স্টাফ রিপোর্টার : পদ্মা নদীতে অস্বাভাবিকভাবে পানি বৃদ্ধির ফলে রাজশাহী শহরের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে হাজারো পরিবার জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। গতকাল বুধবার সকালে রাজশাহীতে পদ্মার পানি বিপৎসীমার ৭৯ সেন্টিমিটার নীচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে, উজান থেকে আসা ঢলের কারণে পদ্মায় পানি বেড়েছে, আরো বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
পাউবো সূত্রে জানা গেছে, ‘রামপুর-বোয়ালিয়া, রাজশাহী’ স্টেশনে মঙ্গলবার সকাল ৬টায় পদ্মার পানি ছিল ১৭ দশমিক ৫৯ মিটার উচ্চতায়। বেলা ৩টায় এই পানি ৪ সেন্টিমিটার বেড়ে ১৭ দশমিক ৬৩ সেন্টিমিটার উচ্চতায় ওঠে। গতকাল বুধবার সকাল ৬টায় তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৭ দশমিক ৭১ সেন্টিমিটার। রাজশাহী পাউবোর হাইড্রোলজি বিভাগের পানি পরিমাপক এনামুল হক বলেন, উজানে ঢলের কারণে পদ্মায় পানি বাড়ছে। আগস্ট মাসজুড়েই পানি এভাবে বাড়তে পারে বলে ধারণা করছেন তিনি।
পদ্মা নদীতে পানি বেড়ে যাওয়ার কারণে তীরবর্তী নিচু এলাকার বাসিন্দাদের বাড়িতে পানি ঢুকে পড়েছে। নগরের রানিনগর এলাকায় অবস্থিত প্রথম আলো ট্রাস্ট পরিচালিত আলোর পাঠশালার মাঠ সম্পূর্ণ প্লাবিত হয়েছে। গতকাল দুপুরে ওই এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সেখানে প্রায় হাঁটুপানি। বিদ্যালয়ের পাশে জরিনা বেগমের বাড়িতে কোমরপানি। তাঁর পরিবারের সদস্যদের নৌকায় করে বাড়ির মালামাল অন্যত্র সরিয়ে নিতে দেখা যায়।
নগরের ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আরমান আলী বলেন, পঞ্চবটি এলাকা থেকে হাদির মোড় পর্যন্ত তাঁর ওয়ার্ডের প্রায় দুই হাজার পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। তারা মানবেতর জীবন যাপন করছে। পদ্মা নদীর ধারে ঝালমুড়ি বিক্রি করে সংসার চালাতেন রাবেয়া বেগম (৫৫)। তিনি বলেন, খাওয়ার যেমন কষ্ট, তার চেয়ে বড় কষ্ট ঘুমানোর। সারা রাত বসেই কাটাতে হয়। পানি বাড়লে বিপদও বাড়বে। তখন কীভাবে চলবেন, বুঝতে পারছেন না।
রাজশাহী নগরের কেশবপুর এলাকায় দেখা যায়, নৌকায় করে বালু ভর্তি বস্তা এলে বাঁধের পাশে ফেলা হচ্ছে। মনজুর রহমান নামের এক ব্যক্তির বাড়ির সামনে বালুর বস্তা ফেলা হচ্ছিল। মনজুর বলেন, এই এলাকায় বাঁধ করা হয়েছে ২০০০ সালে। পদ্মায় পানি এসে স্রোতের ধাক্কা খাওয়ায় পুরনো এসব বাঁধ এখন নিচের দিকে নেমে যাচ্ছে। বাঁধের দেবে যাওয়া ঠেকাতে বালুর বস্তা ফেলা হচ্ছে। এদিকে, রাজশাহী নগরীর ওপারে চর খিদিরপুর এলাকা এখনও ভাঙছে। এলাকার বাসিন্দারা ঘরবাড়ি ভেঙ্গে নিয়ে নৌকায় করে এপারে আসছেন। রাজশাহীর বাঘা এবং গোদাগাড়ী উপজেলায় পদ্মার ওপারের চর ভাঙছে। নতুন করে গোদাগাড়ীর নিমতলা এলাকায় পদ্মার এপার ভাঙছে। এই এলাকাটি আগে কখনও ভাঙেনি। এবার ভাঙন দেখে এলাকাবাসী উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছেন। কয়েকদিন আগে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জানে আলম এলাকাটি পরিদর্শন করেছেন।
পাউবোর রাজশাহীর উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী রিফাত করিম বলেন, রাজশাহী নগরীর ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে বালুর বস্তা ফেলা হচ্ছে। টি-গ্রোয়েন এবং আই বাঁধ ও কেশবপুর এলাকায় এই কাজ এখন শেষ পর্যায়ে। তালাইমারী শহিদ মিনারের যে এলাকায় পানি ঢুকেছে সেখানে প্রতিরক্ষামূলক কিছু করার উপায় নেই। পদ্মার ওপারের চর খিদিরপুরেও কিছু করার নেই। তবে বাঘার ভাঙন রোধে প্রকল্প নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন রিফাত করিম। তিনি আরো জানান, গোদাগাড়ীর নিমতলা এলাকাটি নতুন করে ভাঙতে শুরু করায় এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। সেখানে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের জন্য প্রকল্প নেওয়া হবে। এখন জরুরি ভিত্তিতে কিছু কাজ করে এলাকার ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা চলছে।
এদিকে এফএনএস জানায়, পদ্মা নদীতে অস্বাভাবিকভাবে পানি বৃদ্ধির ফলে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার চরাঞ্চলের রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়ন এবং চিলমারী ইউনিয়নের প্রায় ১৭টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে ওই অঞ্চলের প্রায় ২৫ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। বেশিরভাগ জমির ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। এসব বন্যা কবলিত এলাকায় দেখা দিয়েছে খাবার ও পানির অভাব। কুষ্টিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, বেশ কয়েকদিন ধরে পদ্মা নদীর পানি বেড়েছে। গত মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টায় কুষ্টিয়ার হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে পানি প্রবাহের মাত্রা ছিলো ১৩ দশমিক ৭৮ সেন্টিমিটার। যেখানে বিপৎসীমা ১৪ দশমিক ২৫ সেন্টিমিটার। গত মঙ্গলবার হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে বিপৎসীমার দশমিক ৪৭ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।
গতকাল বুধবার সকাল ৬টায় কুষ্টিয়ার হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে পানি প্রবাহের মাত্রা ছিলো ১৩ দশমিক ৮৮ সেন্টিমিটার। যা বিপৎসীমার দশমিক ৩৭ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। কুষ্টিয়ার পদ্মানদীর চর অঞ্চল ও পদ্মাপাড় ঘেষা রামকৃষ্ণপুর এবং চিলমারী ইউনিয়ন। পদ্মায় পানি বৃদ্ধির ফলে দুই ইউনিয়নের প্রায় ১৭টি গ্রামের মানুষেরা পানিবন্দি হয়ে পেড়েছে। ডুবে গেছে কয়েক হাজার একর জমির উঠতি ফসল। এতে তাদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। বানভাসী মকছেদ আলী জানান, পানিতে বাড়ি ঘরে থাকতে পারছি না। ঘরের মধ্যে পানি ঢুকে গেছে। মাঠের পাট কাটতে পারছি না। কাঁচা মরিচের ক্ষেত তো সব নষ্ট হয়ে গেছে। আমাদের এখানে খাবারের সমস্যা, খাবার পানি ও ওষুধের সমস্যা বেশি।
আরেকজন আকুবার আলী জানান, পানির কারণে কোথাও যেতে পারছি না। কেউ অসুস্থ হলে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে পারছি না। আমরা চরের মানুষ পানিতে ডুবে মানবেতর জীবনযাপন করছি। শরিফা খাতুন জানান, পানিতে রান্নাঘর, টয়লেট, টিউবওয়েল ডুবে রয়েছে। ঘরের মধ্যে কোনরকমে রান্না করছি সিমেন্টের চুলা দিয়ে। পানির কারণে সাপ দেখা যাচ্ছে মাঝে মাঝে। সাপ আতঙ্কে রয়েছি। সেই সঙ্গে শুকনো খাবারের সংকট দেখা দিয়েছে। রফিকুল ইসলাম জানান, পানিবন্দি হয়ে আমরা খাবারের অভাবে খুবই কষ্টে আছি। সরকার এবং বিত্তবান মানুষ আমাদের পাশে এগিয়ে না এলে আমরা না খেতে পেয়ে মারা যাবো।
রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সিরাজ মণ্ডল জানান, ১৭টি গ্রামের ৬০ ভাগ বসত বাড়ি পনিতে তলিয়ে গেছে। এতে প্রায় ২৫ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। তাদের কাজের অভাব, খাদ্যের অভাব দেখা দিয়েছে। বেশিরভাগ মাঠের ফসল তলিয়ে গেছে। এতে তাদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। এসব বানভাসিদের মধ্যে জরুরি ভিত্তিতে ত্রাণ তৎপরতা শুরু অনুরোধ জানান। দৌলতপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শারমিন আক্তার জানান, রামকৃষ্ণপুর এবং চিলমারী ইউনিয়নের বেশকিছু এলাকার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ইতোমধ্যে আমরা এলাকা পরিদর্শন করে জেলা প্রশাসকের কাছে রিপোর্ট দিয়েছি। খুব শিগগিরই আমরা ত্রাণ নিয়ে বন্যা কবলিত মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়াবো।