার এই দুই দিন উপজেলার তাহেরপুর ও মচমইলে সাপ্তাহিক পাটের হাট বসে। এই হাটসহ উপজেলার বিভিন্ন হাটে দুই সপ্তাহ ধরে পাটের কেনাবেচা হচ্ছে। যেসব কৃষক মৌসুমের শুরুর দিকে পাটের আবাদ করেছিলেন, তারাই আগে এসব বিক্রি করতে পারছেন। ফলে হাটগুলোতে চোখে পড়ার মতো পাটের সরবরাহ হয়নি।তাহেরপুর, মচমাইল ও হাটগাঙ্গোপাড়া হাটে পাট কিনতে যান উপজেলার পৌরসভার গ্রামের ব্যবসায়ী আবুল হোসেন। তিনি বলেন, এখন যত দিন যাবে, হাটে পাটের সরবরাহ ততই বাড়বে। তবে মৌসুমের শুরু হিসেবে হাটে মোটামুটি ভালোই পাটের সরবরাহ দেখা যাচ্ছে। সপ্তাহখানেক আগে পাটের দাম (মণপ্রতি) ৪ হাজার ৪০০ টাকায় উঠেছিল। সে তুলনায় গতকালের হাটে মণে এক থেকে দেড়শ টাকা বেড়েছে। যে দামে পাট বিক্রি হচ্ছে, তাতে কৃষক খুশি মনে বাড়ি ফিরছেন। তবে আগামী দিনে সরবরাহ বাড়লে পাটের দাম পড়ে যাবে কি না, এমন আশঙ্কায় আছেন কৃষক কুদ্দুস মিয়া, সালাম, হোসেনসহ পাঁচ-ছয় কৃষক। তারা জানান, বর্তমান দামে কৃষক খুশি হলেও আগামী দিনগুলোতে সরবরাহ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দাম কমে যাবে কি না, তা নিয়ে চিন্তায় আছেন। এখন বেশির ভাগ কৃষকই অল্প অল্প করে পাট কেটে সেই পাট জাগ দিয়ে ও শুকিয়ে বাজারে আনছেন। বাকি পাট বাজারে আনতে আরও দুই থেকে তিন সপ্তাহ লাগবে। অনেকের আবার এর চেয়েও বেশি দেরি হবে। কৃষক ভালো দাম পেলে আরও বেশি জমিতে পাট চাষে আগ্রহী হবেন বলে জানান, বাগমারা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ড. আব্দুর রাজ্জাক। তিনি বলেন, বাগমারা ১ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে পাট চাষের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও চলতি মৌসুমে তোসা জি আর ৫২৪(ভারতীয়) ও মাস্তে ও ৯৮৯৭বেশি জাত মিলিয়ে লক্ষ্যমাত্রা চেয়ে বেশি জমিতে বেশি জমিতে পাট চাষ হয়েছে। রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর জেলার বাঘা উপজেলায় ৪ হাজার ৯ ৫০ হেক্টর, চারঘাটে ৩ হাজার ১৫০, গোদাগাড়িতে ৮৭৫, বাগমারায় ১ হাজার ৫১০, পুঠিয়ায় ৩ হাজার ২২০, তানোরে তিন হাজার, ও পবায় ২ হাজার ৯০, দুর্গাপুরে ১ হাজার ৫০০, মোহনপুরে ৫০এবং রাজশাহী মহানগর এলাকায় ৭০০০ হেক্টর সহ মোট ১৭ হাজার ৩৫৫ হেক্টর জমিতে কৃষকরা সোনালী আঁশ পাট চাষাবাদ করেছেন। তিনি বলেন, ‘আবহাওয়া, ফলন ও দাম অনুযায়ী এবার কৃষক পাটচাষে লাভজনক অবস্থায় আছেন। আমাদের হিসাবে বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী প্রতি মণে কৃষকের ১২/১৬শত টাকার বেশি লাভ হচ্ছে। তবে এখনো হাটে পাটের সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। তিন-চার সপ্তাহ পরে সরবরাহ স্বাভাবিক হলে বোঝা যাবে দাম কোথায় গিয়ে দাঁড়াল।’
