এফএনএস : নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যায় ডুবে যাওয়া এমভি সাবিত আল হাসান লঞ্চটি ১৯ ঘণ্টা পর গতকাল সোমবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে নদীর ৩৫ ফুট গভীর থেকে ক্রেন দিয়ে তুলে আনে বিআইডব্লিউটিএ’র উদ্ধারকারী জাহাজ ‘প্রত্যয়’। এ সময় লঞ্চের ভেতরে আটকে থাকা ২২টি লাশ উদ্ধার করা হয়। এর আগে গত রোববার রাতে ডুবুরিরা লঞ্চ থেকে পাঁচ নারীর লাশ উদ্ধার করেন। এ নিয়ে লঞ্চ থেকে পাঁচ শিশু, ১৮ নারী ও ৮ জন পুরুষসহ ২৭ যাত্রীর লাশ উদ্ধার করে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করেছেন জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা। সর্বশেষ ২২টি লাশ উদ্ধারের পর উদ্ধার অভিযান সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। এর আগে এ ঘটনায় জেলা প্রশাসন ও বিআইডব্লিউটিএ’র পক্ষ থেকে দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গত রোববার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় দিকে শীতলক্ষ্যা নদীর কয়লাঘাট এলাকায় এসকে-৩ নামের একটি কার্গো জাহাজের ধাক্কায় লঞ্চটি ডুবে যায়। ওই দিন রাতেই উদ্ধার অভিযান শুরুর পর রাত ৩টার দিকে উদ্ধার কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়। গতকাল সোমবার সকাল ৮টায় পুনরায় উদ্ধার কাজ শুরু করা হয়। ফায়ার সার্ভিস, বিআইডব্লিউটিএ, কোস্টগার্ড, নৌ-বাহিনী, নৌ-পুলিশ ও জাহাজ ‘প্রত্যয়’ উদ্ধার কাজ চালায়। গতকাল সোমবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ডুবে যাওয়া সাবিত আল হাসান লঞ্চটি টেনে তীরে তোলার পর একে একে মৃতদেহ নিয়ে আসেন ফায়ার সার্ভিস, কোস্টগার্ড, নৌবাহিনীর ডুবুরিরা।
এ সময় মৃতদের স্বজনদের আহাজারিতে নদীর দুই তীরের বাতাস ভারি হয়ে উঠে। দুপুর দেড়টার দিকে উদ্ধার করা লাশগুলো ট্রলার ও স্পিডবোটে করে শীতলক্ষ্যার পশ্চিম তীর কয়লাঘাট এলাকায় নিয়ে আসা হয়। সেখানে সারিবদ্ধভাবে রাখা হয় লাশগুলো। এ সময় স্বজনরা লাশ শনাক্তে হুমড়ি খেয়ে পড়েন। স্বজনদের পাশাপাশি উৎসুক জনতাও ভিড় জমান লাশগুলো একনজর দেখতে। ফায়ার সার্ভিস, প্রত্যক্ষদর্শী, নৌ-পুলিশ জানায়, গত রোববার সন্ধ্যা সোয়া ৬টায় নারায়ণগঞ্জ নদী বন্দরের লঞ্চ টার্মিনাল ঘাট থেকে মুন্সীগঞ্জ লঞ্চ টার্মিনালের উদ্দেশে ছেড়ে যায় এমভি সাবিত আল হাসান লঞ্চটি।
যাত্রী নিয়ে গন্তব্যে যাওয়ার পথে শীতলক্ষ্যার কয়লাঘাট-মদনগঞ্জঘাট সংলগ্ন নির্মিত তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতুর কাছে এসকে-৩ নামের বড় আকৃতির একটি কার্গো জাহাজের ধাক্কায় আকস্মিকভাবে ডুবে যায় লঞ্চটি। ডুবে যাওয়া লঞ্চে ৫০ জনের বেশি যাত্রী ছিল বলে জীবিত উদ্ধার হওয়া যাত্রীরা জানিয়েছেন। এর মধ্যে ২০ জন যাত্রী সাঁতরিয়ে তীরে উঠতে সক্ষম হয়েছেন। খবর পেয়ে বিআইডব্লিউটিএ, নৌ পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, কোস্টগার্ড, নৌবাহিনীসহ জেলা ও পুলিশ প্রশাসনের কর্মকতারা ছুটে আসেন। ঘণ্টাব্যাপী বৈরী আবহাওয়ার কারণে উদ্ধার তৎপরতা চালাতে বাধাগ্রস্ত হয়। খবর পেয়ে রাত থেকেই নদীর তীরে স্বজনরা ভিড় জমাতে থাকেন।
নিহতের স্বজনরা লাশের খোঁজে কেউ কেউ ট্রলার ও নৌকাযোগে ডুবে যাওয়া লঞ্চের কাছে গিয়ে স্বজনদের খোঁজার চেষ্টা করেন। কেউ কেউ নদীর উভয় পাড়ে স্বজনদের অপেক্ষায় বসে থাকেন। নিহতদের হলেনÑমুন্সীগঞ্জের সদর উপজেলার রুনা আক্তার (২৪), সদর উপজেলার চৌহদ্দামোড় এলাকায় সোলায়মান (৬০), বেবী বেগম (৬০), সুনিতা সাহা (৪০), পাখনা (৪৫), বিথি (১৮), আরিফা (১), পতিমা শর্মা (৫৩), শামসুদ্দিন (৯০), রেহেনা বেগম (৬৫), হাফিজুর রহমান (২৪), তাহমিনা বেগম (২০), নারায়ণ দাস (৬৫), পারবতী রানী দাস ( ৪৫), আজমীর (২), শাহ আলম মৃধা (৫৫), মহারানী (৩৭), আনোয়ার হোসেন (৫৫), মাকসুদা বেগম (৩০), ছাউদা আক্তার লতা (১৮), আবদুল খালেক (৭০), জবু ( ১৩), খাদিজা বেগম (৫৩), মো. নয়ন (২৮), সখিনা বেগম (৪৫), সাদিয়া (১১) ও মানসুরা (৭)।
আকাশ পথে র্যাবের হেলিকপ্টার টহল: গতকাল সোমবার দুপুর থেকে র্যাবের একটি চৌকস দল হেলিকপ্টারে উদ্ধার তৎপরতায় অংশ নেয়। র্যাব-১১ এর অধিনায়ক (সিও) লে. কর্নেল খন্দকার সাইফুল আলম জানান, শীলতলক্ষ্যা নদীতে লঞ্চ দুঘটনার পর তীব্র স্রোতোর কারণে অনেক লাশ ভেসে যেতে পারে। সেই জন্য র্যাব আকাশ পথে টহল দিয়ে কোনও মৃতদেহ ভেসে উঠে কিনা সেটি নজরদারি করছে। একইসঙ্গে যে লাইটার জাহাজটি এমভি সাবিত আল হাসানকে ধাক্কা দিয়ে ডুবিয়ে দিয়েছে। সেই জাহাজটি নদীর কোন জায়গায় লুকিয়ে আছে তাও র্যাবের হেলিকপ্টার খুঁজে দেখছে।
উদ্ধার অভিযান সমাপ্ত ঘোষণা: বিআইডব্লিউটিএ’র চেয়ারম্যান কমোডর সাদেক জানান, ডুবে যাওয়া লঞ্চটি উদ্ধার করে অভিযান সমাপ্ত করা হয়েছে। তিনি বলেন, গত রোববার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় লঞ্চটি ডুবে যাওয়ার পর বিআইডব্লিউটিএ’র কর্মকর্তারা ফায়ার সার্ভিস, কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনীসহ বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে কাজ শুরু করেন। সবার যৌথ সহযোগিতায় দুপুর সাড়ে ১২টায় লঞ্চটি উদ্ধার করে নদীর পূর্বতীরে নিয়ে যাওয়া হয়। লঞ্চটি সার্চ করে মৃতদেহগুলো উদ্ধার করে নৌপুলিশসহ জেলা পুলিশের তত্ত্বাবধানে স্বজনদের বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। উদ্ধার অভিযান সমাপ্ত ঘোষণা করে নৌ চ্যানেলটি চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।