স্টাফ রিপোর্টার : রাজশাহী শহরের উত্তরে দিনদিন ছোঁয়া লাগাছে নগরায়নের। যার কারণে উত্তরের নগর নওদাপাড়াস্থ বড়বনগ্রাম ও ছোটবনগ্রাম মৌজার অন্তর্গত মাটির দামও বৃদ্ধি পাচ্ছে প্রায় প্রতিনিয়তই। আর সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে পেশি শক্তি প্রয়োগ, বিভিন্ন মহলকে ম্যানেজ করে খতিয়ানে উল্লেখ্য থাকা মাটিয়ালকে ধরণ পরিবর্তন করা সাপেক্ষে মাটি ব্যবসায়ির একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট করে একের পর এক ভরাট করছে এলাকার বিভিন্ন জলাশয়।
জলাশয় ভরাটে ঐ অঞ্চলের বাসিন্দারা পড়েছেন চরম ভোগাস্তির মধ্যে। জলাশয় ভরাটের কারণে সামান্য বৃষ্টিতেই তলিয়ে যাচ্ছে রাস্তাঘাট। পানি নিষ্কাশনের বিকল্প কোন পথ না থাকায় জলাশয় বা পুকুর ভরাটের কারণে বৃষ্টি মৌসুমে বাড়ির আঙ্গিনাতেও পানি উঠছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। গত একবছরের মাথায় বড়বনগ্রাম মৌজায় বেশ কয়েকটি পুকুর বা জলাশয় ও ডোবা ভরাট করে সেগুলো প্লট আকারে বিক্রির অভিযোগ আছে স্থানীয়দের পক্ষ থেকে।
উত্তর শহরের ছোনবনগ্রাম, নওদাপাড়া, চকপাড়া, মাস্টারপাড়া, রায়পাড়াসহ একাধিক স্থানে বিগত কয়েক বছরে ভরাট করা হয়েছে অসংখ্য জলাশয় ও পুকুর। খতিয়ানে বর্ণনা করা মাটির ধরণকে ভর করে মাটি খেকোরা এইধরনের প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য নিয়মিতভাবেই নষ্ট করছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। উল্লেখ্য যে, বিগত কয়েক বছরের মধ্যে ভরাট করা হয়েছে ছোটবনগ্রাম এলাকার বড় আকৃতির তিনটি পুকুর।
এছাড়াও রাসিকের ১৭নম্বর ওয়ার্ড অন্তর্গত পোস্টাল একাডেমির উত্তর-পশ্চিম কোনে আড়ি পুকুর নামের বিশালাকার একটি পুকুর ভরাট করে সেটিকে সীমানা প্রাচীর দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। এছাড়াও একই ওয়ার্ডের শাহমখদুমপাড়াস্থ পচাঁ পুকুর নামের একটি গভীর পুকুরও ভরাট করা হয়েছে। ভরাট করা হয়েছে একই ওয়ার্ডের অন্তর্গত রায়পাড়াস্থ একটি পুকুরও। এছাড়াও নওদাপড়া ইক্ষু সেন্টার সংলগ্ন একটি পুকুরও ভরাট করা হয়েছে।
ভরাট করা হয়েছে একই ওয়ার্ডের মাস্টারপাড়া এলাকারও একটি পুকুর। এছাড়াও আরডিএ অন্তর্গত ছায়ানীড় আবাসিক এলাকার সর্ব পশ্চিম-উত্তর কোনের একটি জলাশয়ও ভরাট করেছে মাটি ব্যবসায়ির সিন্ডিকেট। আরো আছে শাহমখদুম থানার অন্তর্গত নতুন চকপাড়া এলাকার একটি বিশালাকার জলাশয়। এছাড়াও বেশ কয়েক বছর পূর্বে উক্ত ছাড়ানীড় এলাকার পার্শ্ববর্তী সর্বপূর্বের প্রায় ছয় বিঘার মতো এলাকাজুড়ে বিশালাকার একটি পুকুরও ভরাট করেছিল সিন্ডিকেট।
সম্প্রতিকালে এক রুল শুনানিতে অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ আদালতকে বলেন, পরিবেশ আইন-১৯৯৫ ও জলাধার সংরক্ষণ আইন-২০০০ এর বিধান অনুসারে যে কোনও জলাশয় ভরাট নিষিদ্ধ এবং ব্যক্তিগত পুকুর হলেও তা জলাধারের সংজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় তা ভরাট করা যাবে না।
কিন্তু ক্ষমতায় এই বৈশ্বিক করোনা মহামারিতেও নির্দ্বিধায় প্রশাসনের চোখের সামনেই চলমান রয়েছে নগরীর বিভিন্নস্থানের পুকুর, জলাশয় ও মাটিয়াল ভরাটের কাজ। সেই ধারাবাহিকতায়, উক্ত সিন্ডিকেট নগরীর ১৭নং ওয়ার্ড অন্তর্ভূক্ত বড়বনগ্রাম মৌজার নতুন চকপাড়া এলাকার জলমগ্ন একটি জলাশয় ক্রয়বাবদ ভরাট করছে বিএনপির একাধিক নেতাসহ ওয়ার্ড আ’লীগের বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা বলেও অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় এক সূত্র জানায়, এর আগেও মাটি ব্যবসায়ী ও পুকুর-জলাশয় ভরাটকারী বড়বনগ্রাম মোজার মাস্টারপাড়া নিবাসী মৃত জেসারত মন্ডলের ছেলে গোলাম মোস্তফার বিরুদ্ধে রাতের আঁধারে অবৈধভাবে পুকুর ভরাট করায় তার বিরুদ্ধে রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কাছে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন এলাকার সচেতন ও প্রকৃতিপ্রেমী একাধিক ব্যক্তি। উক্ত লিখিত অভিযোগের প্রেক্ষিতে, ঐসময় রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (আরডিএ) অবৈধ পুকুর ভরাট কার্যক্রম বন্ধের প্রেক্ষিতে স্থানীয় প্রশাসনসহ অন্যান্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরসহ অভিযুক্তের বরাবর চিঠি প্রেরণ করেন। যার স্মারক নং- রাউক/পরি/পুকুর ভরাট/অভিযোগ-০১/২০২১।
কিন্তু, তবুও থামানো যায়নি পুকুর ও জলাশয় ভরাট করার মতো অবৈধ পন্থার ঘৌড়দৌড়। উল্লেখ্য যে, ঐসময় পুকুরটি যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুপক্ষের অনুমোদন ব্যতিরেকে অবৈধভাবে ভরাট করা হচ্ছিল বলে অভিযোগ পত্রে উল্লেখ্য ছিল। উক্ত অভিযোগ ও চিঠির সত্যতা স্বীকার করেন, রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের স্টেট অফিসার আবু নূর মোহা. মতিউর রহমান। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি আরো বলেন, শুধু পুকুরই নয় কোন প্রকার জলাশয় কিংবা মাটিয়াল ভরাট করার কোন বৈধতা নেই। তবে, জেলা প্রশাসকের দপ্তরে আবেদন করার প্রেক্ষিতে অনেকেই জমি বা মাটির ধরণ পরিবর্তন করার মাধ্যমে জলাশয় ভরাট করছে বলেও আমরা মাঝে মধ্যেই অভিযোগ পাই।
অন্যদিকে, রাজশাহী পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা মিজানুর রহমান বলেন, পুকুর কিংবা জলাশয়ের ধরণ পরিবর্তন করতে হলে ডিসি অফিসের মাধ্যমে করা যায়। আমাদের কাছে পুকুর কিংবা জলাশয় ভরাটের কোন অভিযোগ আসলে আমরা তাৎক্ষণিক সেটার বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করি। কিন্তু, সমস্যা হচ্ছে আমাদের যথেষ্ট পরিমাণে লজিস্টিক সাপোর্ট নাই। তাছাড়া উক্ত অভিযোগের প্রেক্ষিতে বিভিন্ন দপ্তর ও প্রশাসনের কাছে চিঠি দেবার পাশাপাশি অন্যান্য দাপ্তরিক কাজ করতে বেশ কয়েকদিন সময় লেগে যায়।
আর, ঐ কয়েকদিনের মধ্যেই অভিযুক্তরা রাতের আঁধারে তড়িঘরি করে পুকুর, মাটিয়াল বা জলাশয় ভরাট করার কাজ শেষ করে ফেলে। এছাড়াও অভিযোগকারীরা অধিকাংশ সময়ে অভিযোগ দায়ের করার পরে উক্ত অভিযোগটি প্রত্যাহার করে নেয় বলেও জানান বিশ্বস্ত একটি সূত্র। যার কারণে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তাও সেটির বিপরীতে বেশিদূর অগ্রসর হতে পারেন না বলেও জানান।
২০০০ সালের জলাশয় সংরক্ষণ আইনের এর ২ (চ) ধারায় প্রাকৃতিক জলাশয়ের সংজ্ঞাভুক্ত করে গেজেট প্রকাশের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। এ সংক্রান্ত মামলার রায় পাওয়ার এক বছরের মধ্যে বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় সচিবকে এ আদেশটি বাস্তবায়ন করতে বলা হয়েছে। গেজেট প্রকাশিত হলে, ব্যক্তি মালিকানার পুকুরও চাইলেই ভরাট করে ফেলা যাবে না। মহামান্য বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চের এ সংক্রান্ত রায় প্রকাশিত হয়।
প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট করে জলাশয় ভরাট কেনো করা হচ্ছে তা উক্ত সিন্ডিকেটের কাছে জানতে চাইলে তারা নানারকম টালবাহানা শুরু করার পর বলেন, সন্ধ্যের পর চেম্বারে দেখা করেন। তাদের প্রস্তাব প্রত্যাক্ষাণ করলে তারা উক্ত মৌজার অন্তর্গত ভরাট করা জলাশয় ও পার্শ্ববর্তী জমির দলিলপত্র দেখিয়ে বলেন, ‘খতিয়ানে উক্ত জলাশয়টি মাটিয়াল হিসেবে উল্লেখ্য আছে’। আমরা উক্ত মটিয়ালটির ধরণ পরিবর্তনের জন্য রাজশাহী জেলা প্রশাসকের দপ্তরে আবেদন করেছি।
উল্লেখ্য যে, ড্রেজার মেশিন দিয়ে উক্ত জলাশয়টি ভরাটকরাকালীন শাহমখদুম থানার একজন দারোগা গাড়ি ও ফোর্স নিয়ে উক্ত খননকাজ বন্ধ করতে বলার পরেও অপরপ্রান্ত থেকে বেশ কয়েকজন উঠতি বয়সী নেতা পুলিশ ও সংবাদকর্মীকে তোয়াক্কা না করে উচ্চস্বরে বলতে থাকে, কাজ বন্ধ হবে না। দেখি প্রশাসন কি করে। আপনারা এসপি, ডিসি কেনো প্রধানমন্ত্রীকে অভিযোগ দিলেও আমাদের কেউ কিছুই করতে পারবে না! হতভম্ব হতে হয় তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহারের ধরণ দেখে। স্থানীয়রা কেউ কেউ অভিযোগ করে বলেন, তারা এমনই।
রাজনীতির ক্ষমতাকে তারা ঢাল করে এই ওয়ার্ডের অনেক পুকুর জলাশয় ভরাট করে পরিবেশের বিপর্যয় ঘটাচ্ছে। প্রশাসনকে তোয়াক্কা না করে উপতরন্তু তাদেরকে অপমানজনিত কথা বলে ও বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে জলাশয় ভরাটের কাজ চলমান রাখার বিষয়ে শাহমখদুম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাইফুল সরকারের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিষয়টি সত্যি দুঃখজনক। আমাদের কাছেও উক্ত জলাশয় ভরাটের বিপরীতে একটি লিখিত অভিযোগ এসেছিল।
কিন্তু, সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে আমাদের কাছে পুলিশিং সাপোর্ট লিখিত আকারে না চাইলে সেবিষয়ে আমাদের কিছুই করার থাকেনা। কিন্তু তবুও আমি উক্ত স্থানে একাধিকবার পুলিশের টিম পাঠিয়েছিলাম ভরাট কাজ বন্ধ করার জন্য। পুলিশ গেলে তারা কিছু সময়ের জন্য কাজ বন্ধ রাখে। কিন্তু পরবর্তীতে রাতের আঁধারে কিংবা পুলিশের অনুপস্থিতিতে তারা খুব দ্রুত কাজ চালিয়ে যান।
পরিবেশ সংরক্ষণ (সংশোধন) আইন,২০১০ অনুযায়ী শহরের কোন পুকুর, জলাশয় কিংবা ডোবা ও বছরের পর বছর ধরে যেখানে জলমগ্ন থাকে উক্ত স্থানগুলো ভরাট করার কোন বৈধতা নেই। এদিকে, এলাকাবাসীর দাবী পুকুরটি ভরাট হলে ঐ এলাকার শত শত বাড়ি ঘর পানিতে নিমজ্জিত হওয়াসহ নানা দুর্ভোগ পোহাতে হবে। বৃষ্টি মৌসুমে বৃষ্টির পানিতে প্রতিটি রাস্তাঘাট ও বাড়ীতে জমাট হয়ে থাকবে। জলাশয়টি ভরাট করার জন্য ব্যববহৃত ভাড়ি ভাড়ি ট্রাকগুলো অর্ধপাকা আর কাঁচারাস্তাগুলো সম্পূর্ণরূপে নষ্ট হয়েগেছে ইতিমধ্যেই।
উক্ত রাস্তা দিয়ে চলাচল করাটা এখন অসম্ভব হয়ে দাড়িয়েছে। পুকুরটি ভরাট বন্ধে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ঐ এলাকার অসহায় ভুক্তভুগী সাধারণ মানুষ। যখন সরকারী অফিস আদালত বন্ধসহ সারাদেশে চলছে লকডাউন, ঠিক তখনই সুযোগ সন্ধানিরা এই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে পুকুর ভরাট করছেন। তিন বিঘার উক্ত স্থানটি অর্ধেকই ছিল জলাশয়। উক্ত জলাশয়টি প্রায় ৪০ বছর যাবত এলাকায় পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় অগ্রনী ভুমিকা রেখেছিল বলে জানান স্থানীয়রা।
পরিবেশ সংরক্ষণ (সংশোধন) আইন, ২০১০ অনুযায়ী শহরের কোন পুকুর, জলাশয় কিংবা ডোবা ও বছরের পর বছর ধরে যেখানে জলমগ্ন থাকে উক্ত স্থানগুলো ভরাট করার কোন বৈধতা নেই। এবিষয়ে, ১৭ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর শাহাদত আলী শাহুর কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনিও অভিযোগের কথা স্বীকার করে বলেন, ‘অলৌকিক কারণে এলাকার প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার্থে তিনিও তেমন কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি আজ অবদি’।