‘টক অব দ্যা সিটি’ অন্তরালে কী?
স্টাফ রিপোর্টার : রাজশাহী শহরের লক্ষিপুর এলাকায় হোটেল ব্যবসায়ী রাজুকে মারধরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে একের পর এক নতুন তথ্য বেরিয়ে আসছে। আরএমপি’র রাজপাড়া থানায় আহত ব্যক্তি কর্তৃক গত ১ আগস্ট হয়েছে একটি মামলাও। যার মামলা নং-০১। উক্ত মামলাতে আসামী (অভিযুক্ত) করা হয়েছে দশ জনকে। আর অজ্ঞাত নামা আসামীর তালিকায় আছে আরো ২২/২৩ জন। আসামীর তালিকায় আছে রাজশাহী মহানগর যুবদলের একজন যুগ্ম আহ্বায়কের নামও। মামলায় যুবদল নেতার নাম আসার কারনেই তোলপার শুরু হয়েছে নগর রাজনীতিতে। ঘটনাটি সোস্যাল প্লাটফর্মের বদৌলতে কেন্দ্র যুবদলের একাধিক নেতাও অবহিত আছেন বলে দাবি বার্তা প্রেরকদের। যে যার স্থান থেকে নিজেকে নির্দোষ দাবি করলেও ঘটনার সূত্রপাত উভয় পক্ষই রেখেছিলেন কিছুটা আড়াল করে। দিন যত অগ্রসর হচ্ছে ধীরে ধীরে অনেককিছুই বেরিয়ে আসছে সকলের সামনে।
গত ২৭ জুলাই রাজশাহী নগরীর লক্ষিপুর শেরশাহ রোডে একতারা হোটেলে ঘটে যাওয়া অপরাধের বিষয়টিকে কেন্দ্র করে হয়েছে চারটি সংবাদ সম্মেলন; বিচারের দাবিতে হয়েছে মানববন্ধন। যারা মানববন্ধন করেছে, তাদের একাংশ পরেরদিন ভোল পাল্টিয়ে সংবাদ সম্মেলনের মধ্যদিয়ে পুনরায় দাড়িয়েছে অন্যপক্ষের পাশে! বিষয়টি নিয়ে নগর রাজনীতি ও স্থানীয়দের মধ্যে চলছে আলোচনা ও সমালোচনার ঝড়। প্রকৃত ঘটনা ও অপরাধের সূত্রপাত নিয়ে কাউকেই দেখা যায়নি তেমন কোন বিবৃতি দিতে। যে যার স্থান থেকে অন্যকে করছেন দোষারোপ। ঘটনাটির সাথে জড়িয়েছে তিনটি পক্ষ। প্রথম পক্ষ (মামলার বাদী) রাজু, দ্বিতীয় ও তৃতীয় পক্ষ পর্যায়ক্রমে হাবিব ও যুবদল নেতা নাজির। ভুক্তভোগী হোটেল ব্যবসায়ী লক্ষিপুরস্থ একতারা আবাসিক হোটেলের মালিক, দ্বিতীয়পক্ষ হাবিব প্রিয়সী হোটেলের মালিক আর তৃতীয় পক্ষ নাজির মহানগর যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক।
ভুক্তভোগী ও হোটেলে কর্মরতদের দেয়া তথ্য মতে, গত ২৭-০৭-২০২৬ ইং রোজ সোমবার দিনের বেলায় প্রিয়সী হোটেলের মালিক হাবিব আট-দশজন ছেলেকে নিয়ে হুড়মুড়িয়ে রাজুর একতারা হোটেলে প্রবেশ করেন। হোটেলের কর্মচারিরা কারণ জানতে চাইলে হাবিব তাদেরকে জানান, এই হোটেলে দুজন ব্যক্তিকে অপহরণ করে আটকে রাখা হয়েছে। আমরা তাদেরকে উদ্ধার করতে এসেছি। পরবর্তীতে একতারা হোটেলের মালিক কর্মচারিদের কাছে বিষয়টি জানতে পেরে প্রিয়সী হোটেলের মালিক হাবিবের কাছে গিয়ে জানতে চান কেনো এভাবে তার হোটেলে আতঙ্ক ছড়ানো হলো। বিষয়টি নিয়ে কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে হট্টগোল সৃষ্টি হয়। বিষয়টিকে কেন্দ্র করে ঐদিন রাত আটটার দিকে হাবিবের পক্ষে ১০/১২ জন ছেলে রাজুর হোটেলে গিয়ে হোটেল মালিক রাজুকে মারধরের পাশাপাশি দেশিয় ও চাইনিজ অস্ত্র দিয়ে শরীরের বিভিন্নস্থানে আঘাত করে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। হোটেলের কর্মাচারিরা আহত রাজুকে উদ্ধার করে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। আহত রাজুর ভাষ্য মতে, যেসকল ব্যক্তিরা তাকে শারীরিকভাবে আহত করেছে তারা সবাই মহানগর যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক নাজিরের অনুসারি। তাদের মধ্যে অনেকেই নাজিরের নিকট ও দূরের আত্মীয়। নাজিরের সাথে রাজুর জমি জমা ও লক্ষিপুর কাচা বাজারের কমিটি গঠন নিয়ে পূর্ব থেকেই একটা ঝামেলা চলমান ছিলো। সেই পূর্ববর্তী ঝামেলার রেশ তুলতেই নাজিরের নির্দেশনা ও উস্কানিতে অফরাধিরা রাজুকে ছুরিকাঘাত করেছে বলে দাবি একাত্তর হোটেলের মালিক রাজুর। ঘটনার পরেরদিন দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিষয়টি প্রতিবেদন আকারে প্রকাশিত হয়।
এদিকে, গত ৩০ জুলাই যুবদল নেতা নাজির এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে নিজেকে নিরপরাধ দাবি করে আয়োজন করেন সংবাদ সম্মেলন। সেখানে তিনি উপস্থিত সাংবাদিকদের জানান, ঘটনার দুইদিন আগে ২৫ জুলাই তিনি ঢাকা গিয়েছিলেন। ২৫ থেকে ২৯ জুলাই পর্যন্ত তিনি ব্যবসায়িক কাজে ঢাকাতেই অবস্থান করছিলেন। ঘটনার আগে ও পরে তিনি রাজশাহীতে অবস্থান না করলেও একতারা হোটেলের মালিক কি কারনে তাকে মামলার আসামী বানালো সেটা তার বোধগম্য নয়। তিনি আরো দাবি করেন, রাজুকে যারা মেরেছে তারা আমার অনুসারি না। জমি জমা ও লক্ষিপুর কাচাবাজার কমিটি নিয়ে রাজুর সাথে পূর্ববর্তী কোন ঝামেলা আছে কিনা জানতে চাইলে নাজির বিষয়টি অস্বীকার করেন। তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারকে কলুষিত করার অসৎ অভিপ্রায়ে তার নিজ দলের কিছু নেতাকর্মী আহত হোটেল মালিক রাজুকে দিয়ে একটা গেম খেলাচ্ছেন বলে দাবি নাজিরের। নগর যুবদলের এই নেতা আরো জানান, বিষয়টি সম্পর্কে আমি কেন্দ্রের একাধিক নেতাকে অবহিত করেছি। আমাকে মিথ্যে ও ষড়যন্ত্রমূলক মামলায় ফাঁসানোর আরো একটি অন্যতম কারণ হলো, আগামী রাসিক নির্বাচনে আমি তিন নম্বর ওয়ার্ড থেকে কাউন্সিলর প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। কোন কুচক্রি মহল এই নির্বাচনকে টার্গেট করে আমাকে সকলের কাছে হেয় প্রতিপন্ন করার অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে বলেই আমাকে সুপরিকল্পিতভাবে মামলায় জড়িয়েছে বলেই আমার ধারণা। এইধরণের অপরাধ প্রবণতা পূর্ববর্তী সময়ে আমার কখনোই ছিলনা, এখনো নেই। এছাড়াও, রাজুর ছোট্ট একটি হোটেল নিজের কব্জায় নেয়ার প্রশ্নই ওঠেনা। আমার নিজেরই অনেক বৈধ ব্যবসা রয়েছে। আমি ইচ্ছে করলেই রাজুর মতো একাধিক হোটেল নিজের অর্থ দিয়েই আমি তৈরি করতে পারি। আমাকে পরিকল্পিতভাবে ফাঁসানো হচ্ছে।
ঘটনার বিষয়ে অভিযুক্ত প্রিয়সী হোটেলের মালিক হাবিব বলেন, গত ২৭ জুলাই বেলা ১১ টার দিকে সজিব নামের এক ছেলে এসে আমাকে জানায়, লক্ষিপুরের একটি তিনতলা বিশিষ্ট আবাসিক হোটেলে দুইজন ব্যক্তিকে অপহরণ করে আটকে রাখা হয়েছে। লক্ষিপুর এলাকার হোটেল ব্যবসায় যেনো কোন প্রকার অপবাদ না আসে সেজন্য আমি সজিবসহ আরো কয়েকজনকে নিয়ে রাজুর হোটেলসহ আরো বেশকয়েকটি তিনতলা বিশিষ্ট হোটেলে অপহৃতদের উদ্ধারের জন্য খোজ করতে থাকি। বিষয়টি রাজু তার হোটেলের কর্মচারিদের কাছ থেকে জানার পর ঐদিন সন্ধ্যায় সে আমাকে আমার হোটেল থেকে ডেকে নিয়ে এসে ইডেন হোটেলের গলিতে এনে আমার গালে সজোরে একটা চড় বসিয়ে দেয়। আমাকে মারার কারনে আমার সাথে যারা রাজুর হোটেলে গিয়েছিলো তারা পরবর্তীতে রাজুর হোটেলে গেলে উভয়পক্ষের মধ্য গন্ডগোল সৃষ্টি হয়। রাজুকে কে বা কাহারা মেরেছে সেটা আমার জানানেই।
জানতে চাইলে মামলার তদন্তের দায়িত্বে থাকা রাশেদুল হাসান দৈনিক আমাদের রাজশাহীকে বলেন, তদন্ত চলমান রয়েছে। পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে সকল কিছু তদন্ত করে অপরাধীদের চিহিৃতপূর্বক গ্রেফতার করে ন্যায়বিচার করা হবে। কোনপক্ষ কি ঘটনাস্থলের কোন ভিডিও ফুটেজ আপনাকে দিয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, না এখনো কেউ দেয়নি। রাজনৈতিক কোন চাঁপ আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, না নেই। অপহরণ বিষয়কে কেন্দ্র করে ঘটনার সূত্রপাত বলেই শুনলাম, আপনি কি এবিষয়ে কোনকিছু জানেন, জানতে চাইলে তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, তদন্তের স্বার্থে বিষয়টি এখন বলতে পারছিনা; আমরা সবকিছুই তদন্ত করবো।
