৪ আগস্ট ২০২৬
বিজ্ঞাপন
Amader Rajshahi

রমজান ঘিরে আমদানি করা বিপুল ভোগ্যপণ্য বিক্রি হচ্ছে বাড়তি দামে

প্রকাশিত: ৮ এপ্রিল ২০২১, ৮:০৫ পূর্বাহ্ণ | বিভাগ: lead
রমজান ঘিরে আমদানি করা বিপুল ভোগ্যপণ্য বিক্রি হচ্ছে বাড়তি দামে
বিজ্ঞাপন

এফএনএস : রমজান ঘিরে গত কয়েক মাসে দেশে চাহিদার তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ পরিমাণ ভোগ্যপণ্য আমদানি হয়েছে। রমজানে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে নেয়া হয়েছে ব্যাপক প্রস্তুতিও। সারাদেশে প্রথমবারের মতো সরকারি সংস্থা দ্বিগুণ পরিমাণ নিত্যপণ্য বিক্রি কার্যক্রম শুরু করেছে। সংস্থাটির লক্ষ্য হচ্ছে, রোজায় স্বল্প আয়ের মানুষের কাছে সস্তায় ভোজ্যতেল, চিনি, ডাল, ছোলা, পেঁয়াজ এবং খেজুরের মতো ভোগ্যপণ্য পৌঁছে দেয়া। সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা ও ন্যায্যমূল্যে পণ্য বিক্রি করতে বাজারের দিকে এখন সরকারের সর্বোচ্চ নজর। সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকেও নিত্যপণ্যের বাজার তদারকি করা হচ্ছে। কিন্তু তারপরও অসাধু ব্যবসায়ীরা বাড়তি দামে ভোগ্যপণ্য বিক্রি করছে। রোজার এক মাস আগেই অত্যাবশ্যকীয় পণ্য হিসেবে খ্যাত ১৭টি ভোগ্যপণ্যের প্রায় অধিকাংশটির দাম বেড়েছে। এখন আগের বেড়ে যাওয়া দামে বিক্রি হচ্ছে ওসব ভোগ্যপণ্য। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং বাজার সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, দেশে ভোগ্যপণ্যের কোনো সঙ্কট নেই। ফলে করোনা পরিস্থিতির মধ্যেও বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে তা পরিলক্ষিত হচ্ছে না। ব্যবসায়ীরা রমজান সামনে রেখে এবার তিন মাস আগে থেকে আমদানির প্রস্তুতি নিয়েছিল। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে গত বছরের ডিসেম্বর মাসের শুরুতে ভোগ্যপণ্যের আমদানি বাড়ানোর পরামর্শ দেয়া হয়। সরকারি ওই পরামর্শ গ্রহণ করে দেশে ভোগ্যপণ্যের আমদানি ও বাজারজাতকারী বড় প্রতিষ্ঠানগুলো বিপুল পরিমাণ চাল, ডাল, ছোলা, ভোজ্যতেল, চিনি, গম, পেঁয়াজ, মসলাপাতি এবং খেজুর আমদানি করে। ইতোমধ্যে আমদানিকৃত পণ্যের বড় অংশ চট্টগ্রাম বন্দর থেকে খালাস হয়ে দেশের বড় বড় পাইকারি বাজারগুলোতে পৌঁছে গেছে। আমদানিকৃত পণ্যে ঠাসা দেশের বৃহত্তম পাইকারি বাজার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ এবং ঢাকার মৌলভীবাজার, বেগম বাজার, বাদামতলী, মোহাম্মদপুর এবং শ্যামপুর কৃষিপণ্যের মার্কেট।

সূত্র জানায়, শুধু রোজা সামনে রেখেই ২৫টি দেশ থেকে প্রায় ১০-১২ হাজার কোটি টাকার ভোগ্যপণ্য আমদানি হয়েছে। আমদানিকৃত ওসব পণ্যের মধ্যে রয়েছে ছোলা, তেল, দুধ, চিনি, খেজুর মটর, মসুরসহ বিভিন্ন ধরনের ডাল। আর চাহিদার তুলনায় বেশি পণ্য আমদানি করা হয়েছে। তারপরও ইতিমধ্যে ভোজ্যতেল, চিনি, ছোলা, ডাল এবং খেজুরের মতো কয়েকটি পণ্যের দাম বেড়ে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে রোজা শুরু হলে বাজার পরিস্থিতি কোথায় দাঁড়ায় তা নিয়ে মধ্যবিত্ত ও স্বল্প আয়ের খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ চিন্তিত। তবে রোজায় চাহিদা বাড়ে এমন ৬টি পণ্যের সরবরাহ বৃদ্ধি এবং ন্যায্যমূল্যে বিক্রির বিশেষ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ওই ৬টি পণ্যের মধ্যে রয়েছে ভোজ্যতেল, চিনি, ছোলা, পেঁয়াজ, ডাল ও খেজুর। দেশে সারা বছর ভোজ্যতেলের চাহিদা ২১ লাখ টন আর তার ৯০ শতাংশই আমদানি করতে হয়।

কেবল রোজার মাসে ৪ লাখ টনের মতো ভোজ্যতেলের চাহিদা থাকে। তাছাড়া সারা বছরের জন্য প্রয়োজন হয় ১৮ লাখ টন চিনি। তার মধ্যে কেবল রোজার সময় ৩ লাখ টনের চাহিদা থাকে। সারা বছর যেখানে ৫ লাখ টন মসুর ডাল লাগে, সেখানে রোজায় চাহিদা থাকে ৮০ হাজার টনের মতো। ডালের চাহিদা মেটাতে ৫০ শতাংশ আমদানি করতে হয়। আর দেশে বছরে ৮০ হাজার টন ছোলার প্রয়োজন হয় আর ৮০ শতাংশই রোজার মাসে ব্যবহার হয়। পাশাপাশি রোজায় সময় সবচেয়ে বেশি পেঁয়াজের প্রয়োজন হয়। পেঁয়াজের ২৫ লাখ টন বার্ষিক চাহিদার মধ্যেই রোজার সময় ৫ লাখ টন ব্যয় হয়।
সূত্র আরো জানায়, রোজা সামনে রেখে এবারই প্রথমবাবের মতো দ্বিগুণ পণ্য নিয়ে ‘ট্রাকসেল’ বিক্রি কার্যক্রম শুরু করেছে টিসিবি। ক্রেতাদের স্বার্থ বিবেচনায় ১ এপ্রিল থেকে টিসিবি বিক্রি কার্যক্রম শুরু হয়। সংস্থাটির ওই কার্যক্রম শুক্রবারসহ পুরো রমজান মাসজুড়ে চলবে।

যাতে ক্রেতারা সস্তায় নিত্যপণ্য সামগ্রী কিনতে পারে। পাশাপাশি ঘরে বসে অনলাইনে অর্ডার দিয়েও নগরবাসী টিসিবির পণ্যসামগ্রী কিনতে পারবে। তবে রমজান সামনে রেখে ৬টি নিত্যপণ্যের নতুন মূল্য নির্ধারণ করেছে টিসিবি। নতুন দর অনুযায়ী একজন ক্রেতা দিনে ৫৫ টাকা কেজি দরে সর্বোচ্চ ৪ কেজি চিনি, ৫৫ টাকা কেজি দরে ২ কেজি মসুর ডাল, ১০০ টাকা দরে ৫ লিটার সয়াবিন তেল এবং ২০ টাকা দরে পাঁচ কেজি পেঁয়াজ কিনতে পারবে। তাছাড়া রমজান উপলক্ষে ২ কেজি ছোলা প্রতি কেজি ৫৫ টাকা দরে এবং এক কেজি খেজুর ৮০ টাকা দরে ক্রেতারা পাবে। চলমান ৪০০ ট্রাকের মাধ্যমে ভোজ্যতেল, চিনি, মসুর ডাল ও পেঁয়াজ বিক্রি কার্যক্রম বাড়িয়ে রমজান উপলক্ষে দ্বিতীয় ধাপে ট্রাকের সংখ্যা ৫০০টি হবে।

রোজা সামনে রেখে এ মুহূর্তে আড়াই কোটি লিটার ভোজ্য তেল, ১৭ হাজার টন ডাল, ৬০০ টন ছোলা, ১৩ হাজার টন চিনি ও অন্যান্য পণ্যের মজুদ নিয়ে সুলভ মূল্যের বাজার ব্যবস্থাপনার প্রস্তুতি নিয়েছে টিসিবি। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে ভোজ্যতেলসহ আরো কিছু পণ্য আমদানির প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। তাছাড়া দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর এবার রোজা সামনে রেখে ভারত থেকে বিপুল পরিমাণ পেঁয়াজ আমদানি করা হচ্ছে। পাশাপাশি দেশীয় উৎপাদনও ভাল হয়েছে। ফলে পেঁয়াজের দাম কমে আসছে। দিনাজপুরের হিলি স্থলবন্দরের খুচরা বাজারে এক সপ্তাহের ব্যবধানে আবার কমেছে ভারত থেকে আমদানি করা পেঁয়াজের দাম। প্রকারভেদে পেঁয়াজের দাম কেজিপ্রতি ৮ থেকে ১০ টাকা কমেছে। খুচরা বাজারে ৩০-৩৫ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে পেঁয়াজ। রোজায় পেঁয়াজের চাহিদা অনেক বাড়বে। তবে আমদানি কার্যক্রম চালু থাকায় এ পণ্যটি নিয়ে উদ্বেগের কিছু নেই বলে ব্যবসায়ীরা জানান।

এদিকে এবার রোজার প্রায় দু’মাস আগেই অসাধু ব্যবসায়ীরা নিত্যপণ্যের দাম বাড়ানোর কৌশল গ্রহণ করে। তার মধ্যে ভোজ্যতেলের দাম নিয়ে সবচেয়ে বেশি কারসাজি হয়। তাছাড়া চিনি নিয়েও কারসাজি করা হয়। যে কারণে বাজারে এ দুটি পণ্য বছরের অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে এখন বেশি দামে বিক্রি করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার দোহাই, সয়াবিন ও পামওয়েলের উৎপাদন কম এমন ধরনের কয়েকটি যুক্তি দাঁড় করিয়ে ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানোর জন্য ট্রেড এ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের কাছে আমদানিকারকরা দু’মাস আগে প্রস্তাব করে।

আর আমদানিকারকদের প্রস্তাব মেনে নিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় দু’দফায় ভোজ্যতেলের দাম বাড়িয়ে বাজার সামাল দেয়ার কৌশল গ্রহণ করে। কিন্তু তারপরও সরকার নির্ধারিত দাম কার্যকর হয়নি। বরং ভোজ্যতেল নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি মূল্যে বিক্রি হচ্ছে। তাছাড়া অন্যান্য পণ্যের দাম মাসখানেক আগেই বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। এ কারণে রোজা সামনে রেখে আগের বেড়ে যাওয়া বেশি দামেই ভোক্তাদের ভোগ্যপণ্য কিনতে হচ্ছে। অন্যদিকে রোজায় ভোগ্যপণ্যের দাম স্থিতিশীল রাখা প্রসঙ্গে টিসিবির চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আরিফুল হাসান সম্প্রতি জানান, গত বছরের তুলনায় এবার প্রায় দ্বিগুণ মজুদ সক্ষমতা নিয়ে রোজার আগে মাঠে থাকবে টিসিবি। আরো কিছু পণ্যের মজুদ বাড়াতে বিভিন্ন উৎস থেকে পণ্য সংগ্রহের চেষ্টা চলছে।

এ প্রসঙ্গে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (আমদানি ও অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য অনুবিভাগ) এএইচএম সফিকুজ্জামান জানান, ১৭টি ভোগ্যপণ্যকে নিত্যপ্রয়োজনীয় মনে করা হলেও রোজা সামনে রেখে আপাতত ভোজ্যতেল, চিনি, ডাল, পেঁয়াজ, ছোলা ও খেজুরের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে কাজ শুরু হয়েছে। গত সপ্তাহে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ঢাকার মৌলভীবাজারে সারাদেশের ভোগ্যপণ্য আমদানিকারদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সভা হয়েছে। সব আমদানিকারককে নিয়ে একটি এডহক কমিটি গঠন করে দেয়া হয়েছে। বাজারে ন্যায্যমূল্যে ভোগ্যপণ্য বিক্রির বিষয়টি নিয়ে ওই কমিটি কাজ করবে। তাছাড়া আমদানি পরিস্থিতির বিষয়েও সরকারকে প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে ওই কমিটি সহযোগিতা করবে।

পাঠকদের ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন