৮ নভেম্বর ২০২৬
বিজ্ঞাপন
Amader Rajshahi

সকালে কাজে ফিরলেও বিকেলে বিক্ষোভ, আবার অনেক কারখানায় ছুটি

প্রকাশিত: ৮ নভেম্বর ২০২৬, ৮:৩৫ অপরাহ্ণ | বিভাগ: জাতীয়
সকালে কাজে ফিরলেও বিকেলে বিক্ষোভ, আবার অনেক কারখানায় ছুটি
বিজ্ঞাপন

কয়েক দিনের শ্রমিক অসন্তোষের পর রোববার (০৮নভেম্বর) সকালে ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের অধিকাংশ পোশাক কারখানায় উৎপাদন শুরু হয়। শ্রমিকেরাও কাজে যোগ দেন। তবে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে। সাভার ও আশুলিয়ার ২০টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়। বিকেলে গাজীপুরের কোনাবাড়ীর জরুন এলাকায় বেতন বৃদ্ধির দাবিতে শ্রমিকদের বিক্ষোভ ও কয়েকটি কারখানায় ইট-পাটকেল ছোড়ার ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ও বিজিবি সদস্যরা সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ার গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করেন। এ ঘটনায় গাজীপুরের সাতটি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। শ্রমিকদের ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবিতে গত কয়েক দিন ধরে দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে কয়েকটি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। এমন পরিস্থিতিতে গতকাল রোববার সকালে কারখানাগুলোতে কাজে ফেরেন অধিকাংশ শ্রমিক। তবে দিন শেষে কয়েকটি এলাকায় আবারও অস্থিরতা দেখা দেয়। সাভার ও আশুলিয়ায় সকালে অধিকাংশ কারখানায় শ্রমিকেরা নির্ধারিত সময়ে কাজে যোগ দেন। উৎপাদনও শুরু হয়। কিন্তু কয়েকটি কারখানার শ্রমিকেরা কাজ করতে অস্বীকৃতি জানালে প্রথমে সেসব কারখানায় ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ। পরে পরিস্থিতি বিবেচনায় আরও কয়েকটি কারখানায় ছুটি দেওয়া হয়। সব মিলিয়ে ২০টি কারখানা বন্ধ রাখা হয়।
অন্যদিকে, গাজীপুরের কোনাবাড়ী, শফিপুর, পল্লী বিদ্যুৎ, চন্দ্রা, বাসন সড়ক, টঙ্গী, সালনা, বাংলাবাজার ও শ্রীপুরের বিভিন্ন কারখানায় সকালে স্বাভাবিকভাবে উৎপাদন শুরু হয়। শ্রমিকেরাও কাজে যোগ দেন। কিন্তু বিকেল ৩টার দিকে কোনাবাড়ীর জরুন এলাকায় নতুন করে বিক্ষোভ শুরু হয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কাশিমপুর থেকে অর্ধশতাধিক শ্রমিক লাঠিসোঁটা নিয়ে জরুন এলাকায় এসে বিক্ষোভে অংশ নেন। এ সময় তাঁরা আশপাশের কয়েকটি চালু কারখানা লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল ছুড়তে থাকেন। খবর পেয়ে পুলিশ ও বিজিবি সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে তাঁরা সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ার গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করেন। এ সময় লাঠিপেটার ঘটনাও ঘটে।
গাজীপুর শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন জানান, মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে মণ্ডল গ্রুপের কয়েকজন শ্রমিক জরুন মোড়ে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করেন। একপর্যায়ে তাঁরা আশপাশের ছয় থেকে সাতটি কারখানায় ইট-পাটকেল ছোড়েন। পরে পুলিশ ও বিজিবি সদস্যরা তাঁদের সরিয়ে দেন। পরিস্থিতির কারণে সাতটি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
এ ছাড়া চন্দ্রা-পল্লী বিদ্যুৎ ও কাশিমপুর এলাকার কয়েকটি কারখানাতেও শ্রমিকেরা বিক্ষোভ করেন। এসব এলাকায়ও কয়েকটি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে কোনাবাড়ী, কাশিমপুর ও জরুন এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
মজুরি বোর্ড গঠন : শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবির মধ্যে গতকাল রোববার ছয় সদস্যের নতুন ন্যূনতম মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, নতুন মজুরি কাঠামো ডিসেম্বর ২০২৬ থেকে কার্যকর হবে। বর্ধিত ও সমন্বিত বেতন শ্রমিকেরা পাবেন জানুয়ারি ২০২৭-এ। নতুন বোর্ড পোশাকশিল্পের বিভিন্ন পদের জন্য ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে সুপারিশ করবে। বোর্ডের সুপারিশের ভিত্তিতে সরকার নতুন মজুরি কাঠামো ঘোষণা করে গেজেট প্রকাশ করবে। বোর্ডের চেয়ারম্যান করা হয়েছে সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ শেখ আশফাকুর রহমানকে। মালিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে রয়েছেন বিজিএমইএর পরিচালক এ বি এম শামসুদ্দিন। শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বাবলু আক্তার। এ ছাড়া বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের যুগ্ম মহাসচিব আসিফ আইয়ুব এবং নিরপেক্ষ সদস্য হিসেবে রয়েছেন মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ ও আনোয়ার হোসেন। এর আগে শ্রমিকনেতাদের সঙ্গে শুক্রবার এবং গত শনিবার বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন মন্ত্রী। শ্রমিকদের সড়ক ছেড়ে কাজে ফেরার আহ্বানও জানান তিনি। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে পোশাকশ্রমিকদের সর্বনিম্ন মাসিক মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। সাধারণত পাঁচ বছর পরপর মজুরি পুনর্নির্ধারণের নিয়ম থাকলেও গত ১০ এপ্রিল জাতীয় সংসদে পাস হওয়া শ্রম আইন সংশোধনী বিলে এ সময়সীমা কমিয়ে তিন বছর করা হয়েছে।
নিরাপত্তায় বিজিবির ৩৩ প্লাটুন : শিল্পাঞ্চলে নিরাপত্তা জোরদার করতে ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে বিজিবির ৩৩ প্লাটুন সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। এর মধ্যে গাজীপুরে রয়েছেন ১২ প্লাটুন। এই ১২ প্লাটুন তিন জেলায় মোতায়েন করা মোট ৩৩ প্লাটুনের অন্তর্ভুক্ত। ঢাকার সাভার, আশুলিয়া ও মিরপুর এলাকায় বিজিবি সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। নারায়ণগঞ্জের শিবু মার্কেট, জালকুড়ি, বিসিক শিল্পনগরী, চাষাঢ়া, কাঁচপুর ও শিমরাইল এলাকায় তাঁদের মোতায়েন করা হয়েছে। গাজীপুরের চন্দ্রা, পল্লী বিদ্যুৎ, মৌচাক, আমবাগ, কাশিমপুর, নাওজোড়, ভোগড়া বাইপাস, গাছা ও সালনাতেও বিজিবি সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। গাজীপুর জেলা প্রশাসক মো. নূরুল করিম ভুঁইয়া জানান, জেলায় ১২ প্লাটুন বিজিবির পাশাপাশি পাঁচ প্লাটুন আনসার ও আট প্লাটুন এসআরবি মোতায়েন করা হয়েছে। সব মিলিয়ে ২৫ প্লাটুন সদস্য বিভিন্ন এলাকায় দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁদের কার্যক্রম তদারকিতে ২৫ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটও দায়িত্বে রয়েছেন। বিজিবি সদর দপ্তরে একটি মনিটরিং সেলের মাধ্যমে মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম ও সরাসরি ভিডিও পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে জননিরাপত্তা এবং সরকারি-বেসরকারি সম্পত্তির সুরক্ষায় কাজ করছেন সদস্যরা।
শান্তিপূর্ণ পরিবেশ চান শ্রমিকেরা : সকালে কাজে ফেরা শ্রমিকদের মধ্যে স্বাভাবিক পরিবেশে উৎপাদন চালু রাখার প্রত্যাশা দেখা গেছে। গাজীপুরের প্যারাগন সোয়েটারের শ্রমিক রিনা আক্তার বলেন, ‘কয়েক দিনের অস্থিরতার পর আমরা আবারও কাজে যোগ দিয়েছি। আমরা কোনো বিশৃঙ্খলা চাই না, শান্তি চাই। শান্তিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করে পরিবার নিয়ে ভালোভাবে বাঁচতে চাই।’ মস্কো গ্রুপের মেশিন অপারেটর সুমন মিয়া বলেন, ‘আমরা চাই কারখানাগুলো স্বাভাবিকভাবে চলুক। আন্দোলন-সংঘর্ষ হলে শ্রমিকদেরই বেশি ক্ষতি হয়। মজুরি বৃদ্ধির বিষয়ে যে সিদ্ধান্ত হয়েছে, তা বাস্তবায়ন হলে আমরা উপকৃত হব।’ শিল্প পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মো. ইসরাইল হাওলাদার জানান, গতকাল রোববার সকালে অধিকাংশ কারখানায় শ্রমিকেরা কাজে যোগ দেন। আশুলিয়ার কয়েকটি কারখানায় সমস্যা দেখা দিলে ছুটি ঘোষণা করা হয়। শ্রমিকেরা শান্তিপূর্ণভাবে কারখানা থেকে বেরিয়ে যান। সকালের পরিস্থিতিতে কোথাও বিক্ষোভ, সংঘর্ষ বা সড়ক অবরোধের খবর পাওয়া যায়নি। গাজীপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. সোহেল রানা জানান, জেলার গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে র‌্যাব, বিজিবি, পুলিশ ও আনসার সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। শিল্প পুলিশ, গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ ও জেলা পুলিশ মহাসড়কসহ বিভিন্ন এলাকায় নিরাপত্তা দিচ্ছে। এর আগে ৩১ অক্টোবর গাজীপুরের বিভিন্ন পোশাক কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। শ্রমিকেরা মহাসড়ক অবরোধ করলে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে শ্রমিক ও পুলিশ সদস্য আহত হন। পরিস্থিতির কারণে বেশ কিছু কারখানা বন্ধ রাখা হয়। এরপর থেকেই শিল্পাঞ্চলে বাড়তি নিরাপত্তা জোরদার করা হয়।-এফএনএস

পাঠকদের ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন