এফএনএস : দেশে মহামারি করোনাভাইরাসের (কোভিড-১৯) সংক্রমণ ও মৃত্যুর নতুন রেকর্ড হচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় এ ভাইরাস সারাদেশে আরও ২৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে ভাইরাসটিতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল ১৬ হাজার ৪১৯ জনে। এই সময়ে করোনা আক্রান্ত হিসেবে নতুন শনাক্ত হয়েছেন আরও ১১ হাজার ৮৭৪ জন, যা একদিনে সর্বোচ্চ। ফলে মোট শনাক্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়াল ১০ লাখ ২১ হাজার ১৮৯ জনে। গতকাল রোববার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, একই সময়ে সরকারি ও বেসরকারি ৬১৩টি ল্যাবরেটরিতে ৩৯ হাজার ৮৬০টি নমুনা সংগ্রহ ও ৪০ হাজার ১৫টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়। এ নিয়ে মোট নমুনা পরীক্ষার সংখ্যা দাঁড়ালো ৬৯ লাখ ৭১ হাজার ১৬৭টি। নমুনা পরীক্ষার তুলনায় শনাক্তের হার ২৯ দশমিক ৬৭ শতাংশ। মোট পরীক্ষার তুলনায় শনাক্তের হার ১৪ দশমিক ৬৫ শতাংশ। গত ২৪ ঘণ্টায় সুস্থ হয়ে উঠেছেন ৬ হাজার ৩৬২ জন। এ নিয়ে সুস্থ হয়ে ওঠা রোগীর সংখ্যা ৮ লাখ ৭৪ হাজার ৫০১ জন।
তাদের মধ্যে পুরুষ ১৩৩ ও নারী ৯৭ জন। মৃত ২৩০ জনের মধ্যে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৬৯, বেসরকারি হাসপাতালে ৪২ এবং বাসায় ১৯ জনের মৃত্যু হয়। মৃত ২৩০ জনের মধ্যে বয়স হিসাবে বিশোর্ধ্ব ৭, ত্রিশোর্ধ্ব ১৯, চল্লিশোর্ধ্ব ৪২, পঞ্চাশোর্ধ্ব ৫১ এবং ষাটোর্ধ্ব ১১১ জন মারা যান। বিভাগওয়ারী পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ঢাকায় ৫৬, চট্টগ্রামে ৩৯, রাজশাহীতে ২৬, খুলনায় ৬৬, বরিশালে ৮, সিলেটে ৮, রংপুরে ২২ এবং ময়মনসিংহ বিভাগে ৫ জনের মৃত্যু হয়।
এর আগে ৯ জুলাই দেশে ২১২ জনের মৃত্যু হয়। ১০ জুলাই দেশে ১৮৫ জনের মৃত্যু হয়। ৮ জুলাই করোনায় দেশে ১৯৯ জনের মৃত্যু হয়। ৭ জুলাই প্রথমবারের মতো মৃতের সংখ্যা ২০০ ছাড়ায়। এদিন মৃত্যু হয় ২০১ জনের। অন্যদিকে গত বৃহস্পতিবার ১১ হাজার ৬৫১ জনের করোনা শনাক্ত হয়, যা একদিনে ছিল সর্বোচ্চ। তার আগে ৬ জুলাই ১১ হাজার ৫২৫ জনের করোনা শনাক্ত হয়। গত বছরের ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনাভাইরাস শনাক্ত হয় এবং এর ১০ দিন পর ১৮ মার্চ প্রথম এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে একজনের মৃত্যু হয়।
এদিকে করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে না এলে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে পরিস্থিতি করুণ হয়ে যাবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। আর তাতে করে বিপদে পড়তে হবে বলেও জানিয়েছেন অধিদপ্তরের মুখপাত্র অধ্যাপক ডা. রোবেদ আমিন। গতকাল রোববার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আয়োজিত ভার্চুয়াল বুলেটিনে এ শঙ্কার কথা জানান তিনি। অধ্যাপক রোবেদ আমিন বলেন, বর্তমান ভ্যারিয়েন্টের মাধ্যমে মৃত্যু শুধু বয়স্ক মানুষের হচ্ছে না, তরুণদেরও হচ্ছে।
বিভাগভিত্তিক বিশ্লেষণে সব জেলাতেই করোনা ছড়িয়ে পরেছে এবং সংক্রমণ ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়ে যাচ্ছে, সঙ্গে মৃত্যুর সংখ্যাও বাড়ছে জানিয়ে তিনি বলেন, ঢাকা বিভাগে গত ২৪ ঘণ্টায় মৃত্যুর সংখ্যা ৭০ জন, চট্টগ্রামে ২০ জন ও রাজশাহীতে ১৩ জন, খুলনায় ৫১ জন মারা গেছেন। শনাক্তের হার ঢাকায় ৪৯ দশমিক ৮৭ শতাংশ, চট্টগ্রামে ১৮ দশমিক ২৯ শতাংশ, খুলনায় ১১ দশমিক ৪ শতাংশ। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনায় রোগীর চাপ বাড়ছে। অধ্যাপক রোবেদ আমিন আরও বলেন, গত মাসে সারা দেশে সংক্রমণের হার অনেক বেশি ছিল। জুন মাসে এক লাখ ১২ হাজার ৭১৮ জন রোগী সংক্রমিত হয়েছেন।
শুধু জুলাইয়ের প্রথম ১০ দিনে প্রায় এক লাখ রোগীকে সংক্রমিত হতে দেখতে পেয়েছি। আমরা যেভাবে সংক্রমিত হচ্ছি, হাসপাতালে রোগীর চাপ যদি বাড়তেই থাকে, আগামী সাত থেকে ১০ দিনের মধ্যে হাসপাতালের শয্যা আর খালি থাকবে না। সারাদেশে গত মাসেও অসংখ্য বেড খালি ছিল, আইসিইউ বেড খালি ছিল। সেই খালি বেডের সংখ্যা ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। বর্তমানে সারাদেশে মাত্র ৩০০ এর মতো কোভিড-১৯ আইসিইউ বেড খালি আছে। তিনি বলেন, সারাদেশে লকডাউন চলছে। লকডাউন সফল করতে পুলিশ এবং বিজিবির পাশাপাশি সেনাবাহিনীও মাঠে রয়েছে।
কিন্তু আমরা লক্ষ্য করেছিÑ জরুরি প্রয়োজন ছাড়াও অনেকে বাইরে বের হচ্ছেন। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে যদি আমরা করোনা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারি, পরিস্থিতি অত্যন্ত করুণ হয়ে যাবে মন্তব্য করে তিনি বলেন, সংক্রমণের হার এভাবে চলতে থাকলে এক দিনে ১৫ হাজার শনাক্ত হতে বেশি সময় লাগবে না। আর তাতে করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না এলে সবাইকে বিপদে পড়তে হবে। এদিকে দেশে করোনা সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি চলছে, দিনকে দিন বেড়েই চলেছে মৃত্যুর সংখ্যা।
আর সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকার ঘোষিত কঠোর বিধিনিষেধ যারা অমান্য করছেন, তাদেরকে আরও কঠোর আইনের আওতায় আনার অনুরোধ করেন ডা. রোবেদ আমিন। তিনি বলেন, দেশে জুন মাসে এক লাখ ১২ হাজার ৭১৮ জন রোগী সংক্রমিত হয়েছেন। কিন্তু শুধু জুলাইয়ের প্রথম ১০ দিনে প্রায় এক লাখ রোগীকে সংক্রমিত হতে দেখতে পেয়েছি। সংক্রমণের এই ঊর্ধ্বগতি রুখতে সরকার বিধিনিষেধ দিয়েছে। কিন্তু সারাদেশে চলমান লকডাউনের সময়েও অতি জরুরি প্রয়োজন ছাড়া যারা বাইরে যাচ্ছেন, যারা আইন অমান্য করছেন।
এই লকডাউনের মধ্যেও অসংখ্য মানুষ জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বের হচ্ছেন জানিয়ে অধ্যাপক রোবেদ আমিন বলেন, এসময় জরুরি কাজে নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারী ছাড়া এবং জরুরি কারণ ছাড়া ঘরের বাইরে কেউ বের হলে, তার বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু যদি কেউ এ আইন অমান্য করেন অথবা সরকারের আদেশ যদি কেউ অমান্য করেন, তাহলে তার জন্য কঠোরতা যেন বৃদ্ধি পায়।
জরুরি প্রয়োজন ছাড়া যারা বাইরে যাচ্ছেন, তাদের প্রতি আমাদের বিনীত অনুরোধ থাকবে মন্তব্য করে অধ্যাপক রোবেদ আমিন বলেন, আমাদের দেশে সংক্রমণ বৃদ্ধি পাচ্ছে, অসংখ্য মানুষ মারা যাচ্ছেন। আমাদের হাসপাতালগুলোর সব খালি বেড খালি হয়ে যাচ্ছে। আর এভাবে যদি চলতে থাকে, তাহলে পরিস্থিতি অত্যন্ত করুণ হয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করেন অধ্যাপক রোবেদ আমিন।