আরা ডেস্ক : সারাদেশে প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি চলছে। এই মুহূর্তে সারাদেশে সংক্রমণের শীর্ষে অবস্থান করছে ঢাকা জেলা। আর সবচেয়ে কম সংক্রমিত হয়েছে রাজশাহী জেলায়। গত জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসের নমুনা পরীক্ষা ও রোগী শনাক্তকরণের হার বিবেচনায় এ তথ্য জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। গতকাল বুধবার দুপুরে স্বাস্থ্য অধিদফতরের নিয়মিত করোনা বুলেটিনে এই তথ্য জানান অধিদফতরের মুখপাত্র ও লাইন ডিরেক্টর অধ্যাপক ডা. নাজমুল ইসলাম। তিনি বলেন, ঢাকা জেলায় এখন পর্যন্ত করোনা শনাক্ত হয়েছে ৪ লাখ ১৯ হাজার ১২৮ জন।
ঢাকার পরে অবস্থান বন্দরনগরী চট্টগ্রামের। সেখানে এখন পর্যন্ত ৭৪ হাজার ১৯৩ জন রোগী শনাক্ত হয়েছেন। আর সবচেয়ে কম রোগী এখন পর্যন্ত শনাক্ত হয়েছেন রাজশাহীতে। সেখানে মোট ১৮ হাজার ৮০৮ জন রোগী আমরা শনাক্ত করতে পেরেছি। নাজমুল ইসলাম বলেন, আমরা যদি রোগী সংখ্যা এবং মৃত্যুর সংখ্যা পাশাপাশি রাখি তাহলে বরিশাল বিভাগের শনাক্ত রোগীর বিপরীতে মৃত্যুর হার ২ শতাংশ। ঢাকায় সেটি ১.৩ শতাংশ, রংপুর বিভাগে ২.৪ শতাংশ। তিনি আরও বলেন, গত ২৩ জুলাই থেকে দেশে কঠোর বিধিনিষেধ চলছে, সেক্ষেত্রে সংক্রমণ প্রতিরোধে সবাইকে দায়িত্ববান হতে হবে।
আমাদের সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে এবং নিজ নিজ জায়গা থেকে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। তাহলেই আমাদের কর্মসূচিগুলো সফলতার মুখ দেখবে। এর আগে গত ২১ জুলাই স্বাস্থ্য অধিদফতর জানিয়েছিল সংক্রমণ সবচেয়ে বেশি দেখা দিয়েছে ১০ জেলায়। জেলাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছে ঢাকায়। শনাক্তের দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে চট্টগ্রাম জেলা। এরপর কুমিল্লা জেলার অবস্থান। এরপর যথাক্রমে আছে বগুড়া, সিলেট, নারায়ণগঞ্জ, রাজশাহী, খুলনা ও ফরিদপুর।
এদিকে কঠোর লকডাউনের ষষ্ঠ দিনে রাজশাহী মহানগরীর সড়কে যানবাহন ও মানুষের চলাচল আগের দিনগুলোর চেয়ে বেড়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আগের দিনের চেয়ে বেশি তৎপর দেখা গেলেও দোকানি, ক্রেতা, পথচারী অনেকেরই মাস্ক মুখে থাকছে না। গতকাল বুধবার সকালে রাজশাহী নগরের সাহেববাজার, লক্ষ্মীপুর, সাগরপাড়া, রেলগেটসহ আশপাশের এলাকা ঘুরে দেখা যায়, কেউ চায়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছেন, আবার কেউ কাঁচাবাবাজারে ঘোরাঘুরি করে চলে যাচ্ছেন। আগের দিনের তুলনায় এদিন কাঁচাবাজার, মাছ ও মুদি দোকানে লোকজনের চলাচল বেড়েছে। প্রধান সড়কে মানুষের সঙ্গে যানবাহনের সংখ্যাও বেশি।
সেনাবাহিনী, আনসার, পুলিশ আর ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রম দেখা গেছে। নানা ছুতোয় বের হওয়া মানুষদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে তল্লাশি চৌকিতে, মাস্ক না পরায় করা হচ্ছে জরিমানা। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আবু আসলাম বলেন, অধিকাংশই জরুরি দরকার ছাড়া বের হয়েছেন এবং জানতে চাইলে নানা অজুহাত দিচ্ছেন। তাই, তাদের জরিমানা করা হচ্ছে। অনেকেরই মাস্ক থুতনিতে, তাদেরকেও জরিমানা করা হয়েছে।
তিনি বলেন, কঠোরতম লকডাউন বাস্তবায়নে পুলিশের পাশাপাশি রাজশাহীতে ১১ প্লাটুন সোনা, বিজিবি ও আনসার সদস্য কাজ করছেন। এছাড়াও ২২টি ভ্রাম্যমাণ আদালত মাঠে রয়েছে। এর মধ্যে নগরের চারটি ও উপজেলা পর্যায়ে ১৮টি। রাজশাহীতে লকডাউনের পঞ্চম দিনে মঙ্গলবার লকডাউনের বিধিনিষেধ ও স্বাস্থ্যবিধি না মানায় ৭১ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে।
এ সময়ে জরিমানা আদায় করা হয়েছে ৪৫ হাজার ৫০ টাকা। আর স্বাস্থ্যবিধি না মানায় একজনকে কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। রাজশাহী জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ কাউছার হামিদ মঙ্গলবার রাতে এ তথ্য জানিয়েছিলেন। তিনি জানান, রাজশাহী নগরী ও উপজেলাগুলোতে এই জরিমানা করা হয়। এর মধ্যে নগরীতে ৩২টি মামলায় ২৫ হাজার ৬০০ টাকা জরিমানা করা হয়। আর উপজেলাগুলোতে ৩৯টি মামলায় ১৯ হাজার ৪৫০ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে।
এদিকে মহামারি করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ও মৃত্যুর মিছিল ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে সারাদেশে আরও ২৩৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে ভাইরাসটিতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল ২০ হাজার ১৬ জনে। গত ২৪ ঘণ্টায় মৃত ২৩৭ জনের মধ্যে পুরুষ ১৪৯ ও নারী ৮৮। এদের মধ্যে সরকারি হাসপাতালে ১৬৭ জন, বেসরকারি হাসপাতালে ৫৭ জন এবং বাড়িতে ১৩ জনের মৃত্যু হয়। গত ২৪ ঘণ্টায় মৃত্যুহার ১ দশমিক ৬৫ শতাংশ।
এই সময়ে করোনায় আক্রান্ত হিসেবে নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছেন আরও ১৬ হাজার ২৩০ জন। যা একদিনে সর্বোচ্চ। এ নিয়ে দেশে এখন পর্যন্ত শনাক্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২ লাখ ১০ হাজার ৯৮২ জনে। গতকাল বুধবার স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, একই সময়ে সরকারি ও বেসরকারি ৬৩৯টি ল্যাবরেটরিতে ৫৬ হাজার ১৫৭টি নমুনা সংগ্রহ ও ৫৩ হাজার ৮৭৭টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়। এ নিয়ে মোট নমুনা পরীক্ষার সংখ্যা দাঁড়াল ৭৬ লাখ ১২ হাজার ৫৮৮টি।
গত ২৪ ঘণ্টায় নমুনা পরীক্ষায় শনাক্তের হার ৩০ দশমিক ১২ শতাংশ। গত বছরের ৮ মার্চ প্রথম রোগী শনাক্ত হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত শনাক্তের মোট হার ১৫ দশমিক শূন্য ৯১ শতাংশ। বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় সুস্থ হয়ে উঠেছেন ১৩ হাজার ৪৭০ জন। এ নিয়ে দেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পর চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে ওঠা রোগীর সংখ্যা ১০ লাখ ৩৫ হাজার ৮৮৪ জন।
২৪ ঘণ্টায় সুস্থতার হার ৮৫ দশমিক ৫৪ শতাংশ। গত ২৪ ঘণ্টায় করোনায় মৃত ২৩৭ জনের মধ্যে বয়সের হিসাবে বিশোর্ধ্ব ৯ জন, ত্রিশোর্ধ্ব ১১ জন, চল্লিশোর্ধ্ব ৩৪ জন, পঞ্চাশোর্ধ্ব ৪৪ জন, ষাটোর্ধ্ব ৭৮ জন, সত্তরোর্ধ্ব ৪৫ জন, আশির্ধ্ব ১৫ জন এবং নব্বই বছরের বেশি বয়সী একজন রয়েছেন।
বিভাগওয়ারী হিসাবে দেখা গেছে, ঢাকা বিভাগে ৭০ জন, চট্টগ্রামে ৬২ জন, রাজশাহীতে ২১ জন, খুলনায় ৩৪ জন, বরিশালে ৯ জন, সিলেটে ১৮ জন, রংপুরে ১৬ জন এবং ময়মনসিংহ বিভাগে সাতজন রয়েছেন। এর আগে গতকাল মঙ্গলবার (২৭ জুলাই) ২৫৮ জনের মৃত্যুর তথ্য জানায় স্বাস্থ্য অধিদফতর। যা এখন পর্যন্ত একদিনে সর্বোচ্চ। বাংলাদেশে করোনা প্রথম শনাক্ত হয় গত বছরের ৮মার্চ। এর ১০ দিন পর ভাইরাসটিতে একজনের মৃত্যুর তথ্য জানায় স্বাস্থ্য অধিদফতর।